-তুমি কিন্তু টাকার শক্তির দিকটাই তুলে ধরছো শুধু।
-তা তো বটেই, তা তো বটেই। এমনকী এখানে ডানকানের যে শক্তি তাও তো তাই। নয় কি?
সেদিন ডিনারে বসেও বোধ হয় তাদের মনে হালকা ভাব ছিলো। তারা যেমন গল্প করছিলো তেমনই করতে লগলো। কিন্তু হঠাৎ কেট বলে বসলো, তোমাকে একটা গল্প বলতে পারি।
বাগচী বললো–নিশ্চয়। বলো।
কেট বললো–কতগুলি শক্তি নয় কি যা আমরা দেখি? যেমন ধরো রাজকুমার এই গ্রামের একরকম শক্তির প্রতীক।
বাগচী বললো–ভেরি গুড। তাই বলে ডানকানের শক্তি থাকলেও তাকে কিন্তু অন্য নাম দিতে হয়।
কেট বললো, বলতে দিচ্ছো না কেন? যেমন ধরো দেওয়ানজি আর একরকমের শক্তির প্রতীক।
–এটা অস্বীকার করা যায় না। তুমি তৃতীয় শক্তির প্রতীক হিসেবে তাহলে রানীমাকে দেখছো? কেমন ধরিনি?
বাগচী খুশিতে হাসলো।
কেট বললো–তা হবে কেন? আমাকে বলতে দিচ্ছে না। তৃতীয়টি এক দারুণ মর্যাল শক্তি। আমার আনন্দ, তার প্রতীক আমার ঘরে।
বাগচী যেন চমকে গেলো। হাসতে গিয়ে গম্ভীর হলো। ঠাট্টার সুরে বললো, এ একেবারে নিজের কোলে ঝোল টানা। রাজকুমার আর দেওয়ানজির পাশে আমার মতো…। কিন্তু তার এরকম মনে হলো, এ ধরনের চিন্তা কি সেও করেছে সন্ধ্যা থেকে? যেন শক্তি পাওয়ার ইচ্ছা।
সে দেখলো, কেটের গাল দুটো লাল দেখাচ্ছে, চোখ দুটি উজ্জ্বল। সে ভাবতে চেষ্টা করলো, এই অদ্ভুত গল্পটা যা এখন কেট বললো, তার কিছু কি ভিত্তি আছে?
সম্ভবত পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের আগেই বাগচীতার কুঠির পিছন দিকের বাগানটার । গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সেখানে একটা কিচেন গার্ডেন। সহিস তদারক করে। সেখানেই তার প্যাডকও, যেখানে তার টাট্টা থাকে। সে রোদে রোদে ঘুরছিলো। শীতে তা আরামই লাগে। সে সহিসকে বাড়তি ঘাস কেটে ফেলতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো–দুএকটা করে ফুলগাছ লাগালে কেমন হয়? অলসভাবে রোদ পোয়ানোর ভঙ্গিতে সে প্রকৃতপক্ষে গোলাপ নিয়ে আলাপ করলো। কিন্তু টাট্টা তাকে দেখে ফেলেছিলো। সে নাক না ঝেড়ে পারলো না। বাগচী হাসলো। কিন্তু তার মনে পড়লো তিন সপ্তাহ, কম করেও, সে টাট্টাকে ব্যবহার করেনি। সে জিজ্ঞাসা করলো–সহিস তাকে হাওয়া খাওয়াচ্ছে কিনা। বলে দিলো, অন্তত মাইল দুয়েক যেন রোজ হাঁটায়। সেখানে কেট এলো তাকে কিচেনের জানলায় দেখে। সে বললো–এখানে কী হচ্ছে? বাগচী হেসে বললো, ভাবছো রোদ পোয়াচ্ছি? মোটেই না। বাগানটার উন্নতির কথা ভাবছিলাম। তুমি হয়তো জানো না, আমাদের কুঠি একেবারে মরেলগঞ্জের কুঠির স্টাইলে। শুধু আকারে ছোটো। কাজেই একটা বাগিচা থাকলে ভালো হয় না? তাছাড়া ভেবে দ্যাখো, আমাদের আয় তো জানুয়ারি থেকে একজন সিনিয়র ডেপুটির সমান বটে।
কেট হেসে বললো–বিউটিফুল।
কিন্তু বাগচী লজ্জিত হলো, অবাক হলো, আবিষ্কার করলো, দ্যাখো কাণ্ড! সত্যিই তো, সহিসের সঙ্গে গোলাপ লাগানোর কথা বলছিলো। এখন যা বললো– তাহলে কি তা ঠাট্টা নয়? এরকমই নিজে না জেনেই ভাবছে?
