নায়েব বললো–প্রথা, তায় আবার কথা।
পুরুতঠাকুরের দরজায় এসে নায়েবগিন্নি বললো–তুমি কিন্তু, বাপু বাইরে থাকে। স্নান করোনি, পায়ে জুতো।
দরজার বাইরে নায়েব। তা দাঁড়ানোই বা কেন? তারই বা কাজের অভাব কী? এখানেও তো রাজবাড়ির টাকাতেই কাজ হচ্ছে, আর এসবের হিসাবও যাবে যথাকালে তার সেরেস্তাতেই। যদিও তার হিসেবী মনে গোড়া থেকেই এটা অপচয়। কার বাড়ি, কে করে মেরামত! এই বাংলোরই ওদিকে হচ্ছে লাঞ্চ। সবই তো সেই বেওয়ারিশ ফৌৎ ফিরিঙ্গি পিয়েত্রোর। ঘরগুলোর দেয়াল পাকা, ছাদ খড়ের। তিনপো হাত পুরু খড়ের ছাদ। নতুন খড়ে ছাওয়া চলছে। চৌচালার জোড়গুলি বাঁশের জাফরি করে চেপে বসানো চলছে। দেয়ালে রং পড়বে, ভাঙা শার্সিগুলোকে পাল্টানো হচ্ছে। কিন্তু মিস্ত্রি কারিগরদের এখন কেউ নেই। ছাদে দুচারজন আছে, হাতের কাজ শেষ না করে গেলে যাদের অসুবিধা। তা বেলা হয়েছে বৈকি। রোদটা আর মিষ্টি নয়। লাঞ্চের জন্যই মেরামত, সে তো কাবার, কিন্তু মেরামত আরো দুচার দিন চলবে। তো, রানীর হুকমৎ।
মিনিটদশেক পরে নায়েবগিন্নি ফিরলো। দুপুর রোদের ঘাসে ঢাকা মাঠ পার হয়ে নায়েব তার পিছনে গোরুর গাড়িতে গিয়ে বসলো।
গাড়ির বাইরেটা যেমন সুদৃশ্য, ভেতরটা তেমনি সযত্নে গোছানো। পুরু করে খড় বিছানো, খড়ের চাটাই, তার উপরে সতরঞ্চ তোশক, তার উপরে সাদা জাজিমের ধবধবে ফরাস। দু-তিনটে তাকিয়া গির্দা। দুজন তোবসে-শুয়ে সুখে যেতে পারবে। ধাক্কাধাক্কি, ঝাঁকি ঝাপ্টা নিশ্চয়ই কম।
প্রথমে গিন্নি পরে নায়েব গাড়িতে উঠলে গাড়োয়ান বলদ এনে জুতলো। দুই-ই সাদা, দুটোই বেশ বড়ো।
নায়েবগিন্নি বললো–আরাম করে বসোনা হয় এই তাকিয়া নিয়ে শোও। গাড়ির পাশেই নগদী। নায়েবগিন্নি মুখ বাড়িয়ে বললো–বাবুমশায়কে তামুক দিও।
নগদী প্রস্তুতই ছিলো। গাড়ি ছাড়বার আগে নায়েবমশাই-এর রুপোর ডাবায় তামার ঢাকনদার ছিলিম পরিয়ে হাতে ধরিয়ে দিলো। নায়েব জোড়াসনে বসে ডাবায় মুখ দিলো।
গাড়ি ছাড়লে নায়েবগিন্নি হাসলো, বললো–—রক্তচন্দন না ছাই!রাজবাড়ির শিবপূজাতেও শ্বেতচন্দনই লাগে যেমন আমরা দিই। লাল রঙের জন্য একছিটে লালই লাগে। কিন্তু তাই বা কেন বলো?
কী?
–সে নাকি? বলবো কথাটা? তোমাকে বলতে আর কী? আর পুরুত যেমন মুখপাতলা দেখলাম সবাই জানবে ক্রেমে।
কী? বললো– নায়েব।
সে ভাবলো : এই চিরদিনের স্বভাব, আধখানা করে কথা বলে আস্ত মানুষকে পাগল করে। তা ভালো বাপু, দুপুরে অমন করে একদৃষ্টে নদী দেখার চাইতে এও ভালো।
বললো– নায়েব আবার বলল শুনছি।
–সে নাকি, নায়েবগিন্নি বললো, গাড়োয়ান না শোনে এমন করে গলা নামিয়ে রানীর নিজের বুকের রক্ত!
