বাগচী বিব্রত বোধ করলো বললে কমই বলা হয়। রাজকুমারের মুখ কি আলোর জন্য রক্তাভ? রাজকুমারের দাবা খেলার সঙ্গে কি এই চিন্তার যোগ থাকতে পারে? এ কি কোনো জাতিবৈর যা রাজকুমারকে বিচলিত করছে?
বাগচী কিছু বলার আগে রাজকুমার জেব থেকে রুমাল বার করে আঙুলগুলোকে মুছে নিলো। আর তখনই ভৃত্যের হাতে রূপার ট্রেতে ব্র্যান্ডি, গরম জল, চিনি, সন্তরা, রাম দিয়ে হৈমী তার পিছন পিছন এলো। রূপার ও কাঁচের ঔজ্জ্বল্যে মনে হলো গরম জলের জাগটাতে অন্য কোনো মদ আছে।
রাজকুমার হেসে বললো–মার্সি ম্যাডামোয়াজেল। তুমি পাঞ্চটা বানাতে থাকো, আমরা দুই ছাত্র শিখে নিই। কিংবা মনে হচ্ছে মিশোনোর ব্যাপারটা পরিশ্রমসাপেক্ষ; তুমি মেপে দিতে থাকো, আমি শেকিংটা করি। পিয়েত্রোকে বুজরুকের জন্য নিজের হাতে বানিয়ে দিতে দেখেছি, তাতে অবশ্য গরম জল থাকতো না। বসো হৈমী, এটা আমার প্রাইভেট চেম্বার।
হৈমীর দিক থেকে চোখ সরিয়ে রাজকুমার বাগচীর দিকে চাইলো। বললো, আপনার হাতে কি আখবরের রোল? টাইমস না কী যাতে মেফেয়ার, নাইটিংগেল, সার সিডনির কথা লেখে?
বাগচী বললো–এখন চীন আর মিশরের কথাই বেশি। চীনের যুদ্ধ। ওয়াং বিদ্রোহ।
রাজকুমার হেসে বললো–দ্যাখো, হৈমী তাহলে তো তুমি ঠিকই বলেছো। মুকুন্দ তো তাহলে ঠিকই যুদ্ধে গিয়েছে। কিন্তু ওয়াংটা ঠিক কী মাস্টারমশাই?
বাগচী বললো, ওয়াং একজন লোকের নিজের নেওয়া উপাধি। সে নিজেকে তিয়েন ওয়াং বলে। নিজেকে ক্রাইস্টের ছোটোভাই বলে, সে পৃথিবীতে তাইপিং অর্থাৎ স্বর্গরাজ্য স্থাপন করতে চায়।
রাজকুমার হেসে উঠলো, এই চমকপ্রদ গল্পটা তার ভালো লেগে গেলো। বললো–হৈমী বলেছিলো, সে যুদ্ধে ইংরেজও একপক্ষ। কেন, সেটা কি বড়ো যিশু ছোটো যিশুর যুদ্ধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
বাগচী বললো–আমার কিন্তু মনে হয়, এটা মূলত মাঞ্চু আর সিং-এর লড়াই। যুদ্ধটা গড়াতে গড়াতে ইংরেজের বাণিজ্যকুঠির দিকে গেলেই তারা জড়িয়ে পড়ছে।
রাজকুমার বললো, তা জড়িয়ে পড়া ওদের কেমন একটা স্বভাব। সেখানেও কি কোনো সম্রাট তাদের দেওয়ানি দিয়েছে? তোমার কী মনে হয়, হৈমী? তুমি তো আবার যুদ্ধ সম্বন্ধে জানো।
হৈমীর পাঞ্চ-প্রস্তুতরত হাত দুখানা থামলো, তার মাৰ্বল-সাদা গাল রক্তাভ হলো।
রাজকুমার বললো–এবারে কলকাতায় শেষের কয়েকদিন হৈমী আমাকে অনেক গল্প শুনিয়েছে। একটা বিষয় আপনাকে জানাই, মাস্টারমশাই। হৈমীর স্বামী কিন্তু খুব বড়ো যোদ্ধা ছিলেন। ক্যাপটেন বিলি। দানাপুরের অ্যামিউনিশন ডিপো তার অধীনে ছিলো।
