বাগচী স্তম্ভিত হয়ে গেলো। সে হাসবে যেন এমন ভাব হলো তার মনে। পরমুহূর্তে রক্ত যেন মাথায় চড়ে গেলো, কথা বলতে কষ্ট হতে লাগলো। সে অবস্থায় সে ভাবলো, না, বর্বর নয়, শয়তান।
বাসায় ফিরে বাগচী অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলো। এমনকী ডিনারের আগে পর্যন্ত কেটের সঙ্গেও খুব কমই কথা হলো। ডিনারে বসে সে বললো–আচ্ছা কেট, এবারেও ক্রিস্টমাসে যদি কলকাতায় না-যাই আমরা?
পরের দিন সকালে, তখন তো কলকাতায় রওনা হতে আর দিন তিনেক বাকি, সে দেওয়ানকুঠিতে গেলো। হরদয়ালকে পেয়ে জানালো তার পক্ষে কলকাতা যাওয়া একেবারেই সম্ভব হচ্ছে না। মরেলগঞ্জে ইন্ডিগো কমিশন আসছে। ২৫ তারিখ পর্যন্ত তারা নালিশ নেবে। পরে তার উপরে জেরা হবে। মরেলগঞ্জে অনেক নালিশ। কিন্তু কেই বা তাদের সেসব নালিশ লিখে দেয়?
হরদয়াল জিজ্ঞাসা করলো–বাগচী সেখানকার রায়তদের পক্ষে উকিল হিসাবে দাঁড়াতে চাইছে কিনা।
বাগচী হেসে বললো–আপাতত নালিশগুলো লিখে দিতে হবে। আর পরিচিত অপরিচিত মিলিয়ে অন্তত পঞ্চাশ-ষাটটা নালিশ তো হবেই মনে হচ্ছে। সময়ও লাগবে। তাদের জেরা করে নিখুঁত সত্য উদঘাটন করে তা লেখা ২৫ তারিখের মধ্যে পেরে উঠলে হয়।
চরণের বাড়িতে গিয়ে সে বললো–শোনো, আমার গায়ের রং কালো, তা বেশ কালোই; কিন্তু আমি নিজেই জানি ইংরেজিটা আমি ভালো লিখি। একশোটা তো কম করেই নালিশ হবে। আর কদিনই বা বাকি ২৫-এর। এর মধ্যে সকলের সঙ্গে আলাপ করে নিয়ে সত্যকে স্থির করে নিয়ে নালিশগুলোকে লিখতে হবে। চরণ এ তো বুঝতে পারা যাচ্ছে এ নালিশগুলো কখনো যদি প্রকাশ পায় পার্লামেন্টের সভ্যরা লজ্জায় লাল হবে। আমি জানি কী করে চোখের জল আর আগুনের আংরা ইংরেজিতে ভরে দেওয়া যায়। ইসমাইলের মা, ইসমাইল, অমর্ত্য কারো কথা বাদ যাবে না।
এরকম সিদ্ধান্ত করলে, সময় তো তখন বেশি ছিলো না। একশোটা না হোক অন্তত পঞ্চাশটা নালিশ বাগচী খাড়া করেছিলো। যাদের নালিশ তাদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে অতীত ও বর্তমানের অত্যাচার অনাচারের কাহিনীকে সত্যের ভিত্তিতে নির্ণয় করা, তাকে উপযুক্ত ভাষায় লেখা বাগচীর দিনরাত কেটে যেতে লাগলো। কিছুদিন যেমন তাকে বাড়ির বাইরে দেখা যেতো না, তখন আবার খাওয়ার সময়ে ছাড়া কুঠিতেই পাওয়া যায় না। এমনি হলো।
এক রাতে বাগচী বললো–আর দুদিন, ডারলিং। বোধ হয় পেরে উঠবো শেষ করতে। তা তো হবেই, ছাপালে আড়াই তিনশো পাতার বই হবে।
কেট বললো–তোমার শীত করছে না তো? পায়ের উপরে রাগ দেবো?
হয়তো সে নানারকম গরম কাপড়ের কথাই ভাবলো। হঠাৎ যেন গল্পটা মনে পড়লো, মুখ তুলে বললো–সেই বনাতওয়ালা, জানো, ফেলিসিটার তো চলে গিয়েছে কিন্তু বনাতওয়ালা সেই ও সুলিভানকে দেখলাম কাল পথ দিয়ে যেতে।
বাগচী তার কাগজ থেকে মুখ তুলো। অন্যমনস্কভাবে বললো–শুনেছি বটে সে নাকি ভেসে বেড়ানোর কথা বলছে।
–ভেসে বেড়ানো? তুমি কি শ্যাওলার কথা ভাবছো, নাকি জলের উপরে ভাসা স্কাম?
