বাগচী বললো–তুমি শুনেছেনাকি আমাদের কথা? ভালো নয়, ভালো বলতে পারিনি। বোধহয় খুব তাড়াতাড়ি ভাবতে গিয়ে মনে হলো তখন। দ্যাখো, এটা তো ঠিকই ক্রাইস্ট ইহুদিদেরই একজন যারা তখন প্রায় বর্বর ধনী রোমকদের পদানত; দ্যাখো, এটা তো ঠিকই প্রথম যারা তার ধর্মকে নিয়েছিলো তারা তো ছিলো উৎপীড়িত ক্রীতদাস। তখন হঠাৎ মনে হলো, চৈতন্য যখন এদেশে প্রেমের ঈশ্বরের কথা বলেছিলেন তখনো পাঠানের উৎপীড়নে, ছিলো একটা জাতি। মনে হলো দুর্বলতাতেই, পরাজিত হলেই মানুষ প্রেমের প্রচার করে নাকি? বাগচীর মুখটা নিয়োগীর চাইতেও বিষণ্ণ হলো। কেট মুখ তুলে কিছু বলতে গেলো, কিন্তু তার যেন এই ভয় হলো, অত তাড়াতাড়ি এসব বিষয়ে কথা বলতে নেই। তার। অস্পষ্টভাবে মনে হলো, ক্রিশ্চান সব চাৰ্চই তাদের ইউনিটারিয়ান মতকে বিদ্রূপ করে তা সত্ত্বেও ক্যাথলিক রলের চার্চ মিশনের ব্যাপারে বাগচীর উৎসাহ দেখে সে এরকম কিছুই বলতে গিয়েছিলো। সেও বিষণ্ণ হলো।
কেটকে সংসারের কাজে কিছুক্ষণের জন্য উঠে যেতে হলো–তা মিনিট দশেক হবে। সে ফিরে এসে অবাক। ইতিমধ্যে বাগচী ইদানীং-অভ্যস্ত ড্রেসিং-গাউন বদলে বাইরের পোশাক পরা শেষ করে সযত্নে ক্র্যাভাট বাঁধছে। কেট বসলো; যেন কৌতুক ঘটবে কিছু। বাগচী তার টুপিটাকে ব্রাশ করে মাথায় চাপালো। এক টুকরো কাপড় তুলে তার ছড়িটাকেও ঘষে নিলো।
কেট একটু কৌতুকের সুরেই বললো–সে কী, কোথায়?
বাগচী বললো–আজ রবিবার নয়? ডিসপেনসারিতে যেতে হয় না? সহিসকে জানলা দিয়ে বলল ঘোড়া আনতে।
বাগচী ভাবলো-কী আশ্চর্য, কী ভয়ঙ্কর, সে কি ধর্ম থেকে এতদূর সরে গিয়েছে? আজ সম্ভবত বিশ দিন হয়, চরণের সঙ্গে প্রতিদিনই দেখা হয়েছে, কিন্তু ইসমাইলের সেই পরীক্ষার পর থেকে একটা কথাও তার সঙ্গে বলেনি। এও রাগ নাকি? আশ্চর্য!ইসমাইলের চোখেরই বা কী হলো? হয় চরণ তোমার ধর্মকে আঘাত করেছে, তোমার সংস্কৃতিকে বিদ্বেষ করে, কিন্তু ইসমাইলের কীঅপরাধ যে বিনা চিকিৎসায় তার চোখ নষ্ট হবে? সে মনে মনে বললো, ভগবান, আমার জন্য কি ক্ষমা আছে? কুড়ি দিনে অন্তত কুড়িবার মনে হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও চরণকে ক্ষমা করতে পারিনি।
পথে বাগচী স্থির করলো, চরণকে গোটা ব্যাপারটা সে বুঝিয়ে বলবে। সে তো যেমন পাদরি, তেমন হেডমাস্টারও। ধর্মের কথা নাই হলো, হেডমাস্টার, শুধু ছাত্রদের নয়, শিক্ষকদের সঙ্গেও তো আলোচনা করে তাদের গাইড করে। হয়তো চরণ বলবে, আমরা তো সার, ক্রীতদাস। তখন কিন্তু বলতে হবে, হ্যাঁ, চরণ, স্বীকার করি যে আমরা পরাধীন, কিন্তু তাই বলে ক্রীতদাস? তুমি কি জাহাজের খোলে বেতের