লাঞ্চে সে ডানকানকে বললো, ডানকান প্রথমে না জানার ভান করলো। পরে বললো, মারধোর করলে কমিশন দোষ দেখবে। এটা কি এমন অপরাধ পিনালকোডে কোনো ধারায় পড়বে? সে হাসলো। পরে আবার বললো, যাই হোক লোকটা অসন্তোষ ছড়ায়। তুমি চিনে রাখলে ভালো করবে। রায়তদের বলছে, দাদন নিও না, ঋণ নিও না। পিছিয়ে পিছিয়ে যাও, এড়িয়ে এড়িয়ে চলো।
বুদ্ধিটা তবে তোমার? কীবল জিজ্ঞাসা করলো।
ডানকান হো হো করে হেসে বললো, বিশ্বাস করো, তা নয়।
কীবলের একবার মনে হলো, পুরুষের কি এত চাইতে বড়ো অপমান আছে?
কিছুক্ষণ পরে আবার তার মনে হলো, এ অবস্থায় ভারতীয় স্ত্রীলোকেরাও বোধ হয় রটায় না। তাছাড়া এই তো ডানকানও, সেখানে কেট এমনকী প্রিন্স যেমন, কেউই কিন্তু তাকে দেখে কোনো পার্থক্য বুঝতে পারছে না।
.
লাঞ্চের শেষে কেট ও বাগচী পার্লারে বসবে ঠিক করলো। বাগচী জানালো, তখন আর সে স্কুলে যাচ্ছে না। কেট জানালো, বাগচীর আপত্তি না থাকলে সে সার্জের জামাটাকে কাটা শেষ করবে। বাগচী জানালো, তা করতে করতে কেট যদি গল্প করে তবে বাগচীর আপত্তি থাকবে না।
কিন্তু পার্লারে ঢুকে কিছুক্ষণের জন্য আবার তারা পুরনো কথায় ফিরে গেলো।
বাগচী বসতে গিয়ে অবাক, বললো–আরে এ কি? এই দ্যাখো, এটাই কি সেই তরোয়ালটা রাজকুমারের, যার গল্প করছিলেন? কী কাণ্ড!
কেটও অবাক। বললো–আচ্ছা অন্যমনস্ক তো রাজকুমার। এখন কী হবে?
বাগচী বললো–তুমিও কম অন্যমনস্ক নও! নইলে এর আগেই দেখতে পেতে। কিন্তু। এখন? এ তো মারাত্মক ব্যাপার। দিয়ে আসবো? নাকি কাউকে দিয়ে খবর পাঠিয়ে রাজকুমারের কাছে জানতে চাইবো? রসো, না হয় শোবার ঘরের কার্ডে রেখে আসি।
বাগচী খাপসমেত তরোয়ালটা শোবার ঘরে রাখতে গেলো। তখন কেট আবার একটু ভাবলো। তার মুখ তো চিন্তার ফলেই উজ্জ্বল। তার সেই সকালের দৃশ্যটা মনে এলো, পাশাপাশি যেমন কীবল ও রাজকুমারকে দেখেছিলো। সুন্দর! দুজনকেই দু রকম সুন্দর দেখাচ্ছিলো। তফাতও আছে। তার আবার মনে পড়ল,কীবলের চোখ দুটিতে যেন নেশার মতো কোনো আগ্রহ ছিলো। অন্য দিকে রাজকুমারের চোখ দুটি যেন দূরকে দেখছিলো। নাকি অস্থির বলবে? অস্থিরতাই বোধ হয়। দুজনকে মুখোমুখি বসিয়ে কফি করতে গিয়ে সে তো নিশ্চয়ই আশঙ্কা করছিলো, সেই আতপ্ত উত্তেজিত পুরুষ দুটি কী বা ঘটায়! কিন্তু তার মধ্যেই হঠাৎ পিয়ানো শুনেছিলো। কেটের মুখটা হাসিতে উজ্জ্বল হলো।
বাগচী ফিরে বললো–দ্যাখো, একজনের যা খেলার, অন্যের তাতে কত ভয়?
কেট বললো, কিন্তু জানো একটা কথা? কীবল সৈনিক, সে বোঝে। এ নিয়ে কি রাজকুমারের ফেনসিং খেলা উচিত হচ্ছে?
