রানীমার সামনে এসব বিষয়ে আলোচনা হয় না। হরদয়াল মুখ নিচু করে শুনলো।
রানী আবার বললেন–এখনই ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই। সুরেন তোমার কাছে যাবে। সে তো বলছে রাজকুমারের বিয়ের উপযুক্ত করে আমাদের গ্রামকে সাজাতে কয়েক লাখ ইট লাগবে। আর অঘ্রান মাসের আগে তা হয়ে উঠবেনা। (রানী হাসলেন)। এক বছরেরই ধাক্কা। ও পক্ষকেও তো প্রস্তুত হতে সময় দিতে হবে!
রানী স্নানের জন্য উঠলেন।
হরদয়াল তার কুঠিতে ফিরলো। কমিরিয়টের কনট্রাকটররা অবশ্যই জানে লাটের এরকম ক্যাম্পে কী কী লাগে। তাছাড়া তারা অবশ্যই লাটের দপ্তরে যোগাযোগ রেখে চলেছে। লাটের অসুবিধা হলে তারাও কি অসন্তোষ থেকে রেহাই পায়? ব্রজনাথ ইতিমধ্যে ঝাড়, দেয়ালগিরি, লণ্ঠন, টেবল ল্যাম্প ইত্যাদির লিস্ট করে রাজবাড়ির গুদাম তোলপাড় করছে। ছোটো আকারের কার্পেটগুলোতে পিয়েত্রোর বাংলোয় চলে যাবে, কিন্তু রাজবাড়ির নতুন কার্পেটগুলো সবই কি বড়ো মাপের নয়? সেগুলো কি দেওয়ানকুঠিতে হবে? না হলে মাপ দিয়ে কলকাতায় লোক পাঠাতে হয়। ওদিকেও দ্যাখো রাজকুমারের বন্দুক, ঘোড়া, হাতি আছে, কিন্তু সেই শোর শিকারের বল্লম? আর কুকুরও লাগে বোধহয়। তাহলে কি ব্রজকেই পাঠাতে হয় কলকাতায়? পারবে ছিপে যাওয়া-আসা করে। তার চাইতে তার করা ভালো।
কিন্তু নরেশ এলো। সে আসতে হরদয়াল বললো–সুরেন বাংলো দেখছে। তুমি পথ ঘাট দ্যাখো। কুতঘাটে জেটি তৈরীর কতদূর? এদিকে বলতে ভুলেছি, দেওয়ানকুঠি আর রাজবাড়ির মধ্যে অন্তত ফুট ছয়েক উঁচু ফেনসিং খাড়া করে দাও। দেখতে খারাপ না হয়। কাঠেরই। মাপ নাও গে। আর নায়েবমশায়কে বলে যেও, আমি বুনোদের জন্য অপেক্ষা করছি।
বুনোরা এলে জেনে নিতে হবে হরিণ, বাঘ, চিতা, কোনো কোনো অঞ্চলে পাওয়া সম্ভব। সেদিকের পথঘাটের কিছু কিছু উন্নতি করা দরকার।
.
০৪.
সন্ধ্যার আগে আগে বাগচী রাজবাড়ি পৌঁছলো। পথে হরদয়ালের লাইব্রেরি থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের টাইমসগুলোকে সে সংগ্রহ করেছে। তার সাড়া পেয়ে রূপচাঁদ, যে এতক্ষণ ফরাশ আর মশালচিদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলো, সে-ই এদিকে সারবলে পথ দেখিয়ে রাজকুমারের দোতলার বসবার ঘরে নিয়ে গেলো বাগচীকে। ইতিমধ্যে সে-ঘরের পরিবর্তন হয়েছে, কি আসবাবে, কি আলোতে। চীনা লেকারের কাজকরা ছোটো টেবিলের চারিদিকে খয়েরিতে সোনার ছাপ মখমলের গদিদার ইংরেজি সোফা। টেবিলের উপরে রূপার বড়ো শ্যমাদানে জ্বলন্ত মোমকে ঘিরে ঝকঝকে কাঁচের গোলক। সেই আলোতে একটা দাবার ছকে গুটি সাজিয়ে রাজকুমার একাই দুজনের হয়ে খেলছে।
