এরকম আন্দাজ হয়েছিলো, জঙ্গীলাট আর রাজকুমার একইসঙ্গে আসবেন। কিন্তু হরদয়াল অবশ্যই সঠিক জানতো। দুদিন দিয়ে সংবাদ আসছিলো তার, সদরে সওয়াল বহাল ছিলো যাতে টেলিগ্রাম এলেই তা নিয়ে আসে, দীর্ঘতর পত্রাদি আসছিলো ছিপ মারফত। পথে দাঁড়ি বদলে তারা আড়াই দিনে কলকাতার সঙ্গে যোগ রাখছে।
হরদয়ালের দুর্ভাবনা বরং কমে আসছিলো, এবং সংবাদটা ক্রমশ ধীরে ধীরে কাছারির এ-মুখে ও-মুখে শোনা যাচ্ছিলো। এমন তো ঘটতে দেওয়া যায় না যে রটে গেলো জঙ্গীলাট রাজনগরে তিন-চারদিনের জন্য ক্যাম্প করবেন, অথচ তিনি এলেন না। অন্যের কানে সংবাদ তখনই গেলো যখন কমিসারিয়েটের কন্ট্রাকটর জানালো জঙ্গীলাট আর তার পার্টির জন্য অ্যালবেট্রস জাহাজ চার্টার করা হয়েছে। কলকাতা থেকে নদীপথটাকে অবশ্যই দেখে নেওয়া হবে। এখনকার মতো তখনো এইসব ট্যুরের খবর তখনই প্রকাশ করা হতো যখন উদ্যোক্তারা সব আয়োজন প্রায় শেষ করে এনেছে।
কিন্তু অ্যালবেট্রস? হরদয়ালের দিন দশেক আগেকার কথা মনে পড়লো। তার মুখে হালকা একটা চিন্তা যাওয়া-আসা করলো। সেটা একটা বিশেষ দিন ছিলো। যেদিন অ্যালবেট্রসঅশ্রুতপূর্ব জলদানের মতো রাজনগরের ভোররাতেরনদীতে দেখা দিয়েছিলো। এমন নয় যে কুতঘাটে সংবাদ আনার লোক ছিলো। হরদয়াল হাসলো এবার মনে মনে। জেলেরা খবর এনেছিলো। সেদিন তাদের আবার ইলিশ ধরার সূচনা। সরস্বতীপূজা তো। সেদিন থেকেই আবার ইলিশ খাওয়া হবে। তার কুঠিতে হয় না। কিন্তু রাজবাড়ির অন্দরেও জোড়া ইলিশ, জোড়া বড়ি, ধানদুর্বা, সিঁদুর এসব দিয়ে ইলিশকে অভ্যর্থনা করা হয়। যেমন গ্রামের পথে পথে, তেমন রাজবাড়ির দিকেও জেলেরা ঝাঁকা মাথায় ছুটতে থাকে। ইলিশ তো জীবিত থাকে না অন্য মাছের মতো, কিন্তু এমন চাই যে তখনো রক্ত গড়িয়ে আসছে কানকো থেকে। দেওয়ানকুঠিতেও মাছ দিতে আসবে তারা। সেখানে দাম নয়। দুটো মাছে দশটাকা বকশিশ তো!