বাগচী ভাবলো, এটা কি ছেলেমানুষের অজ্ঞতা? তাহলে কি আজ সন্ধ্যায় দেখা করে এটাকে খেলায় ব্যবহার করতে নিষেধ করবে? বললো–তুমি একটা অসুবিধায় ফেললে, ডার্লিং ।
কেটও ভাবছিলো। সে বুদ্ধি করে বললো, এক কাজ করলে হয়। আমি কী নয়ন ঠাকরুনকে বলে দেবো?
এই সময়ে কেট ভাবলো, এসব কি রাজকুমারের অস্থিরতা? নাকি চপলতা বলবে? নাকী কিছু না ভেবে যেদিকে খুশি বয়ে যাওয়া?
সময় তখন সন্ধ্যার দিকে। আলোর রাত নয়, অন্তত চাঁদের আলো থাকলেও নিতান্ত ক্ষীণ ছিলো। বাগচীইতিমধ্যে তার স্টাডিতে, কেট সন্ধ্যায় কফি তৈরীকরতে কিচেনে। কেট শুনতে পেয়েছিলো, পার্লারে কারা কথা বলতে বলতে ঢুকছে। সে বেরিয়ে এসে আপাদমস্তক চাঁদরে ঢাকা নয়নতারা এবং পুরো ইংরেজি পোশাকে রাজচন্দ্রকে দেখতে পেলো। তার উচ্চকণ্ঠের অভ্যর্থনার সাড়া পেয়ে বাগচীও বেরিয়ে এসেছিলো।
তাদের বসিয়ে বাগচীকে সেখানে রেখে কফি করে আনলো কেট।
রাজচন্দ্র তখন বললো, দ্যাখো, কেট, কেমন ধরে এনেছি। বাড়ি ফিরছিলেন দিনের কাজ শেষ করে। আমি তো বাপু আজ আমার বেতো চওড়া পিঠের ঘোড়াকে ব্যায়াম করাবো বলে রাস্তার পাশ দিয়ে চলেছিলাম। এদিকে পালকিটা দেখি রাজকুমারকে অগ্রাহ্য করে সার্বভৌমপাড়ায় ঢোকে। থামাতে হলো। তো দেখি পাতার আড়ালে ঘুমন্ত ফুল। বললুম, চলল, না হয় একটু ঘুরি। রাজী কি হয়? শেষে বললুম, যা কখনো দ্যাখোনি তাই দেখাবো। পিয়ানো বাজাবো তোমার সামনে। অবশ্য পথে অন্য সমস্যাও উঠেছে।
নয়নতারা নিভৃতে কেটকে চোখের ইশারা করলো, যেন বললো, সবটুকু বিশ্বাস করবে কি?
উৎসাহিত কেট বললো–তাহলে কফির পরে পিয়ানো হোক। সকালে যেটা একটু হচ্ছিলো।
রাজচন্দ্র বললো–আপত্তি নেই। কিন্তু তার আগে মাস্টারমশাই আমাদের মামলাটা শুনুন।
নয়নতারা বিপন্ন বোধ করলো। কিন্তু এই বুদ্ধি করলো, বাধা দিলে উল্টোপাল্টা ফল হবে, অনেক অর্ধসত্য রসিকতাচ্ছলে বলে যাবেন রাজকুমার। মুখে কিছু আটকাবে?
রাজচন্দ্র বললো, মামলার বিবরণ দেওয়ার আগে একটা ফয়সালা হোক। একজন জমিদার তার প্রজাকে নিঃশর্ত কিছু দান করতে পারে কিনা?
এটা তো একটা হাল্কা মেজাজের কিছু, যা খেলার মতো। বাগচী বললো–দানের অধিকার সকলেরই আছে, আর তা নিঃশর্ত হওয়াই উচিত।
নয়নতারা নিচু গলায় বললো, মাস্টারমশাই ডিক্রি দিলেও, রাজকুমার, মামলাটা উঠে যায় না। দানটা যদি জমি হয় তবে বুঝতে হবে রাজকুমার তা অন্য কোনো প্রজার কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে দান করবেন।
হাসিমুখে বাগচী বললো–তাহলে আমি বোধ হয় ভুল করেছি। এ কথাটাও ঠিক বটে, রাজকুমারের সব জমিই কোনো না কোনো প্রজার দখলে থাকার কথা। মামলার বিবরণটা শোনা দরকার।
