হরদয়াল হেসে বললো–আপনি কি মনে করেন, মিস্টার বাগচী, আর্মি কমিশনে ইংল্যান্ডের রাজকীয় অফিসারদের কেউ কেউ মিথ্যা সাক্ষী দেবে না? চাইল্ড লেবার কমিশনের ফলে দেশের শিশুদের মিলের কয়েদখানায় কিংবা খনির মৃত্যু ফাঁদে যাওয়া বন্ধ হবে? ডানকানেরা যে ভালো না-ও হতে পারে এরকম প্রশ্ন তো স্বীকৃত হচ্ছে। হয়তো চরণদাসের মতো কেউ কেউ সাক্ষী দেবে।
.
হরদয়াল রাজবাড়িতে গিয়ে শুনলো, রানী খানিকক্ষণ আগে নিচের বসবার ঘর থেকে উঠে গিয়েছেন। কিন্তু সেই দাসীই বললো, আপনাকে বলতে বলেছেন, এখন সম্ভবত উপরের বসবার ঘরে থাকবেন। দোতলায় পৌঁছেও হরদয়ালকে কিছুক্ষণ বসবার ঘরের অ্যান্টিচেম্বারে অপেক্ষা করতে হলো। সে শুনতে পেলো রানী কাদের সঙ্গে কথা বলছেন। আলাপের বিষয়গুলো অনেকটাই তার কানে আসতে লাগলো। তা অবশ্যই এমন নয় যে কোনো দিক দিয়েই তাকে সঙ্কুচিত হতে হবে।
রানীর ঘরে তখন নয়নতারা আর হৈমী। নয়নতারা বোধ হয় তাকে কিছু পড়ে শোনাচ্ছিল।
হরদয়াল এসেছেন–দাসী এই খবর দিলে নয়নতারা পুঁথিটাকে পাটায় জড়িয়ে বাঁধলো। কিন্তু হাসতে হাসতে বললো, রানীমা পৌত্রকে রাজা করতে হলে ভীমার্জুনের বয়স তখন কম করেও ষাট-সত্তরে দাঁড়ায়;কৃষ্ণ তাদের সখা, তারও সেরকমই বয়স হবে। ষাট-সত্তরে কি আর গাণ্ডীব টানা যায়, না সুদর্শন তোলা যায়? বেচারীরা!
হৈমী বললো–কৃষ্ণেরও মহাপ্রস্থানে যাওয়া ভালো ছিলো, তাহলে ব্যাধের হাতে প্রাণ দিতে হতো না।
তখন কী অবস্থা দেশের! একদিকে ডাকাত অন্যদিকে ব্যাধ, তাদের হাতে ক্ষত্রিয়রা যদুবীরেরা মার খাচ্ছে। তাদের স্ত্রীদের কেড়ে নিচ্ছে। এখনকার ভীলদের পূর্বপুরুষ হতে পারে। বোধ হয় পরীক্ষিত বাদশার বাদশাহীও ছিলো দিল্লী সে পালাম তক।
রানী খিলখিল করে হেসে উঠলেন-বললেন, খুব হয়েছে। হৈমী, তাহলে কলকাতায় এরকম আলোচনাও তুমি শুনেছো? কৃষ্ণ ঐতিহাসিক মানুষ একজন, বিষ্ণু নন? তোমরা আমাকে ব্রাহ্ম না করে ছাড়বে না দেখছি।
নয়নতারা বললো–আমাদের শিরোমণিমশায়
–তার আবার কী?
