প্রকৃতপক্ষে বাগচীর ঘুম তো আগেই ভেঙেছিলো, সে শুয়ে থেকে এসবই ভাবছিলো। সে অবাক হয়ে যাচ্ছিলো, আশ্চর্য, এদিকটা সে ভেবে দেখেনি। নায়েবমশায় না বললে সে আশঙ্কাই করতো না।
রাজকুমার এসেছেন শুনে সে উঠে বসলো। কোনোরকমে প্রস্তুত হয়ে সে বসবার ঘরে পৌঁছে দেখলো, সেই প্রায়ান্ধকার ঘরে দাঁড়িয়ে কেট রাজকুমারের সঙ্গে গল্প করছে।
রাজকুমারের মুখে খুশি চকচক করছে।
বাগচী বললো–ঘর অন্ধকার তো। জানলা খুললে রোদ আসতে পারে।
রাজচন্দ্র বললো–থাক মশায়। গেঁয়োমানুষ গাঁয়ে ফিরেছি। এবার যাও, কেট, শিগগির তিন কাপ কফি। ওসব জানলা দরজা খোলা-টোলা কাল থেকেই হৈ চৈ ধুন্ধুমার করে রাজবাড়িতে হচ্ছে না মনে করো? জানো, কেট, এখানে তোমার বাড়িটা যেমন এক পালানোর জায়গা তেমন কলকাতায় ছিলো না।
কেট কফি করতে গেলে বাগচী জিজ্ঞাসা করলো–ভালো ছিলেন কলকাতায়? ভালোই দেখাচ্ছে আপনাকে।
-তা ছিলাম। রাজচন্দ্র নিজেই একটা জানলা খুলে দিলো। খানিকটা কোমল রোদ এসে পড়লো। তার মধ্যে বসে সে আবার বললো–বোধ হয় কানে কিছু কম শুনছি, আর হজমটা কেমন হচ্ছে ঠিক ঠাহর করতে পারছি না।
বাগচী কি অভ্যাসের ফলে চিকিৎসার কথা ভাবতে গেলো?
রাজচন্দ্র বললো, মানুষ অত শব্দ করে কেন, বলুন তো? খেতে বসেও অত কথা? তা মশায়, ওটা আপনার অন্যায়-ওই লোকগুলোর কথা আমাকে আগে থাকতে না বলে। দেওয়া।
কাদের কথা বলছেন, রাজকুমার?
–কেন, দিনকর রাও, সালর জং, জং বাহাদুর রাণা।
–এরা?
–আমি কি জানতাম, এঁরা কত আধুনিক, কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন?
কেট এলো কফি নিয়ে। রাজচন্দ্র বাঁচালে বলে কফি টেনে নিলো।
এই সময়ে কেট লক্ষ্য করলো রাজচন্দ্রের গায়ের পুলোভারের ডিজাইনটা উল্টো উল্টো লাগছে। আরো একটু ভালো করে দেখতে গিয়ে সে বুঝলো সেটা উল্টো করে পরা হয়েছে। রাজচন্দ্রও বুঝলো সে কিছু ভুল করেছে, অনুমান করলো তা পোশাকেই। বললো–ও, কেট, কফিটুকু খেতে দাও, তুমিও দেখছি হৈমবতী।
কেট নিজের সঙ্কোচ কাটাতে তাড়াতাড়ি বললো–হৈমবতী কী?
কী না, কে। তোমার মতোই, আর তারও আছে একজনের পোশাকের দিকে এমন ট্যারচা করে চাইবার অভ্যাস।
-কে হৈমবতী, রাজকুমার? কেট এই বলে অনুমান করতে চেষ্টা করলো, রাজবাড়িতে এই নামের কোনো মহিলা কি এসেছেন?
রাজকুমারের পোশাকের উপরে এমন দৃষ্টি নয়নতারা ছাড়া আর কার হতে পারে?
রাজচন্দ্র বললো, তুমি হৈমীকে দ্যাখোনি বুঝি? তোমার মতোই বরফে তৈরী, চোখ দুটোতে তোমার যেমন সোনার ভাব, তার তেমন নীলের। তা, তোমার মতোই সুন্দরী বলা যায়।
কেট একটু রঙ্গভরে বললো–কিন্তু নয়নঠাকরুনের চাইতে
রাজচন্দ্র বললো–তিনি কি আছেন গ্রামে?
কফি শেষ করে রাজচন্দ্র উঠলো। হেসে বললো–আর একদিন আসবো কেট। নতুন কয়েকটা স্কোরশীট এনেছি। ভালো কথা, তুমি কি জানতে, কেট, প্রকৃতপক্ষে লাট তিনজনা? জঙ্গীলাটের এক শ্যালী আছেন, তাঁরও পিয়ানোর বাতিক। আমি তাঁকে তোমার কথা বললাম। যদি আসেন এখানে তখন দেখবো বাগচী মাস্টারমশায়ের পোশাক নিয়ে কী হেনস্তা করো তুমি!
