রাজচন্দ্র বললো–জনৈক মহিলার প্রিয়জনের পাপস্খলনের জন্য এই বৈশাখে জলদানের ইচ্ছা দেখা দিয়েছে। জলদান নাকি প্রাণদান। জলদানের সব চাইতে ভালো উপায় দীঘি খুঁড়ে দেওয়া। দীঘি তো শূন্যে হয় না। জমিতে হবে। আর জমি দীঘি হয়ে গেলে সেখানে চাষের জমি কিংবা বসত বাড়ি আর থাকে না। এখন সেই মহিলার ধারণা চাষের জমি কিংবা বসত বাড়ি নাকি শুধু তাই নয়, অনেক স্মৃতিতে জড়ানো নিজের জীবনের অংশ।
বাগচী বললো–তো বটেই। একথা একশোবার সত্য।
-সেই মহিলার মতে প্রত্যেক পুরুষের একমুঠো মাটি থাকা দরকার, যা তার জীবনের দুর্গ, যা গেলে নাকি তার পৌরুষেরও কিছু থাকে না।
বাগচী জিজ্ঞাসা করলো–জমিদার যদি জমিটা কিনে নেন দান করার আগে?
–সে নাকি আরো খারাপ। তা নাকি টাকার প্রলোভনে নীতিভ্রান্ত করা। ঘুষ দিয়ে দুর্গ দখল। বাগচী এক মুহূর্ত ভেবে নিলো। আন্দাজ হচ্ছে এটা রাজকুমার এবং নয়ন-ঠাকরুনের মধ্যে কোনো ব্যাপার। হয়তো লঘু প্রমোদও আছে। সে বললো, রাজকুমার যদি গ্রামের মাঝখানে একটা দীঘি কাটিয়ে দেন তাহলে কিন্তু জনসাধারণের উপকারই হয়।
নয়নতারা বললো–রাজকুমার, আপনি না হয় আপনার আর্জিটা মাস্টারমশাইকে দিয়ে যান। উনি দেখবেন। কফি খাবেন না কী বলছিলেন? কিংবা নাকি বাজনা হবে?
বাগচী বললো–ও, হ্যাঁ। রাজকুমার আপনার সেই তরোয়ালটা। সেটা তো এখানেই রয়েছে।
কেট বললো–রাজকুমার, ও কফিটা আপনি খাবেন না, জুড়িয়ে গিয়েছে। আমি আবার করে আনছি।
কেট কফি করতে উঠলো। বাগচী তরোয়ালটা আনতে গেলো। রাজকুমার উঠে পিয়ানোর দিকে গেলো। বাগচী তরোয়াল এনে সোফার উপরে রাখলো। রাজকুমার পিয়ানোর ডালা খুলে কিছু ভাবছে তখন। নয়নতারা একেবারে স্থির হয়ে বসে।
কিন্তু পার্লারের দরজার কাছে এসে কেট নয়নতারাকে ডাকলো। নয়নতারা সেদিকে উঠে গেলো। কিছুক্ষণ তারা কিচেনেই আলাপ করলো সম্ভবত। কেট কফি নিয়ে ফেরার আগে নয়নতারা ফিরলো না।
কেট টিপয়ে কফি রাখলে রাজচন্দ্র সেদিকে এসে বসলো।
রাজচন্দ্ৰ কফি নিলে নয়নতারা বললো–একটা কথা বলবো। ভরসা দেবেন? এ ব্যাপারে মাস্টারমশাই আর কেটও আগ্রহী। কীবল নামে একজন গোরা সিপাহী নাকি আছে। সে নিশ্চয় আমাদের চাইতে ভালো চেনে অস্ত্রশস্ত্র।
রাজচন্দ্ৰ কফিতে চুমুক দিয়ে বললো–সন্দেহ কী? নইলে কি বাহাদুর শা, কি নানা এমন মার খায়? অন্তত ব্রিচলোডার রাইফেল আরো সংগ্রহ করা উচিত ছিলো নামার আগে।
নয়নতারা বললো–আমি শুনেছি কদার সঙ্গে সকালে রোজ তরোয়াল খেলেন আজকাল?
–তাতে কী?
