হরদয়াল একটু ভাবলো, একটু যেন দ্বিধাও করলো। পরে আবার লিখলো :
…এই সুযোগে তোমাকে অন্য এক বিষয়েও বলিতে পারি। কলিকাতায় থাকাকালীন আমি হিন্দু হরিশ মুখোপাধ্যায় সম্বন্ধে কিছু সংবাদ পাইয়াছি। প্রকৃতপক্ষে তাহার চেষ্টাতেই যে ইন্ডিগো কমিশন সে বিষয়ে সন্দেহ নাই। সেই কমিশন বর্তমানে এই অঞ্চলে। কিন্তু যাহা শুনিয়াছি তাহা এই যে মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের স্বাস্থ্য ভালো চলে, হয়তো এরূপও সত্য অর্থকৃচ্ছতা দেখা দিয়াছে। অবগত আছি, তোমাদের সমাজের একাংশে তাহার কার্যকলাপে নিরুৎসাহ আছে; অধিকন্তু সেখানে তাহার পানদোষ এবং আনুষঙ্গিক ধনাঢ্যদের পীড়া সম্বন্ধে বক্র-ইঙ্গিত শুনিয়াছি। সে বিষয়ে আমার বলিবার নাই। শুনিয়াছি সে গৃহের দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয় করিতেছে। ইহা নিন্দার প্রচারমাত্র হইতে পারে। যাহা হউক, যদি পুস্তকাদি বিক্রয় দ্যাখো, বিশেষ পুরাতন এডিনবরা রিভুর মতো পত্রিকা, তুমি গোপনে আমার পক্ষ হইতে একটা দাম বলিবে। এক এক বৎসরের এডিনবরা রিভুর জন্য আমি এক এক হাজার দিতে প্রস্তুত জানিবে। টাকার জন্য প্রয়োজনে আমাদের নতুন স্থাপিত কলিকাতার দপ্তরে যোগাযোগ করিতে পারো। কিন্তু অবশ্যই লক্ষ্য রাখিও মুখোপাধ্যায় মহাশয় দাম শুনিয়া ক্রেতার বদান্যতা এরূপ সন্দেহ না করে, যেন মানের হানি না হয়। ..
চিঠি শেষ করে তামাকে মন দিলো হরদয়াল।
১৩. সে বৎসর বসন্ত রাজনগরে
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ
০১.
অনুমান করি সে বৎসর বসন্ত রাজনগরে আগে এসে পড়েছিলো। বসন্ত যে তাতে ভুল নেই; করবী তা নানা রঙের, টগর তা নানা মাপের, গোলাপ যা রাজবাড়ির হাতায় পৌঁছে বসরাই, চম্পকচাপা, কৃষ্ণচূড়া, গুলমোর–এসব তো বটেই, শালে আমে সে বসন্তরই এসে পড়া। এমনকী পাখিরাও তা বুঝতে পেরে গিয়েছিলো। গম্ভীর কোনো পথচারীকে চমকে দিয়ে পথের ধারে ছোটোঝোপটা থেকে পরিষ্কার উঁচু গলায় কেউ আচমকা গান করে উঠছিলো, তারপর মানুষের গাম্ভীর্য দেখে মাথা ঠোঁট এদিক ওদিক করে যেন যা করেছে, না-দেখে করেছে এমনভাবে নিজের পোকা খোঁজায় গম্ভীর হয়ে যাচ্ছিলো। বনে কী ফুটছে, কত ফুটছে, তার ইয়ত্তা করা যায় না।
একটা প্রাকৃতির কারণ দেখানো যায় : অঘ্রান, পৌষ, মাঘ তিনটি মাস গেলো একফোঁটা বর্ষা হয়নি;বসন্তের শুকনো ভাবটাকে, বাতাসের হালকা ভাবটাকে তা এগিয়ে আনতে পারে। অন্য কারণ বোধ হয় এই যে জঙ্গীলাটের ক্যাম্পের উজ্জ্বলতা আর বসন্তের ঘটনাগুলোর মাঝখানে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিলো তা যেন নিষ্প্রভ কুয়াশা-ঢাকা, যেন দুইপাশের উজ্জ্বলতার মাকে চোখে পড়তে চায় না।
