চরণ বললো–সারেনি, কিন্তু অনেকদিন আসছেও না। এরাই বলছিলো, সে নাকি এখন এক সোলোমান সাহেবের সঙ্গে নৌকায় করে মাছ ধরে বেড়ায়। সোলোমান না কী সোলোভান নাম তার।
বাগচী বললো–কীবলের সঙ্গে যখন মারামারি, ইসমাইলদের তাহলে মরেলগঞ্জে জমি ছিলো? ওইটুকু ছেলে, ও কি মাছ ধরে কিছু করতে পারছে?
-নিজের পেট চলছে বোধহয়।
–নিজের পেট? ও কি তার আত্মীয়স্বজন থেকে পৃথক?
চরণ একটু অসুবিধায় পড়লো। সে ভাবলো, একবার কীবলের কথা গোপন করে মুশকিল হয়েছিল, যা আজই মাত্র মিটতে চলেছে। সে স্থির করলো সাধারণত যা বলা হয় না তেমন কথাও গোপন করা উচিত হবে না। সে বললো, মাস ছয়েক আগে ইসমাইলের বাপ মরেছে। সংসারে থাকার মধ্যে মা আর ছেলে। ছেলে চাষ না করে স্কুলে যেতে বলেই জুড়ান তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিলো ছোটোসাহেবের কাছে। সেজন্যই চোখের ওই অবস্থা। তা এখন নিশ্চিন্ত, জুড়ানই ওর মাকে নিয়ে থাকছে।
বাগচীর মনে করুণা আর ঘৃণায় মিশ্রিত একটা অব্যক্ত ভাব দেখা দিলো। কিন্তু আবার কি ধর্মনীতির কথা ওঠে? এই ভেবে সে একরকম হাসলো। বললো–সলোমান, সোলেভান বললে, সে কি ডিসিলভা কিংবা ওসুলিভান হতে পারে? ফেলিসিটারের সেই লোকটি কি এখনো এই গ্রামে?
–সেই হবে। এক হতভাগা তাতে সন্দেহ নেই। কয়েকদিন আগে ইসমাইলকে গঞ্জে ধরেছিলাম। বললাম, জলে জলে ভাসছিস! তা, বললো, সাহেবও ভেসে যাওয়ার কথা বলে। ভাসতে ভাসতে একদিন নাকি চোখ ভালো হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু এটা তো এমন নয় যার জন্য সে এসেছে আজ। বাগচী বললো–তোমার সঙ্গে আজ নীল চাষের কথা বলবো। গত তিন সপ্তাহ এ বিষয়ে পড়েছি, ভেবেছি। মনে করো আমরা নীল চাষ করবো না। কী করবো-ধান, কলাই, সরষে, আখ?
চরণ একটু ভেবে বললো–গোপালদা এসব বিষয়ে ভাবছে। বলছিলো, সবাই ধান কলাই করলে তার দাম এমন পড়ে যায় যে তাতে যারা কিনে খায় সেই বাবুদের সুবিধা, চাষীরা কিন্তু না খেয়ে থাকে?
-তাহলে কি আখ?
চরণ আবার ভাবলো। বললো, আগে এদিকে আখ হতো, গুড় হতো। মরেলগঞ্জের পশ্চিমে সোহাগপুরে এখনো গুড় আছে। কিন্তু তারাও অন্য চাষের কথা ভাবছে। বলে, জাহাজী চিনির সঙ্গে, জাহাজী গুড়ের সঙ্গে এঁটে ওঠা যাচ্ছেনা। পূজা ছাড়া,বামুন কায়েতের বিধবারা ছাড়া কে আর দেশী গুড় আর দেশী চিনি খাচ্ছে?