বাগচী ভাবতে ভাবতেই উঠছিলো, তার স্বীকার করতে আপত্তি নেই সে বুঝতে পারছে না কী তার কাজ, কেন তাকে বেতন দেওয়া হবে? প্রকৃতপক্ষে আজই তো সে তার নতুন কাজে যোগ দিতে এসেছে। রাজবাড়ির ধরন-ধারণ জেনে নেওয়া তো কারো কর্তব্য হতে পারে না। রাজকুমারের সঙ্গে গল্প করা? তা তো সে করতোই, এই ঘরেই; কিন্তু আজ, দ্যাখো, ঘরটারও পরিবর্তন হয়েছে। গল্প করা? কাল সন্ধ্যাতে রাজকুমারের দেখা না পেয়ে সে যখন ফিরে যাচ্ছে তখন সদরদরজার কাছে রাজকুমারের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো। তখন কী করে হঠাৎ লন্ডনের ইভানজেলিস্টদের কথা উঠে পড়েছিলো। বাগচীবলেছিলো, ব্যবসা বাণিজ্যে হাতে টাকা হওয়ার পরেও কিছু লোক দেখলো সমাজে সম্মানটা যতটা পাওয়া উচিত ততটা তারা পাচ্ছেনা। সে রকম সম্মান তখনো বিশপ ইত্যাদির; তখন সেই লোকেরা ধর্মের দিকে ঝুঁকেছিলো এরকম একটা মত আছে। রাজকুমার হেসে উঠেছিলো। কিছুক্ষণ পরে বলেছিলো, কলকাতাতে বেশ কিছুদিন থেকে ধর্ম নিয়েই আন্দোলন। যতদূর জানা যায় তাদের বেশির ভাগ নিতান্ত মধ্যবিত্ত, ব্যবসা বাণিজ্যে টাকা হয়েছে মনে হয় না। বাগচীতখন বলেছিলো, তারাও একরকম সম্মান পান বৈকি। নিছক একজন কেরানি কিংবা শিক্ষকের চাইতে ধর্ম-আন্দোলনে যুক্ত তেমন শিক্ষক কেরানির সমাজে কিছু বেশি মান। রাজকুমার বলেছিলো, আপনার এই মত ভালো নয়! বাগচী হেসে বলেছিলো, ঠিক আমার মত নয়, একটা প্রচলিত মত, যা হয়তো কোণঠাসা কোনো বিশপ ইভাজেলিস্টদের হীন দেখাতে তৈরী করেছে। আপনি কি বলবেন, যে ধর্ম দীর্ঘ দিন নিন্দায়, ধিক্কারে কুণ্ঠিত ছিলো তা এখন নতুন রূপে নিজের স্থান খুঁজছে?
কিন্তু এসব তো সময় কাটানোর আলাপ। তার ইংরেজিতে দক্ষতাই বা কী কাজে লাগে?
বাগচী লক্ষ্য করলো, রাজকুমারের দুটো হাত যেন দু পক্ষের হয়ে চাল দিচ্ছে। বাগচী দরজার কাছে গুড ইভনিং বলে ঢুকতে ঢুকতে বললো, আমি একটা হাত নেবো কি? রাজকুমার ছক থেকে হাসিমুখ তুলো। হয়তো আধঘণ্টার চিন্তায় দু রঙের যে দুটো ব্যহ সাজিয়েছিলো ছক ধরে উল্টে দিয়ে তা ভেঙে দিয়ে, ছকটাকে একপাশে সরিয়ে রাখলো। গলা একটু তুলে বললো–কে আছো, হৈমীকে ডেকে দিও।
হৈমী দু-চার মিনিটে এলে রাজচন্দ্র বললো–ইনি হৈমী, রানীমার লোক। ইনি মিস্টার বাগচী, আমার সেক্রেটারি। তো, হৈমী কলকাতায় ব্র্যান্ডি লাঞ্চ খাইয়েছিলে। এখন একটু চাই যে। চিনিটা কমিয়ে নেবুর বদলে নারাঙ্গি দিলে কী হয় দ্যাখো।
হৈমী চলে গেলে রাজকুমার বললো, আচ্ছা, মাস্টারমশাই, আমি কী জাতি? আপনি বলেছিলেন, বিপ্লবের আগে পরে ফরাসী দেশে একটা জাতি। নেপোলিয়নের সৈন্যদল সেই জাতির হয়ে যুদ্ধ করতো। আপনি, আমি, কেট, রাজনগরওয়ালি, ডানকান হোয়াইট কি এক জাতি? দিল্লীওয়ালে মুসলমানরা মারাঠাদের বিরুদ্ধে আবদালিকে সাহায্য করেছিলো, তারা আর মারাঠীরা এক জাতি নয়। নানাসাহেব গোয়ালিয়রের বিশ হাজার সৈন্যকে টেনেছিলো সেই বর্গিরা আর রোহিলারা কি এক জাতি? ওদিকে রানীমা বড়ো রানীর এক ঘোষণাপত্রের অনুবাদ পড়তে দিয়েছেন। আমরা আর কম্পানির প্রজা নই, তাতে আমি আর ডানকান কি এক জাতি হলাম?