এক গল্প ছড়াচ্ছে আবার। আমাদের রাজবাড়ির পুরোহিতমশায় সেদিন বলছিলেন। শিরোমণিমশায় নাকি তাকে কী কথায় ধমকে দিয়েছেন, তুই তো বাপু ব্রাহ্মই। রোজই তো যা ভেবেছিস, বলেছিস, করেছিস, স্বপ্ন দেখিস সবাই তো ব্রহ্মকে সমর্পণ করিস।
রানী হেসে বললেন–সেকেলে ব্রাহ্মণদের রসিকতার তল নেই। হৈমী, এবার বাপু তুমি ওঠো। রাজুকে দেখছিলাম ময়লা পায়জামা আচকান পরতে। তুমি বাপু, কলকাতায় ওর পোশাক ভালো রাখতে, এখানেও তেমনি রাখো। ওর ঘরের আলমারিটা আজ খুলল। কে যেন বলছিলো ঘোড়ায় চড়ার, শিকারে যাওয়ার, এমনকীনাকি ঘোড়ায় চড়ে শোর মারারও আলাদা আলাদা পোশাক দরকার হয়। তা কি আছে ওর? না হয় কাউকে দিয়ে খালেক ওস্তাগরকে খবর দিও।
হৈমী উঠে দাঁড়িয়ে বললো–সিমসন তো রাজকুমারের দলের সঙ্গে অনেক কাপড় চোপড় দিয়ে গ্রাহামকে পাঠিয়েছে। সেই আর্মির টেলার। রাজকুমারের পোশাক বানাতে শুরুও করেছে।
দ্যাখো, রানী হেসে বললেন, হরদয়ালের কী রকম সবদিকে দৃষ্টি। জানো,নয়ন, এবার কলকাতায় অনেক নতুন ব্যাপার হয়েছে, তাই না, হৈমী? আমাদের রাজু এবার পীরালি হতে পেরেছে।
হরদয়ালের বাবুর্চি সোলটান আর পিয়েত্রোর বাবুর্চি বান্দার রান্নাই খুব খেয়েছে। শোর টোর কীসব খেয়ে থাকবে।
নয়নতারা বললো–অ্যা, মাগো!
হৈমী বললো–না, রানীমা, শোর একদিনও ছিলো না।
রানী বললেন–তবে যে সেই মেয়েটি, আমাদের হরদয়ালের বন্ধুপত্নী বললো, মহাভারতেই আছে–অর্জুন তো বটেই, এমনকী যাকে নিরামিষাশী বলে চালাচ্ছো সেই শিবঠাকুরও দারুণ শশারভক্ত ছিলেন। তাই মরা শোর নিয়ে নাকি যুদ্ধ, নাকি এক কাব্যও আছে।
নয়নতারা হেসে বললো–দেখলেন, ওরা কলকাতায় এখন ইংরেজদের মতো বুদ্ধিমান হয়েছে, কাব্যের মানে করতে আটকায় না আর।
রানী আবার বললেন–জানে আবার না? আমাকে সেই ভাদুড়ীবউই বলেছিলো সঙোসকিতো নামে নাকি এক ভাষা আছে, আর তাতে নাকি গোগ্নো বলে এক শব্দও আছে, যাতে প্রমাণ মুনি-ঋষিরা আকছার ভগবতী খেতেন আর তাতেই পোষ্টাই।
নয়নতারা খিলখিল করে হেসে বললো–এবার আমাদের রানীমা বেশ জ্ঞান নিয়ে ফিরেছেন। ভাগ্যে তিনি বলেননি ভগবতী খাওয়া ছেড়েই হিন্দুরা যুদ্ধে হেরেছে বারবার।
হৈমী বললো–কিন্তু রানীমা, দুবার তো ভোজ হয়েছে, দুবারই কিন্তু হরিণ, তিতির আর হাঁস শিকার করেছিলেন রাজকুমার। কলকাতার কাছেই তো জঙ্গল। হরিণ খেতে খেতেই তো এখানকার জঙ্গলে হরিণ আর নদীতে চখা শিকারের কথা উঠলো জঙ্গীলাটের।
রানী বললেন–দ্যাখো আমাদের হরদয়ালকে; দরকারে সে কেমন হরিণসমেত জঙ্গল জোগাড় করতে পারে। কিন্তু হৈমী, তোমাকে যেজন্য ডেকেছি তাই জিজ্ঞাসা করা হয়নি। তুমি কি জঙ্গীলাটের স্ত্রী আর শ্যালীকে হার দুটো দিয়ে আসতে পেরেছিলে, তাদের হাতেই? রাজু কি সঙ্গে গিয়েছিলো? হার পছন্দ হয়েছে তো?
হৈমী বললো–ভেবেছিলাম একই প্রায় দেখতে, স্ত্রী আর শ্যালীতে গোল না বাধে। কিন্তু রানীমা, ওদের অত দামী না দিলেও হতো।
রানী হেসে বললেন–পাগল কোথাকার! লক্ষ্য করোনি ওটা একটা পুরনো সাত নহর ভেঙে তার পাঁচ নহরে দুটো বানিয়ে ওদের দেওয়া হয়েছে। আর গোল হওয়ার কথাও নয়, একটা তিন নহর, অন্যটা দু নহর ছিলো।
