.
সর্বরঞ্জনপ্রসাদ অবশ্যই সেদিন অ্যালবেট্রসের কথা শোনেনি। সেও নিতান্ত ভারাক্রান্ত মনে নিজের বাসার দিকে ফিরে চলেছিলো। গঞ্জের উপর দিয়ে তাড়াতাড়ি হবে। তা করতে গিয়ে সে ভুলে গেলো, দুদিন আগেই প্রতিজ্ঞা করেছিলো এ পথটাকে সে ভবিষ্যতে বর্জন করবে। পরপর কয়েকটি কুমোরদের চালা। সেখানে কুমোরেরা পট ও প্রতিমা তৈরী করছিলো। বয়স্ক পুরুষ, নারী, বালক, বালিকা সকলেই কাজ করছে। বালকদের মধ্যে তার পরিচিত ছাত্ররাও কয়েকটি। অবাকই লাগে দেখতে, সাদা সরার উপরে কী অবলীলায় তুলি টানছে সেই বালকেরা এবং স্ত্রীলোকেরা। কিন্তু সেখানে কোনো ভদ্রব্যক্তিরই থাকা চলে? অধোবদনে পালাতে হয় না? কী এত অভূতপূর্ব নির্লজ্জতায় সেই কুমোরেরা নারীদেহের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ তৈরী করছে। নিতম্বের বর্তুলতা এবং মসৃণতা, স্তনের বর্তুলতা এবং তারও মসৃণতা, এমনকী পা দুটির সন্নিহিত ভাজ। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে পালিয়েছিলো সর্বরঞ্জন। তাড়াতাড়ির মাথায় এখন সেখানেই এসে পড়ে বিপদ থেকে বাঁচার জন্য চোখ তুলতেই সে দেখতে পেলো, তেমনি বড়ো বড়ো দুটো প্রতিমাকে শাড়ি পরানোর তোড়জোড় চলেছে।
হতাশ, বিপন্ন, দুঃখার্ত সর্বরঞ্জন কী ভাববে তাই ভেবে পেলো না। একবার তার মনে হলো, এই গ্রামে এমনই সব ঘটবে। কী ভয়ঙ্কর এই এক আদিম অন্ধকার।
কিন্তু সত্যকে স্বীকার না করে উপায় নেই। প্রকৃতপক্ষে সেদিনটা তো ভলোই ছিলো। সকাল দশটাতেই তার প্রমাণ পাওয়া গেলো। গম্ভীর সর্বরঞ্জন হেসে ফেলো। এমনকী কথা বলার ছন্দে গোলমাল হয়ে গেলো। সে বললো–দেখে যাও, দেখে যাও, দিদির চিঠি।
ব্রহ্ম-ঠাকরুনের চিঠি। সে লিখেছিলো গুণাঢ্যমশায়ের কন্যাকে রানীমা পছন্দ করেছেন।
.
০২.
অ্যালবেট্রসে জঙ্গীলাটের আসার সংবাদ হরদয়ালকে অবশ্য নিশ্চিন্ত করেছিলো। জঙ্গীলাট, তার পরিবারের মহিলারা। তার দেহরক্ষী দল, তার অফিসাররা। তাদের জন্য তাঁবু ইত্যাদি, তাদের প্রভিশন, এসব নৌকো, পাসি, বোট আনা সহজ ছিলো না। এখন তো এই একটা জাহাজে সবই ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। এমনকী কয়েকটা ঘোড়াও আসবে সঙ্গে। এ বুদ্ধিটা সিম্পসন সানিয়াল কম্পানি ভালোই করেছে।
কিন্তু তখন আসল সংবাদ তো রাজকুমারের ফিরে আসা।
সেই সকালে কুয়াশার গায়ে রোদ খেলা করছে তখন। কেট তাদের কুঠির সেই কিচেন গার্ডেন থেকে ভাসের জন্য ফুল সংগ্রহ করতে গিয়েছিলো। সে জানতো না, সহিস মূলা লাগিয়েছিলো। সহিস কেটের কাঁচি চেয়ে নিয়ে মূলার কচিপাতা সংগ্রহ করে দিচ্ছিলো। কিছু দূর থেকে তাদের চেনা যায় না কুয়াশায়। কিন্তু কেট সম্ভবত শাকের ব্যাপারে খুব বেশি মনোযোগ দিয়েছিলো, নতুবা কুয়াশার ওপারের খুরের শব্দ, চামড়ার শ্যাড়লের মৃদু কাঁচকোচ শব্দ কানে আসতো। সেজন্যই সে চমকে উঠলো যখন সে অনুভব করলো একটা ঘোড়া ঠিক তাদের কাঁধের উপরে নাক ঝাড়লো। অনুভূতিটা ঠিক নয়। সে দেখতে পেলো ফেনসিং-এর ধারে লাগানো স্থলপদ্ম ঝোপটার লম্বা লম্বা ডালের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া আর তার সওয়ারকে অস্পষ্টভাবে হলেও দেখা যাচ্ছে। এক মুহূর্ত ভয়ে ভয়ে কাটিয়েই সে চিনতে পারলো। আর তখন দৌড়ে স্থলপদ্মটার গোড়ায় গিয়ে সম্ভাষণ করলো রাজকুমার!
