কেটের বেশ স্পষ্ট মনে আছে এই কথাগুলো বলতে বলতে কীবল যেন অতীতকে মনে এনে উত্তেজিত হয়েছিলো। কেট প্রত্যেকটা বাক্যের বাংলা অনুবাদ করে যাচ্ছিলো। এই জায়গায় থেমে কীবল বলেছিলো, অফিসাররা ঘোড়ায় ওঠবার আগেই তরোয়াল খুলে হাতে নেয় বটে, কিন্তু এই রকম নয়, এটা ক্যাভালরির তরোয়াল নয়।
কেট এটাকে অনুবাদ করে দিলে রাজকুমার বলেছিলো, এটা ক্যাভালরির কেন হবে? পিয়েত্রোর দ্যাখো, লেফটেন্যান্ট, এটায় সোনার অক্ষরে পিয়েত্রোর নাম লেখা আছে। এই বলে রাজকুমার খাপসমেত তরোয়ালটাকে কীবলের হাতে দিয়েছিলো। কীবল খাপ থেকে তরোয়াল বার করে সোনা দিয়ে এমবস করে লেখা জাঁ পিয়েত্রো দেখে বলেছিলো, আশ্চর্য, এটা সেই ওয়াইলি ফকস পিয়েত্রোর? কেটের নিজের দ্বিধা হচ্ছিলো, পিয়েত্রোকে যে ফকস বলা হলো তা অনুবাদ করা চলে কিনা। কিন্তু রাজকুমার বলেছিলো, কেট, ডারলিং, ফকস মানে আমি জানি। তুমি হয়তো পিয়েত্রোকে রোঁয়া-ওঠা একটা উলফ মনে করো। তা হোক, তুমি বলো, এটা পিয়েত্রো পায়ে দাঁড়িয়ে ভাজতেন।
কেট অনুবাদ করলে কীবল বলেছিলো, তা কীকরে হবে? এ তো ফেনসিং-এর উপযুক্ত নয়।
কেটের তর্জমা শুনে রাজকুমার উঠে দাঁড়িয়ে সস্নেহে তরোয়ালটা খাপসমেত নিজের হাতে নিয়ে মুঠি ধরে তাকে টেনে বার করলো। তখন কেট লক্ষ্য করেছিলো, রাজকুমার কীবলের চাইতেও কয়েক ইঞ্চি লম্বা। রাজকুমার হেসে বললো, কিছুক্ষণ আগেই তো এটাকে নিয়ে খেলছিলাম। তাকেই তো ফেনসিং বলে, না কী?
কেটের অনুবাদ শুনে কীবল বলেছিলো, না, রায় খানখানান, তা আপনার পক্ষে উচিত হবেনা। এটা ফেনসিং-এর ফয়েলনয়। এত ভারি এবং ধারালো তরোয়াল যে এতটুকু ভুলেই খেলার সঙ্গীর প্রাণ যাবে। ফেনসিং-এর তরোয়াল হাল্কা, তুলনায় ছোটো হয়, ধার প্রায় থাকেই না। সে রকম ফয়েলের জন্য কলকাতায় খোঁজ করতে হয়।
রাজকুমার শুনে ভাবলো। পরে বলেছিলো, কেট, জিজ্ঞাসা করো, আমি কলকাতা থেকে ফয়েল আনিয়ে নিলে লেফটেন্যান্ট আমাকে ইংরেজি তরোয়াল চালানো শেখাতে পারে কী না, আর তা শেখালে কত করে কী নেবে?
কেটের তর্জমা শুনে কীবল বলেছিলো, আপনি আনিয়ে নিন, আমি যথাসাধ্য করবো যদি আপনি ইংলিশ স্টাইলটা শিখতে আগ্রহী থাকেন।
কেট এই জায়গায় আর একবার প্রস্তাব করলে রাজকুমার উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলো, কীবলকে আমার পক্ষ থেকে ধন্যবাদ দাও।
কীবল বলেছিল, প্রিন্সকেও ধন্যবাদ। এখন বিশ্বাস করছি, ডানকান যেমন বলেছিলো, আপনার মতো লোক না থাকলে পিয়েত্রো এখানে রক্তপাত ঘটাতে।
কেট এটাকে অনুবাদ করলে রাজকুমার বেশ জোরে জোরে হেসে উঠলো। বললো, তা বটে, তা বটে। একবার পার্লারে পায়চারি করলো, তারপর কীবলের সামনে এসে বাও করে বললো, মের্সি, শের আমি, বঁজুর মঁশিয়ে লেফতেন্যান্ত।
.