বাগচীর নিজের ঘরের সুগার বউলের কথা মনে পড়লো। চকচকে বড়ো দানার সেই চিনি যা গঞ্জের বাজার থেকে সহিস নিয়ে গিয়েছে তা কিন্তু দেশী বলে মনে হয়নি।
বাগচী খানিকটা সময় স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। পাইপ ধরালো। তা পুড়িয়ে শেষ করলো। বললো–চরণ, এখন তো টানা ছুটি স্কুলের। ক্রিস্টমাসে একবার কলকাতা যাবে। কিন্তু তার আগে রোজই আসবো। দু-বেলাই। রোগীদের খবর দিও। কলকাতা যাওয়ার আগে ক্রনিক রোগীদের ওষুধ দিয়ে যাবো।
সে ভাবতে লাগলো। এই সময়েই কথাটা তার মনে হলো–আচ্ছা, চরণ, ইন্ডিগো কমিশনের কথা শুনছো কিছু? এ কি সত্য যে মরেলগঞ্জে কমিশন আসছে? তারা কি মরেলগঞ্জের অন্যায় নিয়ে খোঁজখবর করবে?
চরণ বললো–হ্যাঁ, সার। দিন তিনেক আগে সকলকে নুটিশ দিয়েছে। যার যার ইচ্ছা কমিশনকে বলতে পারে অভাব-অভিযোগের কথা। বড়োদিন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ নেবে। তারপর জানুয়ারির শেষ দিকে তারা আবার এলে সেই দরখাস্তের উপরে জেরা হবে।
একবার বাগচীর মনে হলো সে বলবে, দ্যাখো, তাহলে এখানেও ইংরেজরা কমিশন বসাচ্ছে!এটা কি একটা ভালোর লক্ষণ নয়? কিন্তু সেচরণের মুখে অপ্রীতিকর কিছু শোনাকে এড়িয়ে যেতে অন্য কথায় গিয়ে বললো, তাহলে, চরণ, কঠিন রোগীদের, বিশেষ ক্রনিক রোগীদের যেন সংবাদটা জানানো হয়। কলকাতায় যাওয়ার আগে ওষুধ দিয়ে যাবো।
দিন তিন-চার পরে বিকেলের দিকে সে রোগী দেখা শেষ করে তখন কুঠিতে ফেরার উপক্রম করছে, চরণের বাড়ির দিকে দু-তিনজনকে একত্র আসতে দেখে সে বারান্দার নিচে দাঁড়ালো। পাশে দাঁড়ানো চরণকে জিজ্ঞাসা করলো–রোগী নাকি চরণ? ততক্ষণে তাদের দেখতে পেয়ে চরণ গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। আগন্তুকদের একজন প্রৌঢ় আর দুজন যুবক। চরণ একটু বিরক্তির স্বরেই বললো, অমর্ত্যমামাকে এখন এখানে আনতে গেলে কেন, কৃষ্ণকাকা?
সেই প্রৌঢ় বললো–তুমিই তো লোককে জানিয়েছে, ডাক্তারসাহেব কলকাতা যাওয়ার আগে রোগী দেখবেন–তাই শুনেই অমর্ত্য ধরেছে তাকে একবার দেখতে।
বাগচী কৌতূহলে জিজ্ঞাসা করলো–অমর্ত্য কোনটি, তার কী হয়েছে, এরাই বা কে?
চরণ আবার সমস্যায় পড়লো। আবার কী গোপন করবে, আর তার ফলে আবার এক ভুল বোঝাবুঝি? সে তখন পরিচয় দিয়ে জানালো প্রৌঢ়টির নাম কৃষ্ণানন্দ, তার স্ত্রীর পূর্ব পক্ষের শ্বশুর এবং তারও খুড়ো সম্বন্ধে। অমর্ত্য কৃষ্ণানন্দের সম্বন্ধে শ্যালক। বললে, অমতাঁর কিছুদিন থেকে একটা পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। তার স্ত্রী এবং কন্যা, সংসারে নিজের বলতে তারাই। তাদের সঙ্গে ব্যবহারের পরিবর্তন হয়েছে। সংসারের বাইরে যারা তাদের সঙ্গে তো বটেই। সবসময়েই প্রায় চুপচাপ থাকে, কথা বলতে গেলে চিনতে পারে না, অন্য সময়ে রেগে গিয়ে ঘরের জিনিসপত্র নষ্ট করে।
বাগচী গলা নিচু করে বললো–তুমি কি এটাকে মেন্টাল কেস বলছো?
তখন চরণ কিছুটা ইতস্তত করে কীভাবে অমর্ত্যকে ডানকানের হুকুমে জুড়ান পাইক সারাটা মরেলগঞ্জে উলঙ্গ করে ঘুরিয়েছে তা বললো।
