-কিন্তু মুক্তো তো? হৈমী বললো।
–এই দ্যাখো, তাছাড়া আমি কি দিতে পারতাম? ভালো কথা মনে করেছে। স্যাকরাকে আজই ডাকিও তো। কলকাতায় সেই হার দুটিকে গড়াতে দেবো ভেবেছিলাম। বাকি দু নহরে দুটো বানাতে দিও। তোমার কাছেই তো আছে। বাগচী মাস্টারমশায়ের স্ত্রী তো এখন প্রাইভেট সেক্রেটারির স্ত্রী হয়ে জঙ্গীলাটের পরিবার এলে মিশবে-টিশবে। তার কী আছে আমি জানি না। আমার পক্ষ হয়ে তাকে দিও একটা। আর দ্যাখো বাপু, তুমি তো সব সাদাই পরো। অন্যটাকে তুমি সবসময়ে পরবার জন্য না হয় বানিয়ে নিলে। একেবারে গলা খালি রাখো!
নয়নতারা উঠে বললো–আপনি কি এখন স্নানে যাবেন?
রানী বললেন–তোমরা এসো। হরদয়াল ও-ঘরে অপেক্ষা করছে, তার সঙ্গে কথা বলে নিই। কাউকে বলে দিও হরদয়ালকে আসতে বলে দিতে।
রানী এখন দেখা করবেন দাসীর মুখে জেনে হরদয়াল রানীর বসবার ঘরে গেলো। এ অঞ্চলটা তো সবসময়েই স্নিগ্ধভাবে নিঃশব্দ, ফলে এ ঘরের আলাপ অ্যান্টিচেম্বারে স্পষ্টই শোনা যায়। কথাগুলো হরদয়ালের মুখে একটা স্মিত হাসি হয়ে রইলো। সে এই ভাবতে ভাবতে ঢুকলো, মুক্তোর নহরের সংখ্যায় কি যারা পরবে তাদের স্তরভেদ হয়?
ততক্ষণে রানী কথা বলতে শুরু করেছেন। সুরেনকে ডেকেছিলাম। লাটের কথা বলতেই হকচকিয়ে গেলো। বললো–যত লোকই লাগানো হোক এই শীত ঋতুতেই কি তেমন একটা করা যাবে?
-তা তো নয়ই, হরদয়াল বললো। সেজন্যই কি এখন সে নরেশকে সঙ্গে নিয়ে পিয়েত্রোর বাংলোর দিকে গেলো?
-সেটাকে কিছু করা যায় কিনা তাই বোধ হয় ভাবছে। বোধ হয় ফিরে এসে তোমাকে জানানোর মতলব।
হরদয়াল বললো–এখন কিছু নতুন করে করার সময় পাওয়া যাচ্ছে না। এরকম একটা আন্দাজ করছি, লাট আর তার পরিবারের যে দু-তিনজন তারা আপনার দেওয়ানকুঠিতে থাকতে পারবেন। আমার অভিজ্ঞতায় তা যে কোনো শহরের সার্কিট-হাউস বা কালেক্টর বাংলোর নিচু নয়। তাঁর সঙ্গী অন্য জনাদশেক অফিসার অনায়াসে পিয়েত্রোর বাংলোয় থাকতে পারবে। দেহরক্ষী টমিরা অবশ্য লাটের কাছাকাছি থাকতে চাইবে। তাদের জন্য দেওয়ানকুঠির লনে ছোলদারি টেন্ট খাটানো যেতে পারবে। সিমসন সেই রকম উদ্যোগ করছে। তবে তোষাখানা থেকে কিছু গালিচা বার করতে হতে পারে। আপনার এ ব্যবস্থা পছন্দ হলে টমিদের ছোলদারি আর দেওয়ানকুঠি ঘিরে ফুট ছয়েক উঁচু ফেনসিং-এ রাজবাড়ি থেকে তাকে আলাদা করে দেওয়ার কথাও ভাবছি। আমি কি এ ব্যাপারে আপনাকে নিশ্চিন্ত থাকতে অনুরোধ করবো?
