তুলনা দিতে হলে একটা সুদৃশ্য জাল বুনে তার একপ্রান্তে সে যেন এখন অলক্ষিত ভাবে নিশ্চিন্ত হয়ে বসতে পারে। তাহলেও শেষ কাজটার কথা না ভেবে সে পারছে না। কিছুক্ষণ আগে শুরু হয়েছে, আলো জ্বেলে অনেক রাত পর্যন্ত করবে। জাহাজ ভিড়বার জেটি কুতঘাট থেকে সরিয়ে কিছুটা নতুন পথ করতে হয়েছে বটে, কিন্তু নদীর বাঁকটায় সেখানে জল গভীর থাকায় জেটিটা লম্বায় কম হয়েছে। বিলমহলে যাওয়ার হাতিঘাসের বনের মধ্যে দুধারে ঘাস রেখে মাঝখানের দশ ফুট পথটা দেখতে বেশ লাগছিলো কিন্তু। ওটাও খুবই ভালো, গাছের উপরে সেই দু কামরার বাড়িটা; সিঁড়িটা কতকটা মই-এর মতোই হলো, কিন্তু মহিলারা পছন্দ করলে তার উপরে থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত শিকারের দলকে দেখতে পাবে। সিমসন জানিয়েছে কুকুর পার্টির সঙ্গেই যাবে, শুয়োরবল্লমের কথা কখনোই ভুল হবে না। টেলিগ্রাম সে পেয়েছে। কিন্তু সবচাইতে ভালো বুদ্ধি হয়েছে দেওয়ানকুঠি আর রাজবাড়ির মধ্যে ফেনসিংটার ব্যাপারে। ফেনসিং খাড়া হলে তাতে রং আর নকশা থাকলেও কেমন যেন কৃত্রিম আর ন্যাড়া মনে হচ্ছিলো। তারপর বুদ্ধিটা এলো। দু-তিন গাড়ি সোনালিলতা আনা হলো তো। ফেনসিং-এ লতাগুলো তুলে দিলে একটা সোনালি বাগান স্ক্রিনের মতো দেখাবে। মনে হবে লতাগুলো সেখানেই জন্মেছে। এই লতাগুলোয় সবুজ থাকে না বলে ছ-সাত দিন অবিকৃত থাকবে।
হরদয়াল ক্লান্তিটাকে খুশির মতো অনুভব করলো। তার লাইব্রেরিতে উজ্জ্বল আলো। সেদিকে যেতে যেতে তার মনে হলো–সেটা আগামীকাল। ব্রজই দেখবে ব্যাপারটা। লাট থাকার কয়েকদিন সদর গেট থেকে দেওয়ানকুঠি পর্যন্ত, ফেনসিং-এর ধারে ধারে, রাজবাড়ির বাইরের দেয়ালে, সদর দরজার বাইরে পিয়েত্রোর বাংলোর দরজা পর্যন্ত যে আলো জ্বলবে তখন সেই আলো জ্বালিয়ে দেখা হবে। দেওয়ানকুঠির বা পিয়োত্রার বাংলোর ভিতরের আলোটা মশালচিরাই পারবে। আর এই লাইব্রেরি, লাটের শ্যালী এবং স্ত্রী কি উপন্যাসই খুঁজবে শুধু? এই সময়ে তার মনে হলো রানীমাকে কি বলা যায় আপনি বেরিয়ে আলোর মহড়াটা একবার দেখুন?
কিন্তু আর একটা কাজ আছে তার। সেদিন রানী বলেছিলেন গুণাঢ্যর কন্যা সম্বন্ধে লিখতে। হরদয়াল দাঁড়িয়ে পড়লো। রানী গুণাঢ্য কন্যাকে পছন্দ করেছেন তার একটা কারণ এই: সে মেমসাহেবের কাছে পড়ে, ইংরেজি শেখে, পিয়ানো শিখছে। রানী ইংরেজি আদব কায়দার কথা উহ্য রেখেছেন। তাহলে?
হরদয়ালের মুখে আবার হাসি দেখা দিলো। যেন সে মনে মনে বলবে–এটা কেমন হচ্ছে না? সেই কেট তো এখন প্রাইভেট সেক্রেটারির স্ত্রী হিসেবে ইংরেজ এবং খ্রিস্টান হওয়া সত্ত্বেও আদরের হলো। মুক্তোর হার হচ্ছে না? তার মনের মধ্যে যে কথাটা উঠেছিলো সেটা ফুটবার আগেই তার মনের মধ্যেই কারো রুচিতে আটকালো। শেষোক্তজন যেন বললো– বারবার কেন সেই কথা? কিন্তু সে বিস্মিত হয়ে গেলো যেন। এটা তো সে ভাবেনি। এখানকার এই নায়েব-ই-রিয়াসৎ তো তখনো ছিলেন যখন তাকে ডিঙিয়ে হরদয়ালকে দেওয়ান করা হয়। সে কি তার ইংরেজি দক্ষতা এবং বরং আধুনিক চালচলনের জন্য নয়? সেই কবে তখনই তো রানী খানিকটা আধুনিকতাকে প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। এতদিনের হিসাবটা তবে ভুল?
