সুতরাং ডিসেম্বরের কথা আগে বলে নিতে হয়। তখন স্কুলের পরীক্ষার কাজ শেষ হয়েছে। প্রমোশন শুধু বাকি। বাগচী এবং শিক্ষকেরা নতুন বছরের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক নিয়ে আলোচনার জন্যই দুপুরে একবার করে স্কুলে যাচ্ছে। বাগচীর হাতে ঢালা অবসর। ব্রেকফাস্টের পরও সে এখন মাঝে মাঝে স্টাডিতে ঢুকে লাঞ্চের সময় পর্যন্ত কাটিয়ে দেয়। কেটকেই বলতে হয় স্কুলে যাবে কিনা সে? সন্ধ্যায় মাঝে মাঝে রাজবাড়িতে যাওয়া আছে। সেখানে রাজকুমারের সঙ্গে অথবা হরদয়ালের সঙ্গে সময় কেটে যায়। একজন হেডমাস্টারের পক্ষে পড়ার ঝোঁক থাকাই স্বাভাবিক। শুধু স্কুলের পাঠ্যপুস্তক পড়ে নির্বাচন করাই নয়।
নিজের পড়াশোনা আছে। কেট লক্ষ্য করেছে হিন্দু পেট্রিয়টের পুরনো ফাঁইলগুলোর বদলে তারই নতুন সংখ্যাগুলো এখন বাগচীর টেবিলে। ইমিটেশন অব ক্রাইস্ট বইটা তাকে তোলা, তার বদলে নিও-প্লেটোনিক দর্শন পাঠ হচ্ছে কখনো কখনো।
আগের দিন সন্ধ্যায় রাজবাড়ি থেকে ফিরে বাগচী বলেছিলো, রাজকুমার, রানীমা, দেওয়ানজি ঠিক পনেরোই ডিসেম্বর রওনা হবেন। দুখানা বোট আছে। সঙ্গে আরো কয়েকখানি দেশী নৌকো থাকবে। আমাদের যাওয়া তো একরকম ঠিকই। দেওয়ানজি বলেছেন একটা-দুটো পোর্টম্যান্টোতে পোশাক নিলেই হবে শুধু।
কেট বললো–এখনো দিন সাতেক দেরি। একটা কথা কিন্তু বলি।
বাগচী চোখের সামনে থেকে বই সরিয়ে কেটের দিকে ফিরলোবলো, কিছু ভাবছো মনে হচ্ছে।
একটা কথা কি–না, তোমার স্বাস্থ্য খারাপ হয়েছে তা কখনোই নয়, কিন্তু কথাটা কি, তুমি কিন্তু বেশ অনেকদিন থেকে বাড়িতেই বসে থাকছে।
–কেন, মাঝে মাঝেই রাজবাড়িতে যাচ্ছি না, স্কুলে ছাড়াও?
বলবো কি? প্রায় সপ্তাহ তিনেক হয়, তুমি কিন্তু কি সকালে, কি বিকেলে তোমাদের সেই ডিসপেনসারিতে একবারও যাওনি বোধ হয়।
বাগচী যেন বিস্মিত হয়ে গেলো এই আবিষ্কারে। কিছুপরে হেসে বললো–কেন যেতে হবে? সেটা কি আমার প্রফেশন? সে বেশ খানিকটা হো হো করে হাসলো কেটের অযুক্তি ধরে ফেলে।
সেদিন সকালে উঠেই বাগচী বললো– কথা তুমি মন্দ বলোনি, ডারলিং। চলো, আজ। সন্ধ্যায় আমরা দুজনেই দেওয়ানকুঠিতে যাবো। তারা সেদিন সন্ধ্যায় দেওয়ানকুঠিতে অনেকটা সময় কাটালো। তারা লাইব্রেরিতেই ইচ্ছা করে বসেছিলো, সুতরাং আলাপে বই এর কথাই বেশি হলো। আসবার সময়ে বাগচী নিজে থেকেই বললো–দেওয়ানজি, আমি ভেবে দেখলাম রাজকুমারের সেই চাকরিটা আমার গ্রহণ করাই উচিত হচ্ছে। তা শুনে হরদয়াল বললো–এটা খুব ভালো সংবাদ। আমি রানীমাকে জানিয়ে দেবো।
তারা যখন পথে বেরিয়েছে, তখন মাঝারি ধরনের জ্যোৎস্না পথে। এতক্ষণ আলাপের পরে তারা দুজনেই নিঃশব্দে চলেছিলো। তারা যখন গঞ্জের কাছে, কেট বললো–চাকরিটা কিন্তু অন্য জাতের। হঠাৎ কথা দিয়ে ফেললে না তো?