রানী বললেন–তা যদি বলো তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি। কিন্তু রানী হাসলেন। হরদয়াল বললো–সিমসন সানিয়াল দ্বিতীয় ব্রহ্মযুদ্ধ থেকে কমিসারিয়টের কাজ করছে। সে সময়ে তো শুধু খাদ্য নয়, ঘোড়া, তবু সবই জাহাজে গুছিয়ে নেওয়ার অভ্যাস করেছিলো। এদিকে পাটনা থেকে মীরাট পর্যন্ত যে ইংরেজ সৈন্যদল ছিলো তাদের খাদ্য, তাঁবু, ঘোড়া এসবের জোগান দিয়েছে। এবার সেই সিমসনই ঘোড়া, তাঁবু, প্রভিশন ইত্যাদি পাঠাবে।
রানী খানিকটা ভাবলেন। ঈষৎ হেসে বললেন–এই সানিয়ালদের একজনই তো গুণাঢ্য লিখছে পদবী। তার কন্যা সম্বন্ধে তুমি আর কী ভাবলে?
হরদয়াল একটু ইতস্তত করে বললো–এরকম প্রচার ছিলো কনে বছর পনেরোর হয়েছে…
রানী বললেন–ঠিক নয়। তোমার বন্ধুর স্ত্রী আমাকে বলেছেন বছর তেরো হলো। ওদের সমাজে আজকাল কম বয়সের মেয়ের বিবাহ নিন্দার, সেজন্য ঘটকী বয়স বাড়িয়ে থাকবে।
হরদয়াল নিজের করতলের দিকে মুখ রেখে বললো–সেজন্যই বলছিলাম…
রানী বললেন–খোঁজ নিয়েছিলে, সংযুক্ত প্রদেশে গুণাঢ্য সত্যিই জমিদারি কিনেছে কিনা?
-হ্যাঁ, দু লাখের মতো হবে। কিন্তু একটা কথা এই, গুণাঢ্য ব্রাহ্মণ ছিলেন, কিন্তু ইদানীং ব্রাহ্ম, এবং উপবীত ত্যাগ করার কথাও ভাবছেন।
রানী বললেন–খোঁজ নিয়ে দেখেছো ওটা সত্য কিনা যে গুণাঢ্যকন্যা বিলিতি মেমের কাছে লেখাপড়া শিখেছে, দরকারে ইংরেজিতে কথা বলে কিনা?
–এটাও সত্য।
উপবীতের কথা ভাবছো? রানী হাসলেন, একটু দ্বিধা করলেন, বললেন পরে, তুমি কি জানোনা, তোতাপুরী এরকম পরিচয় দিয়েছিলো নিজের? লোটা, চিমটে, হরিণ-চামড়া সম্বল। নাগাই বলতে পারো একরকম। গত বর্ষায় শিরোমণি তাকে মন্দিরের পিছনে শালবাগান দেখিয়ে দিয়েছিলো। রাজবাড়ি থেকে ধুনির কাঠ আর সিধে দেওয়া হতো। তার কিন্তু শিখা উপবীত ছিলো না। সাকার পূজাকে ব্যর্থ পুতুলপূজা বলত।
হরদয়াল অবাক হলো। সে ভাবলো, কে এই তোতাপুরী যে একসময়ে এসে রাজবাড়ির সীমার মধ্যে মন্দিরের পিছনে শালবাগানে আশ্রয় পেয়েছিলো? সেটা কৌতূহলের নয়, সে যে তেমন আশ্রয় পেয়েছিলো সেটাই কি আবার তাকে অবাক করে দেবে? সে কিন্তু এত কাছে থেকেও এই বহিরাগতের তেমন রাজবাড়ির সীমার মধ্যে আশ্রয় পাওয়ার বিষয়ে কিছু জানতে পারেনি! এটা কি তেমন আর একটা বিষয় যা প্রমাণ করে রানী কাছারির এতগুলো সতর্ক দৃষ্টির ভিতরেও, যে কোনো সময়েই অভাবনীয় কিছু ঘটাতে পারেন!
হরদয়ালের এই অনুভূতি যখন তার অভিমানকে মৃদু আলোড়িত করছে, সে শুনতে পেলো রানী বলছেন–তাকেও তুমি উপবীত-ত্যাগী ব্রাহ্ম বলতে পারো, যদিও সে আকাশ মন্দির।
হরদয়াল বললো–আপনি আদেশ করলে এ বিবাহ হবে।
রানী বললেন–তাছাড়া আমি শুনেছিকনেকে তাদের বাড়িতে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো, রাজকুমার কেমন? তাতে সে মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে নাকি বলেছে, খুব ভালো। ওদিকে কিন্তু যতগুলি দেখলাম এইটিই সুন্দরী হয়ে উঠবে মনে হয়।