বাঁধনে বাঁধা সেই কালো কালো মানুষের যন্ত্রণা আর গোঙানির কথা জানো? রোসো, তোমাকে পড়তে দেবো। দেওয়ানজির লাইব্রেরিতে পাবে সেই টমচাচার গল্প। সোজা ইংরেজি। তাই বা কেন, আজ চরণকে উইলবারফোর্স আর ক্ল্যাপহ্যাম সেকটের কথা বলতে হবে। সেই যারা ইংল্যান্ডে বসে ক্রীতদাস প্রথাকে লোপ করেছে। বলতে পারো, চরণ, ইংরেজরাই বেশি জাহাজ নামিয়েছিলো ক্রীতদাসের ব্যবসায়। তারাই কিন্তু ক্রীতদাসপ্রথা লোপও করেছে। তুমি কি কলকাতাতে রাজাদের বাড়িতেও আর ক্রীতদাস দ্যাখো? একটাও পাবে না। হাবসীবাগান আছে বটে, কিন্তু সেখানে ক্রীতদাস নেই। অথচ এই দেশে এমনকী নুরজাহও ক্রীতদাস ছিলো। তোমাকে আরো বলি, সে আপন মনে হাসলো, এরা কিন্তু সকলেই ডানকানের কীবলের জাতি। ক্রিশ্চিয়ানই ধর্মে। তাদের স্বীকার করার সাহস আছে তাদের দেশে কল কারখানায় শ্বেত-ক্রীতদাস আছে। তারা কিন্তু তার বিরুদ্ধেও আন্দোলন করে। বেশ কথা, ইংল্যান্ডের কথা যদি তোমার বিশ্বাস না হয়, আমেরিকাকে দ্যাখো। সেখানে সবচাইতে বেশি ক্রীতদাস। সেখানেই কিন্তু গত এক দশক সব চাইতে বেশি আন্দোলনও। এমন হতে পারে সেখানে এ নিয়ে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। টাইমস পড়েছো?
তিন সপ্তাহের নিরুদ্ধ আবেগে এসব ভেবে যখন চরণদের পাড়ায় ঢুকছে, নিজের আবেগের দরুন লজ্জিত হয়েই চিন্তাটাকে যেন মাটিতে নামিয়ে আনলো। ব্যাপারটা তো ডানকানের নীল চাষ আর দাদন নিয়ে। নীল চাষ যে করা হয় তা লাভের বলেই। দাদনটাও যে কী তা আমরা তাঁতিপাড়ায় দেখেছি। দাদন পেলেই তবে তাতে রেশম চাপায়। বিক্রির নিশ্চয়তার জন্যই দাদন নেওয়া। নীলেও দ্যাখো, বিক্রির নিশ্চয়তার জন্যই দাদন চলেছে। কেউ তো আর জমিতে নীল চাষ করে নীল বার করে, তারপরে জাহাজ কিনে, জাহাজে মাল চালান দিতে পারে না। দাদন অন্তত এই নিশ্চয়তা দেয়, ফসল মাঠে পড়ে থাকবে না। মুশকিল হচ্ছে এই, মহাজনের সংখ্যা কমলে, প্রতিযোগিতার অভাবে তারা দাদনের পরিমাণ কমায়। নীলের ব্যাপারেও মহাজনের এই সুবিধা–একটাই তো নীলকুঠি ও অঞ্চলে। রাগ করে ভাবতে হবে, যারানীলচাষ নিয়ে ধর্মঘট করেছিলো তারাও নীল চাষই করছে আবার।
কিন্তু ততক্ষণে সে চরণের বাড়িতে পৌঁছে গিয়েছে।
তাদের সেই ডিসপেনসারিতে কয়েকজন রোগী ছিলো। বাগচী যেন কিছুই নয় এমন ভাবে গুডমর্নিং বলে বারান্দায় উঠে তার জন্য নির্দিষ্ট চেয়ারে চেপে বসে হেসে বললো, ক্যারি অন, চরণ, ক্যারি অন। সে আধঘণ্টা ধরে চরণের চিকিৎসা দেখতে লাগলো। শেষ রোগীটা চলে গেলে বারান্দাটা ফাঁকা যখন,বাগচী বললো–হা, চরণ, আমাদের ইসমাইলের খবর কী? তার চোখটা?