০৩.
কীবল লাঞ্চের জন্য ফিরতে ফিরতে কী ভাবছিলো তা বলা হয়েছে। সে যখন মরেলগঞ্জের কুঠির সামনে তখন ভাবলো, ডানকানের ব্যাপারটা ভাবো। উত্তেজনার মুখে কী করে বোঝালো মেহের, ফুলী জুড়ানের বোন হতে পারে, কিন্তু ডানকানের মেয়ে, যদিও সঙ্গে ঘুমোয়। এ কি অ্যাবসলিউট পাওয়ারের লক্ষণ? যা হোক, এটা তো আর মাস দুয়েকের ব্যাপার, তারপর জুড়ানের কাছে ফিরবে, তখন তো ভুলেও যাবে। গোটা দু-তিন গিনি দিলেই যথেষ্ট। কিন্তু কনডিশন, জুড়ান জানলে চলবে না। একই গাধায় সে আর জুড়ান চড়েছে এটা গোপন রাখা চাই।
যখন সে কুঠির সামনে নামবে, ঘোড়র উপরে থাকায়, দৃশ্যটা কীবলের চোখে পড়লো। একটা ছোটো শোভাযাত্রা যেন এগিয়ে আসছে। কিন্তু ঘোড়া থেকে নেমে সে একটু বিষণ্ণ বোধ করলো আবার। মনে মনে বললো– : ম্যাগি, তুমি নিজেই বলেছিলে তুমি সোলজার, তারা একটু এদিক ওদিক করে, কিন্তু সাবধান, খোরপোষ করতে না হয়। যা শুনি সেখানে তো সবই নেগ্রেস। …তাছাড়া, দ্যাখো, কেট কিছু মনে করেনি।
কীবল অবাক হলো, শোভাযাত্রাটা সুরকির পথ ধরে তাদের বাংলোর কাছাকাছি এসে পড়েছে। সামনের লোকটি কি পাগল? গায়ে কামিজ, কিন্তু কোমর থেকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ। তার হাত দুখানা পিঠমোড়া করে বাঁধা, বোধ হয় তারই ধুতিতে। তার বাহু আর পিঠের মধ্যে একটা লাঠি ঢোকানো আর সেই লাঠিটাকে দু প্রান্তে ধরে দুজনে লোকটিকে সামনে ঠেলছে। তারা হাসছে। সেই উলঙ্গ লোকটি ভাঙা গলায় অব্যক্ত চাপা আর্তনাদ করছে।
সিঁড়ির উপরে দাঁড়িয়ে পড়েছিলোকীবল। তারা আর একটু কাছে আসতে কীবল চিনতে পারলো, পিছনের লোকদের মধ্যে একজন জুড়ান পাইক। সামনের লোকটিকেও চেনা-চেনা মনে হলো। একটু ঠাহর করে দেখে নামটা মনে পড়লো। এই সেই অমর্ত্য দাস। লোকটি একদিন ফ্যাক্টরির কাছে খুব প্রতিবাদ করেছিলো বটে। লোকটি ধার্মিক, অবশ্য পেগানরা যেমন হয়, আর কিছু কিছু লেখাপড়াও জানে। আর এখনো তো বোঝাই যাচ্ছে, পাগলরা ধরা দেওয়ার আগে যেমন করে, তেমন ধস্তাধস্তি করে থাকবে, সেজন্য তার গায়ে ধুলো এবং রক্ত।
কীবল বললো–আহা জুড়ান, পাগলকে কষ্ট দেয় না। তাছাড়া এই কুদৃশ্য এদিকে কেন?
কথাটা বলে পিছন ফিরে সে দেখলো, তার আশঙ্কা সত্য হতে চলেছে। ঘেরা বারান্দার জালের ওপারে ফুলী দাঁড়িয়ে, যেন উপভোগ করছে।
জুড়ান জানালো, এখনো পূর্বদিকের গ্রামটাতে ঘোরানো হয়নি। এর আত্মীয়স্বজনরা সেদিকেও আছে, তারা দেখবে না? মুহূর্তে কীবল বুঝতে পারলো, সেটা পাগলকে আটকানোর ব্যাপার নয়। উদ্দেশ্যটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু সেটা এক অভূতপূর্বশয়তানী জুড়ানের।