বাগচী বললো–কেন? ওটা কি একরকমের শক্তি দেয় না, ওই রকম চাকরি? হঠাৎ কেন?
কিন্তু হঠাৎ দৃশ্যটা তাদের চোখে পড়লো। গঞ্জের দোকানগুলোতে আলো থাকে, কিন্তু তারপরেই রাস্তাটা বরং আজ আলো-আঁধারি থাকার কথা, কিন্তু কিছুউঁচুতে একটা ফানুসের মতো আলো যেন। কেট তাই বলে বাগচীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। কিন্তু ভালো করে দেখে ফানুস বলা গেল না। বিস্মিত কেট জিজ্ঞাসা করলো–স্ট্রিট লাইটিং! আশ্চর্য! এই গ্রামে?
বাগচী বললো–হতেই পারে, হতেই পারে। কে যেন বলছিলো আমাদের গ্রামটা মিদনাপুর না হুগলির মতো শহর হতে চলেছে।
তাদের বেড়াতে ভালোই লাগছে, মনটাও লঘু। কেট বললো, তাহলেও আশ্চর্য হতে হবে। দ্যাখো, মিদনাপুর আর হুগলি কলকাতার কথা নাই তুলোম, সেসব জায়গায় আলো দেয় তো গভর্নমেন্ট, দেশের রাজা। এখানে এঁদের কি এত টাকা? আর এঁরা দেশের রাজাও নন।
বাগচীও লঘুভাবে বললো–অপচয় বলছো? এঁদের উপরে দেশের মঙ্গল দেখার ভার নেই বলছো? দ্যাখো, ডারলিং, আমরা নেহাত মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্ত নয় এমন এক দলের কাছাকাছি ঘেঁষে কি আমাদের এসব চিন্তা? সে হেসে নিলো। বললো, টাকা থাকলে অপচয় হয় বটে, কিন্তু দ্যাখো তার কিছু ঘটানোর ক্ষমতাও আছে।
কেট বললো–ডারলিং, ইতিমধ্যে তুমি যেন রাজবাড়ির ধরন-ধারণকে ভালোবেসে। ফেলেছো।
বাগচী হো হো করে হেসে বললো–বলছে, চাকরি পাওয়ার আগেই হলো? কিন্তু একটু গম্ভীর হলো সে। বললো, টাকা, টংকা, রূপিয়া, পৌন্ড যে নামেই বলো, ক্রাইস্ট অনেক দিন আগেই বলেছেন, ওটা থাকলে স্বর্গে যেতে দেরি হয়। হয়তো এ রাজবাড়ির পিতামহ পিতার সময়ে লুটপাট ইত্যাদি অর্থ সংগ্রহের ভিত্তি ছিলো। আমার তো মনে হয়, ও জিনিসটার সঞ্চয়ের গোড়ায় লুট, ধ্বংস, নৃশংসতা থাকেই। যদিও এখানকার প্রচুর ধনের কারণ কার্পণ্য। তুমি, উৎসবের রাতে দেওয়ানজি যা বলেছিলেন মনে করো। তিনি হয়তো বলতে চাইছিলেন কলকাতার কোনো কোনো রাজা যেমন সাহেব-মেমেদের মদ আর খানা দিয়ে লাখপতি থেকে কোটিপতি হতে চলেন, এখানে এই এক আধুনিকতা যে ইংল্যান্ডের ধার্মিক মানুষদের মতো রানী স্টকে এবং কম্পানির কাগজে টাকা রেখে যাচ্ছেন।
-তুমি কি সত্যি বিশ্বাস করো–ধর্ম অর্থাৎ পিউরিটানদের যেটা, তার সঙ্গে টাকার যোগ আছে?
–আদৌনা। এখান থেকে লুটপাট করে যারা ন্যেবর হয়ে ফেরেন তারাও স্টকে ঢালেন। কিন্তু আমার সন্দেহ তারা অন্য স্রোতেও ঢালেন। ফলে যারা সেখানে তিল তিল করে সঞ্চয় করে আর আচার ব্যবহারে পিউরিটান, অন্তত নির্দয়ভাবে মর্যালিস্ট তারাই প্রায় সব রেলরোডের মালিক।