জঙ্গীলাটের সেই ক্যাম্প নিশ্চয়ই সুদীর্ঘকাল মনে রাখার মতো ছিলো। অত যার আয়োজন, অত যার বাহুল্য, যেন চোখকে ধাঁধায়, তা মিটে যাওয়ার পরও যেন চোখের সামনে ঘটতে দেখা যায়। গ্রামটাই যেন সাহেবদের হয়ে গিয়েছিলো। সেই ভোর-সকালে বিউগল বেজে উঠতে ফরাসডাঙায় কুচ। সেই তালে তালে রাজবাড়ির দিকে গিয়ে অবশেষে লাটের সামনে নাকি পতাকায় অভিবাদন করে, বিউগল বাজে। আবার সন্ধ্যায় বিউগল। আর তারপরই দপ করে যেন একসঙ্গে সব আলো জ্বলে ওঠে, ওদিকে ফরাসডাঙা এদিকে রাজবাড়ি একটানা আলোয় ঝলমল করে ওঠে। রানীমার জন্মতিথির উৎসবে আলো হয়; কিন্তু সে তো রাজবাড়িতে, সে আলো এমন করে পথে পথে ছড়ায় না। তুমি বলতে পারো না, আলো জ্বলে উঠলে রাজবাড়ির হাতার মধ্যে দেওয়ানকুঠিতে কী হতো; কারণ রাজবাড়ির দরজা দিয়েই তো দেওয়ানকুঠির পথ; সেই দরজার সামনে সারাদিনই তো লালকুর্তা সিপাহী বন্দুক ঘাড়ে এ-মাথা থেকে ও-মাথা করছে অষ্টপ্রহর। কিছুপরে আবার এক রকম বাজতো। তাই নাকি ব্যাগপাইপ, নাকি গোরার বাদ্যি। আর তখন নাকি লাট খেতে বসেছেন।
আর এর মাঝে তো গোটা দিনটাই ব্যস্তসমস্ত সওয়াররা রাজবাড়ি থেকে ফরাসডাঙা, ফরাসডাঙা থেকে রাজবাড়ি করছে। কত ঘোড়া, কত রকমের রং। আর বেলা দশটা বাজে কি না বাজে, সারিসারি হাওদাদার হাতি বেরোল রাজবাড়ি থেকে। সব হাওদায় দু-তিনজন করে সাহেব, একটিতে কখনো কখনো মেমসাহেব, এই মেমসাহেবদের হাওদায় কখনো কখনো রাজকুমারকে দেখা যেতো। রাজকুমারের কথা যদি বলল, এক ঘোড়ার পিঠেই না তাকে কত রকম দেখা যেতো, কত রঙের পোশাকে। কত রঙের শুধু নয়; কত জাতের তা। আর ঘোড়াগুলোও। সেটা সব চাইতে ভালো দেখা যেতো সেই সময়ে যখন রাজবাড়ি থেকে একদল সাহেব, তাদের সঙ্গে রাজকুমারও, হাতে বল্লম, হৈ হৈ করে ঘোড়া ছুটিয়ে যেন কোনো দুর্গা আক্রমণ করতে যেতো। ঘোড়াগুলোর পায়ে পায়ে একদল কুকুর ছুটতো। পিলপিল করে, চাপা পড়তো না আশ্চর্য।
কিন্তু তা তো চিরস্থায়ী নয়। তখন তো প্রগাঢ় শীত আর কুয়াশাও বটে। শীত কমার আগেই সেই অ্যালবেট্রসে চেপেই তারা চলে গিয়েছিলো। ভোজবাজি নয়, তার প্রমাণ পথের সেই স্ট্রিট লাইটিং কিছু কিছু থেকেই গিয়েছে। রাজবাড়ির গেটে দুটো পিতল রঙের চকচকে কামান, বিলমহলে যাওয়ার জন্য হাতিঘাস বনের পথটাকে এখনো ঘাসে ঢেকে দিতে পারেনি, একটা গাছের উপরে নাকি এক কাঠের তৈরী বাড়ি এখনো আছে।
এই ক্যাম্প কেন তা নিয়ে অবশ্যই এখনকার মতো তখনো কেউ কেউ ভেবেছিলো। একই উত্তরে সকলে পৌঁছতে অবশ্যই পারেনি। সে সময়ের কোনো খবরের কাগজে লাটের এই টুর সম্বন্ধে কিছু না লেখায় এরকম সন্দেহ থাকে, তা হয়তো প্রাইভেট কিংবা সিক্রেট ছিলো। এদিকে সব লাটই যে আত্মজীবনী কিংবা মেমোয়ার্স রেখে যাবে তাও হয় না।
