মরেলগঞ্জ থেকে নদীর ধারে যেতে কিংবা ফরাসডাঙর উপর দিয়ে যেতে হয়। মাছ কিনতে গোপাল দাস নদীর ধারে যাওয়ার পথে চরণদাসের বাড়িতে এসেছিলো ভোর সকালে। চরণ শুনে বলেছিলো, তোমার সুখের কমতি নেই, গোপালদা। কিন্তু চলো যাই বলে সে-ও সঙ্গী হয়েছিলো। বাছাই মাছ পেতে নদীর ধারই ভালো।
তারা একা একা যখন তখন তো ভাবেই, একত্র হলে ভাবনাটা বাড়া স্বাভাবিক।
চরণ বললো–এ মাসের শেষ থেকে তো আমাদের সাক্ষী দিতে শুরু হবে।
গোপাল নিস্পৃহভাবে বললো–বামুনাদিয়াড়া, শালুকডুবি, হিমায়েতপুর সেরে কাল নাকি সদরের দিকে গেলো। কালেক্টরও নাকি সঙ্গে আসবে তখন এখানে।
চরণ জিজ্ঞাসা করেছিলো কিছু বুঝলে সেখানে কী হলো?
কী করে জানব? কাল বিশে চাষ দিচ্ছিলো। বিশেকে তুমি চেনো না এমন নয়। তার দরখাস্ত ঠিক করতে হেডমাস্টারের একবেলা লেগেছিলো। জিজ্ঞাসা করলাম ওসব জায়গার রায়তরা কমিশনে কী বলেছে, না বলেছে। বিশে লাঙল ঘুরিয়ে নিয়ে দূরে গেলো যেন কানে শোনে না।
চরণ একবার গত সনেই ইলিশের কথা তুলেছিলো। সেখান থেকে সরে এসে আবার বললো–বামুনদিয়াড়া, শালুকডুবি সব তো রাজার জমিদারিতেই, সেখানে তো গুড় হতো।
-হতো তো। শাবাবু আর পালবাবু পত্তনিদার। ডানকানের সঙ্গে কমিশনে নীলের চাষ করায়।
খবরটা দুজনেরই জানা, আলাপে বিষয়টাকে এনে খতিয়ে দেখলো যেন।
খানিকটা গিয়ে গোপাল বলেছিলো–এসব কী শুনি, চরণ, তোমাদের গ্রামে ইংরেজি মাসেই নাকি কারা সব আসবে? তারাও সব ইংরেজ নাকি?
-তুমি হাসালে গোপালদা, জঙ্গীলাট বাঙালি হবে, না মুসলমান?
নদীর ঘাটে ইলিশ তো অবশ্যই উত্তেজনার কারণ, ক্রেতা জেলে ফড়ের ভিড়। নামানো চুবড়ি-ডালাগুলো ঘিরে ক্রেতাদের ভিড়, জেলের মাথায় চুবড়ি ঘাটে আসতে তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা চলেছে, কোনো কোনো জেলে না না করে অন্য গ্রামে যেতে ছুটছে। কিন্তু ভিড় যেন দো-মনা। অন্য কোথাও যেন আর এক উত্তেজনার কারণ থাকতে পারে।
চরণ বললো–এবার বেশ মাছ।
গোপাল বললো–হুঁ।
দুজনে ভিড়ে গলে মাছ পছন্দ করছিলো। চরণ একজোড়া পছন্দ করে কিনে ফেলো। গোপাল বললো–আর একটি দেখি, দাঁড়াও। তারা দুজনে আর এক ভিড়ে ঢুকলো। তখন সেখানে মাছের চাইতে কলের নৌকোর কথা বেশি। গোপাল সেই গল্পবাজ জেলেকে বললো, রাখো, রাখো, মাছ দেখাও। জলে নাকি রেলগাড়ি চলে!
মাছ কেনা যখন শেষ তখন তাড়াতাড়ি ফেরা ভালো। চরণ বলেছিলো–ফরাসডাঙা দিয়ে চলো, তাড়াতাড়ি হবে।
খানিকটা গিয়ে চরণ বললো–গোপালদা, চুপচাপ যে?
গোপাল বললো–অমর্ত্য আর কৃষ্ণানন্দ আউসের খোঁজ করছে, তুমি কী ভাবছো, চরণ?