তারাই প্রথম অ্যালবেট্রসের কথা বলেছিলো। ভোর ভোর রাতে তখন বেড়াল গুটিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, প্রথমে আলোর ঝলকানি–যেন সূর্য উঠলো অকালে; কিন্তু দিকটা তো পুব নয়, দক্ষিণ। আর সূর্যের আলো কি জলের বুকে ঝাটায়? আর তখন বিরাট একটা ছাগলের ভ্যা ভ্যা। কিন্তু জল কাঁপছে, ঢেউ উঠছে, তাদের ডিঙিগুলো নাচছে, জাল টানতে অন্যরকম লাগছে হাতে। অবাক হতে হতে, ভয় কাটাতে কাটাতে তারা গেলো গেলো করে উঠলো। সেই দানব তো জালের উপরেই উঠে পড়তে চায়। জাল বাঁচাতে চার-পাঁচখানা ডিঙ্গি, তারাই তো সেদিকে, ঢেউ অগ্রাহ্য করে ছুটলো। জাল বাঁচলো, কিন্তু শ্ৰীমন্তর নৌকাখানা ডুবেছে। বাপবেটা মিলে তারা চারজন সাঁতরে উঠেছে বটে। তবে (জেলে দুজন হাসলো এই জায়গায়) মাছও এবার উঠেছে! বোধহয় সেই কলের নৌকাই ঝেটিয়ে এনেছে। মাছ।
এ বিষয়ে হরদয়ালের প্রথম চিন্তা আমরা শুনেছি ইতিপূর্বে–এটা একটা এগিয়ে যাওয়া, কিন্তু কিছুই আর অর্জিত রইলোনা। এ বিষয়ে সর্বরঞ্জনপ্রসাদের মনোভাবেরও কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। সে বাড়ির সামনে, গঞ্জে নয়, জেলে দেখে অবাক হয়েছিলো। জেলেরা যখন প্রায় জোর করেই তাকে জোড়া ইলিশ দিতে চাইলো, সে প্রথম বললো, এখানে এরকম পাওয়া যায়? কিন্তু তার মনে পড়ে গেলো, সেদিন পূজার ব্যাপার একটা আছে। তার মনে বিমুখতা দেখা দিলল। গৃহিণীর উৎসাহকে সে দৃঢ়ভাবে নিরস্ত করলো,নানা,এ কি কখনো, না না, এ হতে পারে না যে এমন কুসংস্কারকে আমরা প্রশ্রয় দেবো।
আদর্শবাদী মানুষদের চিন্তা যেন আদর্শের তাড়নাতেই দ্রুততর হয়। সর্বরঞ্জনপ্রসাদ জেলেদের প্রায় পিছন পিছন বেরিয়ে পড়েছিলো। সে তাদের প্রায় সবগুলো পথ দিয়েই ছুটতে দেখলো। কোথাও কি তাদের গতিরোধ হবে? হঠাৎ অনুপ্রেরণার মতোই তার মনে পড়ে গেলো : এদিকে চরণই একমাত্র, অন্তত একদিক দিয়ে, আধুনিক মনের পরিচয় দিয়েছে, অন্তত বিবাহে আর পুরোহিতের অসুবিধা বলে চরণের বাড়িতে পূজা নেই। সে একটু তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চরণের বাড়ির দিকে চলেছিলো। আদর্শবাদীদের মতোই আবার পরাজয় তার প্রতীক্ষা করছিলো। সে তখন চরণের বাইরের দিকের ঘরের বারান্দার কাছে। সে স্তম্ভিত হয়ে গেলো। দেখলো : চরণের মাথায় নতুন গামছা বাঁধা, সে খুরপি হতে বাড়ির সামনে একটা কঞ্চি-ঘেরা জায়গায় মাটি ঠিক করছে; চরণের বউ থালা হাতে বেরিয়ে এলো উলু দিতে দিতে। চরণ যে জায়গাটা খুঁড়ছিলো সেখানে থালা কাত করে যা ঢেলে দিলো তা যে রক্ত তা দূর থেকেই বোঝা যায়; আর আঁশগুলোও রোদে চকচক করে উঠলো; চরণ তার ট্র্যাক থেকে কীসের বীজ বার করে সে মাটিতে পুঁতে দিলো।
সর্বরঞ্জনপ্রসাদ গলা-খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি না জানিয়ে পারলো না। বনদুর্গা, চরণের স্ত্রী, দৌড়ে পালালো। চরণ মাথার গামছা খুলে তাড়াতাড়ি হাত মুছে সলজ্জভাবে বললো–এত সকালে যে?
সর্বরঞ্জন নিশ্চয়ই শিক্ষিত ও সংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষ। সে তো বুঝতেই পারছে এইমাত্র যা সে দেখলো, তা পৌত্তলিকতার চাইতেও অনেক পিছিয়ে থাকা–মাটি, রক্ত, বীজ নিয়ে এক ঘোরতর আদিমতা! সে কোনো কথা না বলেই পিছন ফিরে নিজের বাড়ির দিকে চলতে শুরু করলো।
চরণ একটু অবাক, এমনকী একটু লজ্জিতও হয়েছিল বটে, কিন্তু তখন তাকে একটু ভাবতেই হলো। তাতেও অ্যালবেট্রস দেখা দিয়েছিলো। তা বিশেষভাবেই, সকালের ব্যাপারটাকে পূর্বাপর সাজিয়ে নিয়ে ভাবতে আগ্রহ হচ্ছে তার। বনদুর্গার দাবি মেটানোর পরে।
