রাজবাড়ির পক্ষে কি এই আয়োজন সার্থক হয়েছিলো? একটা মত এই : সন্ধ্যায় কেট, লাটের শ্যালী, লাটের মহিষী একত্র পিয়ানোর কাছে বসতেন। লাট নিজেও কি অদূরে থাকতেন না? সেই রকম এক সন্ধ্যায় রাজকুমারকে নিয়ে আলাপ হয়েছিলো। লাট-ললনা বলেছিলো, রাজার পুত্র রাজাই হয়; স্ট্রেঞ্জ, এখনো তা হয়নি! আচ্ছা, আজ ডিনারে হিজ একসেলেন্সিকে বলবো তো!
চিন্তা করার লোক রাজনগরে অবশ্যই ছিলো। হরদয়ালের চিন্তার কথা জানা যায় না। সে তো অ্যালবেট্রসের লাট-পার্টির সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিলো। বাগচী, যাকে দুএকবার লাটের পার্টির সামনাসামনি হতে হয়েছে, যার সঙ্গে তার পার্টির সেই ডাক্তার মেজর চীবসের গ্রামের চিকিৎসা বন্দোবস্ত নিয়েও কিছু আলোচনা হয়েছে; সে যেন অন্য কোনোদিকে ব্যস্ত। নায়েবের চিন্তার কথা বলা যায়।
তারা চলে গেলে নায়েব একদিন যখন তার খাসকামরায়, হঠাৎ তার মনে হলো :সদরের খবর, এই ডানকানের উস্কানিতে কালেক্টর ম্যাকফার্লান অনেকবার কলকাতায় লিখেছে পিয়েত্রোর সিপাহী বিদ্রোহের সঙ্গে যোগ থাকার কথা। সেইজন্যই কি জঙ্গীলাট তদন্ত করে গেলো? নায়েবের মুখে হাসি দেখা দিয়েছিলো। এত ভয়! এখনো? দেখছে, ঘাসের ছাই এর নিচে স্ফুলিঙ্গ আছে কিনা? কিন্তু সে গম্ভীরও হলো। সদরের এটাও খবর, ম্যাকফার্লান কালেকটরিতে খোঁজ নিচ্ছে, পিয়েত্রো দুসন আগে গত হয়েছে, তাহলে ফরাসডাঙার লাট জমা পড়লো কী করে? জমা তো পিয়েত্রোর উকিলই দিয়েছে। কিন্তু…
তাই বলে কিছুই ঘটেনি শীতের সেই শেষ কয়েকটি দিনে, এমন হয় না। যেমন বাগচী তো লাটের ক্যাম্পের কয়েকটি দিন তাদের ডিসপেনসারিতে যেতেই পারেনি। সে কিছু করছে না রোগীদের সম্বন্ধে এ রকম চাপ ছিলো মনে। উপরন্তু মেজর চীবসের সঙ্গে আলোচনায় জানতে পেরেছে যে বাংলাদেশের যশোর খুলনা জেলা জুড়ে ম্যালেরিয়া এপিডেমিকের চেহারা নিচ্ছে ক্রমশ। জ্বর হলেই এখন থেকে তাই লিভার ও সৃপ্লিনের কথা ভাবতে হবে। সুতরাং সে জঙ্গীলাট চলে যাওয়ার দুএক দিনের মধ্যেই চরণের ডিসপেনসারিতে গিয়েছিলো। রোগী ছিলো না, চরণকে বাগচী জিজ্ঞাসা করলো–তুমি তো আমাকে কমিশনের সামনে যেতে নিষেধ করছো? তোমার কথা শুনে কি ঠিক করলাম? না হয়, যারা সাহস করে সাক্ষী দিতে পারছে না, এখানেই ডাকো তাদের, কথা বলি। লোকগুলোকে খারাপ মনে হয় না। আজ কালই তো সাক্ষ্যের দিন বোধ হয়।
চরণ বললো–সাক্ষ্য গতকাল হয়েছে। আরো দুদিন হওয়ার কথা। গোপালদার পাড়ার কেউ সাক্ষ্য দেবেইনা। কাল আমরা চারজন সাক্ষী দিয়েছি। আমি, অমর্ত্যমামা, শ্বশুরমশায়, কৃষ্ণানন্দ, আর ইসমাইল। একটু থেমে আবার সে বললো, ইসমাইলকে নিয়ে এসেছিলো ওসুলিভান। ওসুলিভান সকলের বেলাতেই দোভাষীর কাজ করেছে।
বাগচী সংবাদটার নতুনত্বের বাইরে যখন তার মূল্যটাকে ওজন করেছে, চরণ বলেছিলো, সাক্ষ্য না দেওয়া তো ছিলো ভালো। যাদের দরখাস্ত লিখে দিয়েছেন তাদের জনাকুড়ি আমাদের সামনেই এক লাইন করে হলফ নিয়ে গেলো :তারা দরখাস্তর বিষয়ে কিছু জানে না, সবই চরণদাস আর রাজনগরের বাগচীমাস্টারের কাজ।
বলো কী? বলে চমকে ওঠা যায়, তাতে কিন্তু চিন্তা শেষ হয় না। বাগচী দিন দুয়েকের মধ্যে সব ব্যাপারটা আনুপূর্বিক রাজকুমারকে বলেছিলো।
রাজকুমার কী ভাবলো বোঝা গেলো না। পরে বললো–আপনি কিন্তু এখন আর রাজনগরের হেডমাস্টার নন। আপনাকে এদিকটা দেখতে হয়। আপনার টাট্টু ভালোই। কিন্তু আজ আমার সঙ্গে আস্তাবলে যাবেন। সেখান থেকে যে ঘোড়াটা পছন্দ হয় নেবেন। আপনার সহিস ঘোড়া চিনবে না। সহিস আমি ঠিক করে দেবো। আর কথা এই, সেই সহিস কিন্তু মাথায় পাগড়ি-টাগড়ি বাঁধবে। গ্রামে ঘুরতে হলে সে তার ঘোড়ায় আপনার সঙ্গে থাকবে। একটু থেমে থেকে রাজকুমার জিজ্ঞাসা করেছিলো, দিনকর রাও আর সালর জং দুজনেই নাকি সার উপাধি পেয়েছে?