এখনো ভাবিনি, কমিশনটা মিটুক।
মিটবে? যারা কমিশনে কাগজ পাঠায়নি তারা এখন যে যা পাচ্ছে দাদন নিচ্ছে। –
-নেবে তো। খাওয়ার ধান কিনতে টাকা লাগে।
–যারা দাদন পেলোনা, তারা কিন্তু রেগে কই। আমার জমিতে কিন্তু এর আগেও আউস তেমন ফলতো না।
চরণ বললো–উল্টোপাল্টা কী বলছো, গোপালদা?
দুজনেই মাথা নিচু করে পায়ের দিকে চেয়ে হাঁটছিলো। চিন্তার ভারই তো ঘাড়ে।
নদী বরাবর চলে ফরাসডাঙায় উঠতে কুতঘাট পেরোতে হয়। তারা সামনে আট-দশজন গ্রাম্যমানুষ এবং কয়েকটি উলঙ্গ বালককে জটলা করতে দেখতে পেয়েছিলো। গলা বাড়িয়ে দেখতে গিয়ে জটলার মধ্যে অভূতপূর্ব পোশাকের দুজন লালমুখোকে দেখতে না দেখতে তাদের পিছনে কুতঘাটে বাঁধা সেই চোংদার কলের নৌকোকে দেখতে পেয়েছিলো। এমনকী কপালের উপরে দুহাতে বারান্দা করে সেই জাহাজের গায়ে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড অক্ষরে লেখা অ্যালবেট্রস শব্দটাকেও পড়তে পেরেছিলো চরণ।
কিন্তু সেই লালমুখোরাও তাদের দেখতে পেয়েছিলো। তাদের পোশাক জটলার লোকদের চাইতে কিছু উন্নত হওয়াতেই বোধ হয় লালমুখোদের একটা বললো–হে, ব্ল্যাকি! ডু ই নো দা ওয়ে টু প্ল্যানটেশন।
ইংরেজি-পড়া চরণ থমকে দাঁড়ালো। কিছু একটা তাকে আঘাত করেছে এই রকম অনুভূতির সঙ্গে তার রাগ চড়চড় করে উঠছিলো : ইউ ব্লাডি সোয়াইন, ইউ ফিলদি শ্বেতী, এ রকম সব কথা তার মনে আসছিলো।
কিন্তু সে দাঁড়ালো না, গোপালের হাত টেনে নিয়ে তাড়াতাড়ি হাঁটতে শুরু করলো। জাহাজী গোরা দুটো হেই, ইউ দেয়ার, ইউ–এমন সব চিৎকার করতে লাগলো।
বেশ খানিকটা চলে এসে গোপাল জিজ্ঞাসা করলো–পালিয়ে এলে যেন,কী কইছিলো? ধমকালো যেন তোমাকে?
চরণ বললো–ডানকানের কাছে যেতে চায়। তা পথ খুঁজে নিক না।
গোপাল বললো–ওরা তো ওই কলের জাহাজ থেকেই, নয় কি? ঘাটে তো নৌকোও ছিলো, বিলিতি মনে হলো যেন।
আরো খানিকটা চলে গোপাল বলেছিলো–এই এরা, আবার জঙ্গীলাট, আবার কমিশনের তারা সবাই কিন্তু এক জাত।
চরণ ভাবছিলো। তখন গোপাল বললো–মুশকিল এই, চরণ, তোমার জমির অনেকটা মরেলগঞ্জে কিন্তু বাড়িটা রাজনগরে, ডানকানের এলাকায় নয়।
–এ কথা যে?
–ভাবছি।
তারা তখন সেখানে এসেছে যেখানে পথটার এক-শাখা মরেলগঞ্জে, অন্যটি রাজনগরের দিকে গিয়েছে। চরণ একটু দাঁড়ালো, বললো–গোপালদা, সকলকেই কিন্তু সাক্ষী দিতে একইসঙ্গে যেতে হবে। পরের পর সাক্ষী দিয়ে যাবো। প্রথমে আমরা দিলে আর সকলে জোর পাবে। হেডমাস্টারমশায়ের কাছে আবার বসতে হয় কিন্তু।
চরণ অনেকক্ষণ ধরে কথাগুলোকে মনের মধ্যে তোলাপাড়া করলো। তার একটা খটকা লাগছে মনে। গোপালদা কী বলতে চাইছে? শেষে সে ভাবলো এখনো আট-দশ দিন, দেখা যাক।
