স্মার্তকন্যা নয়নতারার ভ্রুকুটি কেট ও বাগচী লক্ষ্য করলো না, কারণ কটাক্ষটা হলো শালের অবগুণ্ঠনের ভিতর থেকে।
বাগচী বললো, পিয়েত্রোর কাছে আমি যা শুনেছি তাতে মনে হয়, এটা চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ের কথা।
রাজচন্দ্র বললো–তা হতে পারে। সেখানেই পিয়েত্রো সেই ফুটফুটে ননীর পুতুল হেন চতুর্দশীকে দেখে থাকবে, আর সঙ্গে সঙ্গে,তার নিজের ভাষায়, নিজের হৃদয় দুহাতে উপড়ে সেই বালিকার পায়ে রেখেছিলেন। আসলে তার তো আর ইটালীয়ান নাম হয় না। তাকে না পেয়ে অতৃপ্ত মধুর যন্ত্রণায় এক ইটালীয়ান মহিলার স্মরণে তার নাম রেখেছিলেন। বিয়াত্রিচে, যেটা সংক্ষেপে এই বাইচে।
কেট বললো–এমন একটা ছোট্ট মেয়েকে পিয়েত্রোর হৃদয় দেওয়া উচিত হয়নি।
বাগচী বললো–কেট, আমি কিন্তু আসল বিয়াত্রিচেরও এরকম বয়সই ছিলো বলে পড়েছি। তাছাড়া ভালোবাসা বোধ হয় বয়সকে গ্রাহ্যে আনে না। তাকে যখন চিকিৎসা করতাম, পিয়েত্রো বলেছিলেন, সেই বালিকার প্রেম চাপার সুঘ্রাণের চাইতেও সুন্দর ছিলো, এমনকী সর্বশ্রেষ্ঠ ফরাসী মদের বোকেও তার তুলনায় কিছু নয়।
কেট বললো–এটা কিন্তু ফরাসী অতিশয়োক্তি, যদিও সুন্দর।
— নয়নতারা বললো–শেষ পর্যন্ত কিন্তু বয়সের, ধর্মের ব্যবধান বাধা হয়।
বাগচী বললো–আমার তা মনে হয়নি। সেই মহিলা ছিলেন পিয়েত্রোর সেই স্মাৰ্তমামার মেয়ে। হিন্দুদের মধ্যে এ রকম সম্বন্ধ থাকলে বিবাহ হয় না।
বাগচী তার পাইপ ধরালো। রাজচন্দ্র পিয়ানোর উপরে আঙুল রাখায় তার ঝংকার উঠলো। কিন্তু সে বরং কেটের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললো–গুড নাইট কেট, এরপরে বাজালে চাপার সুঘ্রাণটা থাকে না। অন্য একদিন এসে সকালের সেই বাজনার স্কোর তোমাকে দিয়ে যাবো। ভালোই। আমি নাম জানতাম না। শ্যা নামে একজনের।
রাজচন্দ্র উঠে তরোয়ালটাকে কোমরে বেঁধে নিলো। নয়নতারা হেসে বললো–এ পোশাকেও তো ওটা বেশ মানায়। তারা দরজার দিকে গেলে বাগচী ও কেট তাদের এগিয়ে দিতে গেলো গেট পর্যন্ত। এই সময়ে কেট দেখতে পেলো পায়রার ডিমের রং-এর শালের ঘোমটা মুখের দুপাশ বেয়ে নেমে এমনকী হাত দুখানাকে ঢেকে নয়নতারার হাঁটু অবধি নেমেছে। শালের ঘেরের নিচে লাল স্বচ্ছ শাড়ি। সারা গায়ে অলঙ্কার নেই, কিন্তু জুতা ছাড়া সুন্দর পা দুটোর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেই যেন একজোড়া সুন্দর অ্যাংকলেট, তা সোনারই হবে। রাজকুমারের গায়ের জ্যাকেটটার গাঢ় আকাশী রং, ট্রাউজার্সটার নীলে সাদা টান। একটা ঘোড়া বাঁধা আছেবটে। বাইরের সন্ধ্যা তো এখন প্রায় গাঢ় খয়েরি। চাঁদ আলো করতে পারছে না। কেট শুনলো, নয়নতারা বলছে, পালকিটাকে তাড়িয়েছেন দেখছি।
নয়নতারা ও রাজকুমার হাঁটতে শুরু করলো। ঘোড়াটা নিজে থেকেই পিছনে চললো।
কেট ঘরে ফিরতে ফিরতে সুখী মুখে ভাবলো, রাজকুমার যেমন বলেছিলেন ঘোড়াটাকে। চওড়া পিঠের মনে হচ্ছিলো। তাহলে তারা সরে গেলে রাজকুমার কি নয়নতারাকেও ঘোড়ায় তুলে নেবেন?