নায়েবগিন্নি কতদূর অবাক হয়েছে তা বোঝানোর জন্য গালে হাত রেখে মুখটাকেও চট করে ঘোরালো একদিকে। বুকের রক্ত? রানীমার? পিয়েত্রোর হাওয়াঘরে বসানো শিবলিঙ্গের গোড়ায়!
নায়েবগিন্নি বললো––শুনছো?
নায়েব ভাবলো, কী যেন সে ভাবছিলো, তাই তো, কেমন হলো না! এরকম সময়ে। সে সাধারণত যা বলে তাই সে বললো, তা হবে।
গাড়ি চলছে; এখনো এক-দেড় ঘণ্টার পথ। নায়েবগিন্নি বাইরের দিকে চাইলো। বলদ দুটো দেখার মতোই। একটু ভালো করে দেখলে কিন্তু বোঝা যায়, দুটোই সমান সাদা নয়। একটার ঝুঁটির কাছে পিঠে বেশ খানিকটা কালচে দাগ আছে। ওদিকে দুটোর শিঙেই এক বকমের পিতলের তাগা পরানো। গলাতে ঘণ্টা বাজছে টিং-টিং করে।
চোখ সরিয়ে আনলো নায়েবগিন্নি। নগদীকে ডাবা ফিরিয়ে দিয়ে নায়েব তখন থেকেই তাকিয়ায় মাথা রেখে চিত হয়ে শুয়েছে। ঘুম নয়। অনুমান হয়, ছই-এর ভিতর দিকের বাঁশ ও বেতের কাজ একদৃষ্টিতে দেখছে। তা দেখার মতোই, বাঁশের বাতা দিয়ে যেন বালুচরীর নকসা তুলেছে।
নায়েবগিন্নি শায়িত নায়েব-ই-রিয়াসকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো। পদের সঙ্গে এখন পোশাকে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। যেমন হাতের হীরার আংটি, হাতির দাঁতের ছড়ি, গরদের পিরহান। এসবে রানীমা খুশি হয়েছেন। নায়েবগিন্নিকে প্রকাশ্যে সুগৃহিণী বলেছেন। কিন্তু ধুতি? দ্যাখো ব্যাপারটা। চওড়া কালোপাড় ধুতিটার পাড় বরাবর সত্যি খানিকটা ধুলো কাদায় ময়লা। চিরদিনই তো এরকম ধুতিই পরেন। তাহলে কি চালটা বদলেছে? আগের তুলনায় অতটাই ঝুঁকে পড়েই হাঁটেন নাকি?
নায়েবগিন্নির চোখ দুটি পিটপিট করলো। মণির চারিদিকে সাদা জায়গাটা ব্যথা করে উঠলো। গোপনে দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলো সে। ঠোঁট চেপে ধরা যায় দাঁত দিয়ে, কিন্তু মণির চারিদিকে সাদা জায়গাগুলোতে যখন জল আসছে মনে হয়, বুকের মধ্যে অনেক জলের ঢেউয়ে গলা বন্ধ হয়ে আসে, তখন চোখের কোণ প্রায়ই শুকনো থাকে না। বুকের ওঠাপড়াও গোপন রাখা যায় কি? তখন আবার বুজরুক, পিয়েত্রো, গোবর্ধনদের সেই ব্যাপারটা মনে ফিরে এলো নায়েব এখন ঝুঁকে পড়ে হাঁটেন তা ভাবতে গিয়েই যেন! যেন সে ব্যাপারটাই দশাসই মানুষটাকে নুইয়ে দিয়েছে।
নায়েব নিশ্চিতই ছই-এর বাঁশের সূক্ষ্ম কারুকার্য দেখছিলো, কিন্তু সে তোনায়েবও বটে। সে কি নায়েবগিন্নির বুকের ওঠাপড়া দেখেনি? সে মুখ ঘুরিয়ে পাশ ফিরে শুলো।
নায়েবগিন্নি বললো–আর পুরুষের কী বুদ্ধি দেখো! ঘোড়া আর বন্দুক কেনার টাকা আমিই তো দিয়েছিলাম ছেলেকে। ভাবতাম, যে কালের যা। একদিন, দ্যাখো, খামে পুরে সেসব টাকা ফিরত পাঠালো পেত্রো। বলো, তখন কি আর গোপন রইলো? টাকা নেয়াটা ছিলো, তাহলে, আমার ছেলেকে পরখ করা।