এ ঘটনাটা নিশ্চয় সামান্য, কিন্তু সেই শিবচতুর্দশীর পূজা এবং তার মেলা? সে রাতে কিন্তু খুব শীতই ছিলো। আর সেই শিব তো রানীমার প্রতিষ্ঠিত। দুদিন ধরে মেলা হয়েছিলো। সেই মেলায় তো অনেকেই গিয়েছিলো। পরিচিতদের মধ্যে কেট ও বাগচীর নাম করতে হয়। বনদুর্গা আর চরণও গিয়েছিলো। চরণের তবু দ্বিধা ছিলো। বনদুর্গা তো শেষ প্রহরের পূজানা-দিয়েই ছাড়েনি। চরণ বলেছিলো, সেখানে কি আমাদের পূজা হয়, সেখানে কি যেতে আছে? বনদুর্গা হেসে বলেছিলো, মশায় কিছু জানেন না। গ্রামের সব লোক জানে, রানীমা নিজে মুখে বলেছেন, সেনাকি খেস্টানি শিব, সকলেই পূজা দিতে পারে, ছুঁতে পারে। কথাটা তো সত্যি, দ্যাখো। সে তত খেস্টানের হাওয়াঘরের ভিতেই।
মেলা খুব বড়ো নয় বটে, কিন্তু দুদিন তো চলেছিলো। দ্বিতীয় দিনে কেট ও বাগচী গিয়েছিলো। কেটই উৎসাহী। তার উৎসাহ কি এজন্য যে বাগচীর নিরুৎসাহের সময় চলেছিলো? সে বাগচীর পাশে পাশে, তার সুদৃশ্য গুলফ দেখিয়ে যেন কিছুটা নেচে নেচে, চলেছিলো। পুরুষ হলে বলা যেতো, সে যেন বলছে, লেটস টেক ইট ইন আওয়ার স্ট্রাইড। একবার পিছন ফিরে সে কিছু বিপন্ন বোধ করছিলো। তাদের দুতিন হাত পিছনে, যেন তাদের গায়েই এসে পড়বে, একজন প্রকাণ্ড চেহারার মানুষ যার ঝালরদার পাগড়িতে জরি, যার লম্বা আচকানের বোতামগুলো যেন সোনার,হাতে ঝকঝকে তীক্ষ্ণ ফলার লম্বা বল্লম। কেট এর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকে দেখে বাগচী বলেছিলো, তোমার বডিগার্ড আমরা আর হেডমাস্টার নই, কেমন কিনা? মেলাতেও একটা কৌতুক হয়েছিলো। কেটই দূর থেকে বলেছিলো, দ্যাখো, গাছতলাটায় কি ক্রাইস্টের মিশনারি? একদল চাষী একজন লোককে ঘিরে দাঁড়িয়েছে আর সে ভাঙা বাংলায় ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। একেবারে মুখোমুখি না হয়ে, কৌতূহল মেটানো যায় তেমনভাবে ভিড়ের কাছে বাগচী এগিয়েছিলো। তার মনে দুঃখই হয়েছিলো। সুরটা মিশনারীদের, তাদের মতোই কখনো আকাশের দিকে আঙুল তুলছে, কখনো দিগন্তের দিকে হাত বিস্তার করে দিচ্ছে। কিন্তু সে ও সুলিভান এবং নিশ্চয় নেশার ঘোরে। প্যারাডাইস, স্বর্গ বোঝাতে শান্তির দ্বীপ, সুস্বাদু জল, উজ্জ্বল সূর্যালোক, ছোটো ছোটো কুটির এবং যার যত চাষ করার ক্ষমতা এমন জমির কথা কোনো বাইবেল বলে না। বাগচী শুনলো, সে বলছে : আমরা ভাসিয়া যাইবো, এই পুরাতন হইতে নতুনে, এবং আমরা শান্তির দ্বীপে পহুঁছিবো। কেটেরও ধারণা হয়েছিলো, মাতাল। বাগচী তার মনোভাব দূর করতে বললো, ও নাকি পূর্বজন্মে কবি ছিলো।