দুটো ঝকঝকে গ্লাস মিশানো মদে পূর্ণ করে তার উপরে চাকা করে কাটা সন্তরা ভাসিয়ে দিলো হৈমী। রাজচন্দ্র বললো–ক্যাপটেনের কথায় মনে পড়লো,…কিন্তু হৈমী, তোমার গ্লাস কই? কিছু নাও। কী যেন তুমি বলেছিলে কলকাতায়–রিল্যাক। মনে পড়লো লাট আসছেন শিকারে। হরদয়াল এতদিনে জেনে নিয়েছে বনমহলের কোথায় চিতা, কোথায় হরিণ, কোথায় বা বাঘ। বুনোমোষের দিকে জেনারেল না যায় তাই ভালো। ওদের লোভ দেখিয়ে বাইরে আনা কঠিন।
হৈমী একটা গ্লাসে নিজের জন্য পাঞ্চ নিলো। এই সময়ে এই এক অদ্ভুত ভাবনা হলো বাগচীর–আজই তো সে প্রথম এ ঘরে বসছে না; কিন্তু নতুন চাকরির পরে এই প্রথম। আজই দ্যাখো আবহাওয়াটা যেন কেমন বদলে গিয়েছে, যেন কতদিনের অভ্যস্ত এই ব্যাপারগুলো।
কিন্তু রাজকুমার বললো–আমি বিলির জন্য দুঃখিত। সাতদিনের বিবাহিত জীবনের পরেই তাকে প্রাণ দিতে হলো। কিন্তু হৈমীর কাছে শুনেই আমার মনে হয়েছিলো : কানোয়ারের লোকেরা তো দেশপ্রেমের আদর্শের জন্য প্রাণ দিয়েছিলো। বিলি? এটা তো তার স্বদেশ নয়। কীসের জন্য প্রাণটা দিলো?
বাগচী হৈমীর দিকে চাইলো। সে মুখ নিচু করে গ্লাসটার দিকে চেয়ে আছে। বাগচী তাড়াতাড়ি করে বললো–লয়্যালটিও তো একটা আদর্শ। বাগচীর মনে হলো এই সময়ে, রাজকুমার কী নিদয়, যে এখানে এই কথাগুলো তুলছে? কিংবা একি একরকমের নিস্পৃহতা?
হৈমী বললো– রাজকুমার, আর একটু দেবো কি আপনাকে, এখনো গরম আছে।
রাজকুমারের আর দরকার হলো না। একটু থেমে সে আবার জিজ্ঞাসা করলো–মিস্টার বাগচী, আপনি তো একাধিকবার লন্ডনে গিয়ে থাকবেন, সেখানে কি দশসালার বন্দোবস্ত আছে?
বাগচী বললো–কিছু কিছু লর্ড আছেন যাঁরা পারমানেন্ট। কিন্তু সেখানে এই নতুনত্ব একটি ছেলেই বিষয় পায়।
কৌতুক বোধ করে রাজকুমার জিজ্ঞাসা করলো–অন্যরা তবে?
–অনেকক্ষেত্রেই আর্মিতে নেভিতে যায়, নতুবা…আজকাল কেউ কেউ ব্যবসা করতে শুরু করেছে।
রাজচন্দ্র হো হো করে হেসে উঠে বললো, তাহলে, হৈমী, মুকুন্দ ঠিকই করেছে।
সেদিন কুঠিতে ফিরতে ফিরতে বাগচীর মনে হলো, একি অন্য রাজকুমার? কিংবা এটা কি এই সন্ধ্যারই ধরন? কিছুদিন পরে, সেদিন সে কায়েতবাড়ির বিষয়ে জেনেছে (এখন তো রানী ব্যাপারটাকে প্রকাশ্যে এনেছেন, অনেকেই জেনেছে)। বাগচীর রাজকুমারের এই আবেগশূন্য হাসিটাকে মনে পড়েছিলো।
সেই সন্ধ্যায় হরদয়াল বেশ ক্লান্ত হয়ে তার কুঠিতে ফিরেছে। এখন সে বিশ্রাম নিতে পারে। মনে মনে রাজবাড়ি, দেওয়ানকুঠি, পিয়েত্রোর বাংলো, গ্রামের কয়েকটি পথ, বনমহলের এ-অংশ সে-অংশ সে তো একজায়গাতে বসেই দেখতে পাচ্ছে।