রাজকুমার বললো–আমি ভাবছিলাম, কেট, শীত পড়েছে, একটু কফি খেলে হয়, কিন্তু তুমি তো গৃহকাজে বাঁধা।
কেট হেসে বললো–আ, ডারলিং, খুব হয়েছে। আসুন।
বাড়িটাকে ঘুরে আসতে রাজকুমারের যে সময় লাগে তার মধ্যে কুঠিতে ফিরে, হাত পা, জামা, চুল থেকে শিশির ও ভেজা কুটো সরিয়ে, বাগচীর ঘুম ভাঙিয়ে, রান্নাঘরে কফির জল চাপিয়ে, বাইরের দরজা খুলে দেওয়ার সময় করে নিতে কেটকে তো পরিশ্রম করতেই হলো। ফলে সে যখন পার্লারে রাজকুমারকে ডেকে আনছে, তার বুক মৃদু ওঠাপড়া করছে, গাল দুটো লাল হয়ে উঠেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পার্লারের জানলাগুলো ভোলা যায়নি, ফলে সেখানে অন্ধকার; কুশনগুলো অগোছালো, পর্দাগুলো বিপর্যস্ত। কেট রাজকুমারের দৃষ্টি আকর্ষণ না করে সেসব দিকে ঝুঁকতেই রাজচন্দ্র বললো–অন্ধকার থাক, তুমি কফি আনো।
বাগচী ঘুম ভেঙে রাজকুমারের কথা শুনে ততটা বিস্মিত হলো না, যতটা হলো সে এই সকালেই তার কুঠিতে এসেছে শুনে। কাল দুপুরে সে রাজবাড়িতে গিয়েছিলো। জানুয়ারি থেকেই সে যাচ্ছে, কারণ নতুন চাকরিটা তো সে গ্রহণ করেছেই। আর রাজবাড়ি সম্বন্ধে যদি জানতে চাও তবে নায়েবমশায়ের চেম্বারেই তো সংবাদ। সেখানেই সে কাল শুনেছিলো : ছিপ ফিরেছে, রাজকুমারের বোট সুতরাং বিকেলের পরপরই কুতঘাটে ভিড়বে। নায়েবমশায় আলোচনা থামিয়ে তখনই ঘাটে যানবাহন রাখার বন্দোবস্ত করতে উঠে পড়েছিলো।
আলোচনাটা আর বিশেষ কী? বাগচীর মনে হয়েছিলো কমিশনের ব্যাপারে সে যেটুকু করেছে, তাতে মরেলগঞ্জের সঙ্গে অসদ্ভাব ঘটার সম্ভাবনা। এখন তো সে রাজবাড়ির সঙ্গে জড়িতই। তাই অসদ্ভাবটায় রাজবাড়িও জড়িয়ে না পড়ে। আগে থেকে নায়েবমশাইকে জানিয়ে রাখা ভালো। সুতরাং সে কমিশনের কাছে দরখাস্ত নালিশ লিখে দেওয়ার কথা বলেছিলো নায়েবকে। নায়েবমশায় শুনে বললো, আমার মনে হয় এসব ব্যাপারে রায়মশায় ভালো বুঝবেন। আমার খবর এই, যারা দরখাস্ত পেশ করেছিলো চরণ তাদের খুব বোঝাচ্ছে, কিন্তু অনেকেই সাক্ষী দিতে চাচ্ছে না। দোষও দেওয়া যায় না। ডানকান জনাত্রিশেক রায়তকে তৈরী করেছে যারা ডানকানের প্রশংসা করে সাক্ষী দেবে।
