আর শিবমন্দির তো রানীমারই। ভোরের শেষ প্রহরের পূজার আগে তাঁর হাতি গলার ঘণ্টা বাজিয়ে মন্দির-চত্বরের নিচে থেমেছিলো। যারা পিয়েত্রোর বাংলোয় পূজার জন্য রাত্রিবাস করছিলো তাদের সে সংবাদে উৎসাহিত হওয়ারই কথা। তারা সকলেই বললো, দুধজল দিলে তবেই আমরা সারি বেঁধে তার পিছন পিছন এগোবো। তখন ভোরের আলো ফুটছে, পূজা শেষ হয়েছে। রানী নয়নতারাকে ডেকে হাওদায় নিয়ে রওনা হয়েছিলেন। মাহুতকে বলেছিলেন নদীর খাতের দিকে যেতে। অনেকটা ঘুরে, কুতঘাটের কাছে যেখানে নতুন জেটি, সেখানে বাঁধ এড়িয়ে নদীর পার ধরা যায়। পার ধরে ক্রমশ ফরাসডাঙার কাছে। বাঁধের নিচে হাতি পৌঁছলে রানী বলেছিলেন, এই নাকি তোমার বাঁধ,নয়ন? এ নিয়ে তোমার দুর্ভাবনা? কিন্তু একসময় ফাটলগুলো চোখে পড়েছিলো। তখন রানীমার মুখে হাসির পাশে পাশে চিন্তা দেখা দিয়েছিলো।
.
০২.
কিন্তু এসবকে উপেক্ষা করে, ছাপিয়ে যেন সেই দ্রুতগামী বসন্ত এসেছিলো। বনে ছায়ায় ছায়ায় কী ফুল, কত ফুল তার খবর অবশ্যই কম রাখা হয়। গ্রামের এখানে ওখানে টগর, করবী, জবা, চীনাজবা, গন্ধরাজ, গোলাপ, চাপা তো অজস্রই তখন। আমের মুকুল দেশ বিদেশের মৌমাছি ডেকে আনায় তার গুঞ্জরণও আছে। গাছের আশ্রয়ে পাখনাখালির ডাকাডাকি ঝুটোপাটি তো নিশ্চয়ই। সকালের দিকে শিশির পড়ে এখনো, তাতেই ফুলের জোর তো। কিন্তু যেখানে ফুল নয়, গাছ নয়, চাষের জমি, সেখানে সকাল ফুরোতে না ফুরোতে গরম হয়ে ওঠে বাতাস। দুপুরে খালি মাঠগুলোর দিকে, হলুদ বাদামী মাঠগুলোর দিকে চাওয়া যায় না। সকালে শিশির বরং ক্ষতিই করছে, তাকে কিছুটা ভেজে বলেই দুপুরের রোদে ফাল্গুনেই মাঠ ফেটে যাচ্ছে।
দিনের হিসাবে সেটা শিবচতুর্দশীর দু-তিন দিন পরে হতে পারে। রাজকুমার রাজচন্দ্র তার ঘরের কাছারির দিকের ঝুলবারান্দায়। নিচে যে ফেনসিং দেওয়া হয়েছিলো রাজবাড়িকে দেওয়ানকুঠি আর টমিদের তাঁবু থেকে পর্দানশীন রাখতে সেগুলো খোলা। হচ্ছে। তার মনে এই পর্দানশীন কথাটাই উঠলো, সেটাই খেলা করলে সেখানে।
কিছুক্ষণ পরে যেন অসংলগ্ন এমনভাবে তার মনে পড়লো, কয়েকদিন আগে বেলা আটটা-নটার আলোতে কাছারির সামনে দিয়ে হাতিটা এগিয়ে গিয়ে রাজবাড়ির কাছাকাছি বসেছিলো। হাতিতে হাওদা ছিলো, হাওদার মাথায় নকল মুক্তোর ঝালরদার রঙিন ছাতা। হাতিটা রামপিয়ারী নয়, বরং পিয়েত্রোর বেঁটে হাতিটা। এরকমটা সচরাচর দেখা যায় না। রাজচন্দ্র তখন ফিরছিলো তার ঘোড়ায় বেড়াননা শেষ করে। হাতিটা তার আগে আগে ঢুকেছে গেট দিয়ে। সে দূর থেকে দেখেছিলো একই রকম চাঁদরে জড়ানো, একই রকম অবগুণ্ঠন, দুজন হাতি থেকে নেমে রাজবাড়ির গাড়িবারান্দার দিকে চলে গেলো। এরকমটাও সচরাচর দেখা যায় না। রানীমার হাতি বাগান দিয়ে ঘুরে গিয়ে অন্দরে বসে। পিয়েত্রোর হাতি, মাহুতটিও তার। এ বাড়িতে সে নতুনই তো। রাজকুমারের পাশ দিয়ে হাতিটা যখন পিলখানার দিকে ফিরে যাচ্ছে, রাজচন্দ্র জিজ্ঞাসা করে ফেলো–কে রে? মাহুত বলেছিলো, দুজন রানী এলেন।