.
০৪.
এ রকম সংবাদ আছে, সেই বৎসরের শীতেই সেই প্রথম অ্যালবেট্রস নামে স্টিমশিপ রাজনগরের নদীতে চলাচল করেছিলো, কুতঘাটে একবেলা থেমেছিলো। যে রাজনগরের কাছাকাছি রেলরোড ছিলোনা তখন, যে গ্রামের অধিকাংশ মানুষের কাছে স্টিম-এঞ্জিন মাত্রই তখনো গল্পের বিষয়, সেই এক কুয়াশা-আচ্ছন্ন নদীর বুকে ভোরের অস্পষ্টতার সেই কলের জাহাজ তার আলো এবং হর্ন, এবং কালো আকৃতি নিয়ে নিশ্চয়ই বিস্ময়, কৌতূহল এবং অজানা আশঙ্কার সৃষ্টি করে থাকবে। তা যেন এমন এক একচক্ষু জলদানব যার অশুভ উচ্চ ছাগনিনাদের কথা এমনকী কোনো কাব্যে-পুরাণেও বলা যায়নি। হরদয়ালের চিঠিপত্র থেকে একটা মন্তব্য পাওয়া যায় :
স্টিমশিপ অবশ্যই উন্নয়নের সহায়ক হইবে। ব্যক্তিগতভাবে এই প্রচেষ্টাকে আমরা সমর্থন করি, কেননা যেখানে নদীপথ আছে সেখানে রেলপাতার তুলনায় স্টিমশিপ লাইন প্রবর্তন অনেক কম শ্রমে ও অনেক কম ব্যয়ে হইতে পারে। কিন্তু বলিব কী, হয়তো বহু দিনের সংস্কারে মনে হইল সব দিক দিয়া আচ্ছন্ন হইলেও হয়তো বা রক্তে কোথাও আরোগ্যের বীজ ছিলো, কিন্তু এই স্টিমশিপ যেন নদীরূপ শিরা বাহিয়া দেশের অন্তঃকরণকেও আক্রমণ করিল। কিছু আর অজিত রহিল না।
এই স্টিমশিপ কেন এসেছিলো তা নিয়ে মতদ্বৈধ কিছু আছে। অ্যালবেট্রস জাহাজ যে একবেলা কুতঘাটে ছিলো সে ঠিক নয়। কারণ সেটা পরে নিয়মিত কয়েকবার এসেছিলো। এরকম মত আছে এই অ্যালবেট্রস স্টিমশিপে সেই শীতেই পরে জঙ্গীলাট এসেছিলো রাজনগরে। জঙ্গীলাট যে এসেছিলো এবং প্রায় এক সপ্তাহ ছিলো রাজনগরে তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আছে : রাজবাড়ির সেই বুলন্দ-দরওয়াজার অনুকরণে তৈরী সদরদরজার সামনে রাখা ক্যারেজসমেত দুটি গান মেটালের কামান। কামানের চোং-এ মেরামত করা ফাটল থেকে তার ব্যবহারযোগ্যতা সম্বন্ধে নিশ্চয় সন্দেহ করা যায়। কিন্তু তার গায়ে খোদাই করা সংবাদ থেকে জানা যায় কামান দুটি কানপুরকে বিদ্রোহমুক্ত করতে ব্যবহার হয়েছিলো। এবং তা জঙ্গীলাটের উপহার। অ্যালবেট্রস জঙ্গীলাটকে নিয়ে যাওয়া-আসা করেছিলো তা প্রায় নিশ্চিত।
প্রথমবার তা হয়তো জলপথের গভীরতা নাব্যতা ইত্যাদি পরীক্ষা করতেই এসেছিলো, পরে কিছুদিন কিন্তু মাঝেমাঝেই আসতো, অন্তত যতদিন শীতের ভাবটা ছিলো। বসন্তের মাঝামাঝি হঠাৎ একবার চলে গিয়ে আর আসেনি। ডুবেছিলো কি? পরে, তা অনেকদিন পরেই, অন্য জাহাজ চলতো এই লাইনে। কিন্তু এটা সম্ভব নয় যে ইন্ডিগো কমিশনের সাহেবরা এসেছিলো অ্যালবেট্রসে। কারণ অ্যালবেট্রস প্রথম এসেছিলো সরস্বতী পূজার সকালে, তখন জানুয়ারির শীত, আর ইন্ডিগো কমিশনের সভ্যরা এসেছিলো ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। ক্রিস্টমাসের বরং আগে।