বাগচী অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলোতাঁরা কি এই গ্রামে আসবেন?
রাজচন্দ্র এই বিস্ময়ের সুযোগে দরজার কাছাকাছি চলে গিয়েছিলো, সেখানে দাঁড়িয়ে হেসে বললো–আমাদের হরদয়াল পারেও বটে। ভাগ্যে আমাদের খানিকটা জঙ্গল আছে আর তাতে বাঘ, চিতা, হরিণ, মোষ এসব থাকতে পারে।
তারা অবশ্যই দরজা পর্যন্ত এমনকী কুঠির গেট পর্যন্ত এগিয়ে গেলো। ঘোড়াটা ল্যাজ নেড়ে দুলকি চালে চলতে আরম্ভ করলে বাগচী বললো–একটা হাওয়ার মতো, নয়?
.
০৩.
তখন জঙ্গীলাটের সপারিষদ সপরিবার রাজনগরে ক্যাম্প করা, শিকার করা ইত্যাদির সংবাদে আর সংশয় নেই। ব্রজ, নরেশ আরো কিছু সংবাদ এনেছে। হৈমীও তো তাদের সঙ্গেই পরে এসেছে, তার কাছেও কিছু সংবাদ থাকবে। রাজকুমার, হৈমী, ব্রজ ইত্যাদির গ্রামে ফেরার দিন চারেক পরে রানী হরদয়ালকে ডেকে পাঠালেন। হরদয়াল অনুমান করলো রানী অবশ্যই জঙ্গীলাটের ক্যাম্প সম্বন্ধেই বলতে চান।
হরদয়ালের কিছু দেরি হলো দরবারে যেতে। কারণ তখনই বাগচী এসে বসেছিলো। সে ইন্ডিগো কমিশন সম্বন্ধে কিছু বলতে চায়। সে তত ইতিমধ্যে চরণের সঙ্গে আলাপ করেছে। নায়েবমশায়ের কাছে যা সে শুনেছিলোতা চরণকে বলে জিজ্ঞাসা করেছিলো, রোজ দেখা হচ্ছে, এসব তো বলোনি? দারুণ লজ্জায় চরণের মুখের চেহারা বদলে গিয়েছিলো, একবার তো মনে হলো সে ফেঁপাচ্ছে। অবশেষে বলেছিলো, এরকমই আমরা। গোপালদারই তো সবচাইতে শক্তি, সে এখনো বলছে, ভাবছি। তার পাড়ার যারা দরখাস্ত করেছে তাদের অন্তত পনেরোজনকে অনুরোধ করেছি। মুখ ঘুরিয়ে থাকে, যেন চেনে না। বাগচী হরদয়ালকে সমস্যার কথাই বললো। হরদয়াল মিনিট পাঁচ-সাত চুপ করে থেকে বললো, আপনাকে এখনই হতাশ হতে বলি না; কিন্তু কুমীরের সঙ্গে জলে থেকে বিবাদ না করার প্রবাদটা কত দিনের ভেবে দেখুন।
বাগচী বললো–আমি ভাবছি কমিশন চলে যাওয়ার পরে কী হয়।
এই সূত্রেই বড়ো ইংরেজ এবং ছোটো ইংরেজের আলাপ উঠবে এমন হলো। তারা দুজনেই ক্লাইভ ইম্পের কথা জানতো, বার্ক শেরিডানের কথাও। বার্ক শেরিডানের বক্তৃতা তো গ্রন্থাকারেই হরদয়ালের লাইব্রেরিতে। তারা জানতে অস্ট্রেলিয়া আফ্রিকায় যারা আদিবাসীদের গুলি করা আর পশু শিকার করা একই মনে করে, এবং সে রকম গুলি করে এসে লাঞ্চ বা ডিনারে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে, স্ত্রীদের সঙ্গে, হাসি তামাসা প্রণয় করে, বাইবেল পড়ে, যারা ধর্মের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আমেরিকা গিয়ে সেখানকার রেড ইন্ডিয়ানদের নির্মূল করে নিজেদের মহাবীর মনে করেছিলো, যারা পশ্চিম আফ্রিকা থেকে জাহাজের খোলে ভরে ক্রীতদাস চালান দেয়, আর যারা সেখানে খ্রিস্টধর্ম প্রচার করে, তারা একই ইংরেজ জাতি। সে জাতে হিগিন-বোথামের মতো দাস ব্যবসায়ী এবং উইলবারফোর্সের মতো ক্রীতদাস-মুক্তির আন্দোলনে সমর্পিত-প্রাণ মানুষ আছে, নীলকর ডানকান আছে, আর্চি হিল আছে, উইলিয়াম জোন্স, হেয়ার,বীটন আছে। তারা সুতরাং এদিকে আলোচনায় গেলো না।