রোদটা এখন আর আরামের নয়। ঝুল বারান্দা থেকে সরতে গিয়ে মনে হলো তার, নতুন মাহুত বুঝতে ভুল করেছে। জিজ্ঞাসা না করলেও চলতো। দূরে হলেও হাঁটার ভঙ্গিতে বোঝা গিয়েছিলো তারা নয়নতারা এবং রানী। রাজু নিজের মনে মনে হেসে ঝুল বারান্দা থেকে বরং ছায়ার দিকে সরলো। আজ সে সকালেই উঠেছে। কিন্তু কাল ঘুমোতে বেশ দেরি হয়েছিলো।
সে অনুভব করলো সেজন্য সে ক্লান্ত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা নয়। বলা যায়, রাত দুটো পর্যন্ত হৈমী তার ঘরে ছিলো। পিয়ানোনা শেখার কথা হয়েছিলো একবার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হৈমীর ব্যক্তিগত জীবনের কথা হয়েছিলো। এটা খুব খারাপ লাগছে। হৈমী তার আশ্রিত বলেই কি তেমন উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলো তার প্রশ্নের! না, ভালো নয়। একজন মানুষের বুকের ভিতরে তেমন নির্দয়ভাবে প্রবেশ করা। এখন তো ভাবতে গিয়ে খারাপ লাগছে যে হৈমী তেমন করে বলেছিলো, সে তারই আশ্রিত।
রাজচন্দ্র তার ঘরে এলো। ঘর পার হয়ে উল্টোদিকের দরজা খুলে আবার সেদিকের ঝুলবারান্দায় দাঁড়ালো। তখন তার হঠাৎ মনে হলো, এটা কি আশ্চর্য বলবে না কেউ-ই, যে রানীমার জন্মতিথির সেই রাতে তুমি তাহলে পূজার কাছে এসো বলে চলে যাওয়ার পর নয়নতারাকে আজ পর্যন্ত সে আর দেখেনি! অথচ সেদিন সেভাবে হাওদা থেকে নামায় প্রমাণ হয়, সে তো রাজবাড়িতে এসেছিলো! সে কি রানীর উজিরাইন বলে ঠাট্টা করবে?
অনেকসময় ঠাট্টা করলেও রাগ যায় না। সে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো। দোতলার অলিন্দ দিয়ে রানীমহলের দিকে চলতে লাগলো। তখন মনে মনে বললো, বলে গেলেই হতো আর তোমার সঙ্গে দেখা হবে না রাজু। রানীর মহলে রানী ছিলেন। কিন্তু তাকে তো বলা যায় না, তার সামনেও বলা যায় না, উজিরাইন কোথায়? দোতলা থেকে নেমে সে মন্দিরের দিকে চললো। সে ভাবলো, মনে তো হয় সে এ বাড়িতে এলেই পূজা, মন্দির ইত্যাদির কাছে থাকে আজকাল।
মন্দিরের কাছাকাছি গিয়ে রাজচন্দ্র দেখতে পেলো, কয়েকজন পুরস্ত্রী সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার কি চিনতে দেরি হয়? আর এখন তো অবগুণ্ঠনও নেই। মাঝখানের সেই গজ বিশেক মাটি সে খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে গেলো। যারা দাঁড়িয়েছিলো তারাও তো তাকে দেখেছিলো। কিন্তু তারা সরে যাওয়ার আগেই সে নয়নতারার মুখোমুখি দাঁড়ালো, এমন যে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারে। সে বললো–তুমি আসবে? না, হাত ধরে নিয়ে যেতে হবে?