-কীবল বলেছে, কেটও এখন বলছে, এই ধারালো তরোয়াল নিয়ে তা উচিত হয় নানয়নতারা বললো।
বাগচীও বললো–হ্যাঁ, রাজকুমার, নয়নতারা-ঠাকরুন এ বিষয়ে ঠিকই বলছেন।
নয়নতারা হাসতে গেলো, কিন্তু তার স্বরটা গাঢ় হলো। বললো–এটা আমাকে দান করতে হবে, রাজকুমার।
রাজকুমার একটু বিস্মিত হয়ে বললো–ও! কিন্তু সে নয়নতারার মুখের দিকে চাইলো। একমুহূর্ত পরেই হেসে বললো, মাস্টারমশাই, আপনি সাক্ষী, নয়নতারা আমার দান নিতে রাজী হয়েছে। তা হলে বলো, দীঘিটা কোথায় হচ্ছে, কতটা লম্বা চওড়া হবে?
বাগচী ও কেট এতক্ষণের আলাপের এদিকে গতি দেখে কৌতুক ও আনন্দে হাসিমুখে বসে রইলো। কিছু বলতে ভুলে গেলো। নয়নতারা নিচু গলায় চোখ নিচু করে বললো–তাই যদি শর্ত হয় হোক, তাহলে কিন্তু এটা আর খেলা হবে না।
সেদিন কিন্তু পিয়ানো বাজানো হলো না। রাজচন্দ্র পিয়ানোর কাছে গেলো, পিয়ানোর ডালা খুলে বললো–সেই সকালেরটাই বলছো? তাহলে তোমরা কাছে এসো। কিন্তু পিয়ানোর ডালায় আটকানো রূপার ফলকটা আর তাতে লেখা নামটা এই সময়ে তার চোখে পড়লো। রাজচন্দ্র বললো–দেখে যাও নয়ন।
নয়নতারা কাছে গেলে বললো–দেখছো? এটা একটা বিলিতি নাম। উচ্চারণ বাইচে। বলল তো কেন? পিয়েত্রোরা শুধু তরোয়ালবাজ ভাবলে ভুল করবে। এটা তার প্রেমিকার নাম। এই নামে তিনি ডাকতেন তাকে। কেটও বিস্মিত হলো। নয়নতারা তোহবেই। কেটের বাড়িতেই তো পিয়েত্রোর এই পিয়ানো রাখা হয়েছিলো।
পুরনো প্রেমকে লোকে ঠাট্টা করতে পারে। নয়নতারা বললো–সেই ফরাসী মহিলা কি এদেশে আসতে রাজী হয়নি?
রাজচন্দ্র বললো–তাহলে আর একটু গোড়া থেকে বলতে হয়। পিয়েত্রোর জননী ভারতীয় মহিলা ছিলেন তা কি তার আনুকূল্যে বসানো এই স্কুল থেকে আন্দাজ করতে পারোনি? মায়ের নাম পিয়েত্রো আমাকে বলেননি বটে, কিন্তু আমার ধারণা তার নাম জ্ঞানদা ছিলো। পিয়েত্রোর মামা ছিলেন এক স্মার্ত ব্রাহ্মণ। তিনি তাঁর বিধবা বোনকে পিয়েত্রোর পিতার সঙ্গে বিবাহ দিয়ে স্বদেশ ও স্বসমাজ ত্যাগ করেছিলেন। পশ্চিমের কোনো তীর্থশহরে বাস করতেন বলে ধারণা হয়। তখন পিয়েত্রোর বয়স হয়েছে, চল্লিশের দিকে চলেছে। জাহাজের ব্যবসা করেন। এদেশের রেশম ও মসলিন ইউরোপে পাঠান; উত্তর-ভারতেও বন্দুক, ব্রোকেড ও রেশমের ব্যবসা করেন। পিয়েত্রো কখনো কখনো সেই স্মর্তবাড়িতে যেতেন। সেই স্মাৰ্তমশায়ের পরিবারের কন্যাদের ফরাসিনী না হয়ে স্মার্তকন্যা হওয়াই স্বাভাবিক। চোখে চোখ না পড়লে ভালোবাসাও হয় না। নিজের মনের মতো করে নাম রাখাও যায় না। ওদিকে স্মার্তকন্যারা যে কী নির্দয় হতে পারে!