বাগচী আবার কাগজে মুখ নামালো। কেট বললো, আচ্ছা, ডারলিং, এরা কি সবাই রুটলেস? সবাই কি ধর্মহীন? ওসুলিভানের বাবা-মা হয়তো দুই জাতির, তাই নয়?
কেট সম্ভবত পথে ও সুলিভানকে দেখার পরেই কিছু ভেবেছে। সে আবার বললো, আচ্ছা, ডারলিং, মানে এদের মতো মানুষদের বাবা-মায়ের একত্র হওয়া কি অন্য কিছু? ওয়ান ইন গড় হওয়া নয়?
অন্যমনস্ক বাগচী বললো–তা তো বটেই। খানিকটা তো বটেই।
শোবার সময় হলে বাগচীর গায়ের উপরে রাগ বিছিয়ে দিতে দিতে কেট তার বিছানাতেই কিছু সময়ের জন্য বসলো। বললো–আচ্ছা, ডারলিং, আমার ভয় করে, আমরা ধর্ম থেকে সরে যাচ্ছি না তো?
বাগচী বললো–কেন? সামনে ক্রিস্টমাস। এবার কিন্তু আমরা পরপর দুদিনই বেশ অনেকটা সময় প্রার্থনা করবো।
সে রাতটাকে ক্রিস্টমাস ইভ বলা হয়। ডিনারের অসাধারণ আয়োজন করেছিলো কেট। বাগচীর জানার কথা নয় কেট কখন কী বোনে। নতুন একটা সোয়েটার তাকে পরতেই হয়েছে। খেতে খেতে বাগচীর হাসি দেখে কেট বললো–হাসছো যে একা একা? আমি ভাগ পেতে অধিকারী।
–নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমার মনে হচ্ছিলো, খড়ের বাড়িতে খড়ের কুচিতে গা ঢাকলে কি। শীত যায়? তা থেকে আরো মজার কথা মনে হলো। পাগলা ফ্রান্সিসের কথা।
-পাগলা?
নয়? ভাবো ইটালিতে তো এসময়ে বরফও পড়ে। ভাবো খালি গায়ে তুষার, চুলে তুষার, দাড়িতে তুষার। বোধ হয় এরকম কোনো ঋতুতেই বরফ দেখে বলেছিলেন–আগুন আমার ভাই!
-বোন বলেছিলেন বোধ হয়। কেট বললো।
–কেমন, অসাধারণ অনুভব করার শক্তি নয়? যেন এক মহাকবি?
কেট দেখলো-বাগচীর চোখের কোণ দুটো চিকচিক করছে।
রাত তখন এগারোটা হবে। কেটের হাই উঠলো। বাগচী বললো–তুমি একটু শুয়ে নাও ডারলিং, আমি ঠিক রাত বারোটায় তোমাকে ডেকে তুলবো। সারাদিন খেটেছে উৎসবের আয়োজনে।
–ঘুমিয়ে পড়বে না তো?
না না, আমি ঠায় বসে থাকবো। এই সোয়েটার এমন আরামদায়ক, খুলতে ইচ্ছা করছে না।
রাত বারোটার কিছু পরে কেটের ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো। সে তাড়াতাড়ি সময় ঠিক করতে এসে দেখলো, বাগচী তার টেবিলে আলোর সামনে, কাগজের উপরে ঝুঁকে পড়ে লিখে যাচ্ছে।
১২. রাজকুমার কলকাতায়
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ
০১.
সেবার রাজকুমার কলকাতায় পুরো একমাস ছিলো। জানুয়ারির মাঝামাঝির আগে ফেরেনি, যদিও হরদয়াল ও রানীমা কিছু আগে চলে এসেছিলেন। তাতে অসুবিধারও কিছু হয়নি। উপরতলায় হৈমী ছিলো, একতলায় রূপচাঁদ ছিলো, নরেশ ওভারসিয়ার, হরদয়ালের সেরেস্তাদার ব্রজ ছিলো, দাসদাসী বরকন্দাজেরা ছিলো। উপরন্তু বড়োদিনের পরেও যে নববর্ষের উৎসব, তখন তো হরদয়ালই ছিলো তত্ত্বাবধানে।