অসাধারণ বুদ্ধিমতী রানী। নতুবা রাজার মৃত্যুর পরে এই বিশ বছর হতে চলে, আয় কমে দ্বিগুণে দাঁড়াতো না। কিছুই ক্ষতি হয়নি, সর্বত্র বৃদ্ধি পেয়েছে। বলবে রানী ইচ্ছা প্রকাশ করে নিশ্চিন্ত, কী করে তা হবে সে চিন্তা নায়েব ও দেওয়ানের? কিন্তু ইচ্ছাটা?
কিন্তু অসাধারণ বুদ্ধিমতীর পক্ষেও ওটা একটা ঝুঁকি, বিষে বিষ দূর করার চেষ্টা হয়। যদি। হৈমীকি অসাধারণ রূপসীনয়? বলবে দুঃখিনী, আশ্রয়প্রার্থিনী, রাজবাড়িকে প্রভাবিত করতে পারে না?
সে কিন্তু এখানেই থেকে গিয়েছে। সে লাইব্রেরির বইগুলোকে দেখলো ঘুরে ঘুরে। ওটাকে স্মৃতিই বলতে হয়। প্রায় শিশু সেই রাজকুমারকে বালক ও কৈশোরে পৌঁছে দেয়া একপাশে উপস্থিত থেকে। অন্যপাশে রানী।
চিঠিটা লেখাই দরকার। সে লাইব্রেরী থেকে বসবার ঘরের ডেস্কে গেলো। সেখানেই কয়েকদিন থেকেই কাজ হচ্ছে। সেখানেই প্যাড, কলম, সিহাই।
ভাদুড়িকেই তো চিঠি, সুতরাং তার এবং তার স্ত্রীর কথা মনে পড়লো। কোনো কোনো মানুষকে দেখে মনে হয় বটে জীবন যেন নিজ বেগে উচ্ছল স্রোতমাত্র নয়, বরং যেন এক নৌকা যাকে বিচক্ষণতার সঙ্গে চালনার চেষ্টা করতে হয়। এই যোগাযোগের ব্যাপারে ভাদুড়িও একজন, কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক নরনারীর বিবাহের সে ঘোর বিরোধী। ধর্ম-বিশ্বাসে সে স্বীকার করে : সে হয়তো অজ্ঞেয়বাদী, কিন্তু বিশ্বাস করতে একমাত্র তেমন ঈশ্বরকে করা যায় যার সম্বন্ধে পুরাণে কিছু বলা হয়নি। পুরাণের দেবদেবীকে সে দুশ্চরিত্র নরনারী মাত্র মনে করে। একবার বৈষ্ণব কাব্যের কথায় রজকিনীর কথা ওঠামাত্রই সে কানে আঙুল দিয়ে নিজের বৈঠকখানা থেকে পালিয়েছিলো। থানা থেকে পালিয়েছিলো।
কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে তার বন্ধুকে লিখলো :
ব্যাপারটা সম্ভবত ক্যাচ দেম ইয়ং। রানীমাতা গুণাঢ্য মহাশয়ের কন্যাটিকে পছন্দ করিয়াছেন। তুমি তাহার বয়স বিবেচনায় নীতিগত আপত্তি তুলিতে পারো, কিন্তু গুণাঢ্যকে সংবাদটি দিবে। সংবাদ দিবার সময় তাহাকে তোমার নীতিগত আপত্তির কথা বলিতে পারো। গুণাঢ্য প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। তাহার পর সে অগ্রসর হইলে তোমাতে দোষ অর্শে না। অবশ্যই তুমি এরূপ ধারণা দিবে না যে রানীমাতা নিতান্ত আগ্রহী, শেষেরটি গুণাঢ্যের তরফে প্রকাশ হওয়া চাই।
অপর, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের কোনো সংবাদ পাইতেছি না এরূপ কিছুদিন গেলো। অবগত আছে যে রাজপরিবারের পক্ষে উক্ত সভার আমি সভ্য। এবার কলিকাতায় রাজকার্যে ব্যস্ত থাকায় যোগাযোগ করিতে পারি নাই। আমি তাহাদের ঠিকানায় পত্র দিয়াছি। কিন্তু এরূপ সন্দেহ তাহাদের ঠিকানা বদল হওয়ায় পত্র না পঁহুছিতে পারে। …