কিন্তু সেদিন রবিবারও বটে। ব্রেকফাস্ট শেষে তখন তারা পার্লারে, সর্বরঞ্জনপ্রসাদ আজ আবার শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হলো। আজও তার ছোট্ট একটা প্রস্তাব ছিলো, শ্রদ্ধা জানানোর শেষে সে বললো–আমার একটা নিবেদন আছে, সার। ক্রিস্টমাস আগতপ্রায় এখন কি একটা সভার আয়োজন করতে পারি না? স্কুল বন্ধ হতে পারে, কিন্তু আপনি অনুমতি করলে অনায়াসে আমাদের অধিকাংশ ছাত্র এবং তাদের অভিভাবকদেরও সংবাদ দেওয়া যায়। এটা কি ভালো হয় না যে আমরা শিক্ষকেরা এবং তারা ছাত্রেরা মিলে এই বিশেষ দিনটিতে লোকাতা ঈশ্বরপুত্রকে স্মরণ করি?
বাগচী নিয়োগীর কথার মৃদু টানা স্রোতে যেন ভেসে যাচ্ছিলো। তার মনে হচ্ছিলল, ভদ্রলোক যে উন্নত মনের সন্দেহ কী? প্রস্তাবটা তো ভালোই। কিন্তু হঠাৎ কিছুতে যেন তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটালো। সে বললো–আচ্ছা মশাই, একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি? আপনি কি ক্রাইস্টকে–আচ্ছা, কেন শ্রদ্ধা করেন ক্রাইস্টকে? প্রেমের জন্য কি?
নিয়োগী বললো–সেটাই কি সত্য নয়? প্রেমই কি নয়? তিনি এমন প্রেম করিলেন যে
বাগচী বললো–আচ্ছা মশাই, আপনি হিন্দু না হতে পারেন, ক্রিশ্চিয়ানও তো নন। এমন দুর্বল কেন বলুন তো? আপনি কি কখনো শ্রীচৈতন্যের জন্মদিবসে সভা করার কথা ভেবেছেন? তিনিও শুনি প্রেমের পথেইনা, না, ওসব সভা হবে না। তাছাড়া আপনি কি পারবেন? আচ্ছা, আপনাকে ইন ইমিটেশন অব ক্রাইস্টবইটা পড়তে দেবো। সে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলো। ক্রিশ্চিয়ানরা পারছে?
নিয়োগী অবশ্যই শ্রীচৈতন্যর ধর্মের সঙ্গে যুক্ত পরকীয়া ইত্যাদির কথা মনে যুক্তি হিসাবে গুছিয়ে নিচ্ছিলো, কিন্তু সেদিন সে ভারাক্রান্ত মনে বিষণ্ণ মুখেই বিদায় নিতে বাধ্য হলো। বাগচীকে নিত্যন্ত চিন্তাকুল দেখাচ্ছিলো।
কেট তার সেলাই-এর ঝুড়ি নিয়ে এলো। আজ সকালেই সে স্থির করেছিলো সারাদিন বুনলে রাজকুমারের সোয়েটারটা শেষ হবে। তারপরে তিনদিনে তার নতুন সার্জের গাউনটাকে সেলাই করে নেওয়া যাবে। তারপর সোয়েটারটাকে নয়নঠাকরুনকে পৌঁছে দিতে হবে কোনোভাবে। নয়ন সেটাকে রাজকুমারের গায়ে তুলে দিলে যে দৃশ্যটা হবে তার আলোটাকে সে অনুভব করছিলো।
কিন্তু কথা অন্যভাবে শুরু হয়। সে বললো–নিয়োগীমশায়…দুর্বলের কথা কী বলছিলেন?
