কিন্তু সে তখন ঘোটকীটাকে দেখছে। ওয়েলার নয়। মুখটা সরু হওয়ায় ঘাড়টা অপেক্ষাকৃত লম্বা, পাগুলো সরু, যদিও গাঢ় খয়েরি। ঘাম-ধোঁয়ানো নিতম্ব দেখে শক্তির আন্দাজ হয়। ঘোড়াটার পিঠে সুবেশ রূপবান সওয়ার। এটাকেই কি সকাল থেকে খুঁজছিলো? শীতের সকালের রোদে তপ্ত সাদার দাগটানা নীল আকাশের নিচে এমন ঘোটকীটা!
সে নিজেকে বললো–দ্যাখো, দ্যাখো। সে ঝোপটার বাইরে এলো। ছুটন্ত ঘোটকীর পিঠে সেই সওয়ার স্ক্যাবার্ড থেকে লং সোর্ডটাকে টেনে বার করতে চাইছে, কিন্তু সোর্ডটা এত লম্বা যে, দুবার তো তার চোখের সামনেই ঘটলো, তা পেরে উঠছে না। তা করতে গেলে ঘোটকীর বাঁ কানটাই উড়ে যাবে।
অভ্যস্ত ভঙ্গিতে, সে তো ক্যাভালরিরই লোক, কীবল নিজের ঘোড়াটাকে সেই ঘোটকীর প্রায় পাশে এনে ফেলে গ্যালপ করাতে শুরু করে, ক্যাভালরিরই তো কায়দা, বললো–ইউ ডোন্ট ডু ইট লাইক দ্যাট।
অন্য সওয়ার মুহূর্তে ঘোড়ার রাশ টেনে ঘোড়াকে প্রায় পুরো ঘুরিয়ে পাশ থেকে সামনে গিয়ে কীবলের মুখোমুখি হলো, কীবলকেও তখন বিপরীতে চক্কর দিয়ে মুখোমুখি ধাক্কা থেকে নিজেকে আর ঘোড়াকে বাঁচাতে হলো। এক মুহূর্তেই দুজনে দম নিয়ে নিলো। কীবল বললো–আপনি কে হন? প্রিন্স কী? একইসঙ্গে রাজচন্দ্র বললো, তুমি কে? কী তেমন করা যায় না বলছো?
আমি লেফটেন্যান্ট আর্থার হোগাৰ্থ কীবল। ক্যাভালরিতে গ্যালপিং ঘোড়ার উপরে লং সোর্ড টানা হয় না। ঘোড়া এবং পাশের মানুষ ইনজিওর্ড হয়। সেজন্য চার্জের আগেই সোর্ড আনসীফ করা হয়।
কথাগুলো ইংরেজিতে বলে সে প্রিন্সের মুখে বিস্ময় দেখে ইংরেজিতেই জিজ্ঞাসা করলো–প্রিন্স ইংরাজি বলেন কিনা?
রাজচন্দ্র খানিকটা বুঝছিলো। সে ফরাসীতে বললো–তুমি কি ফরাসি বলো? একজন দোভাষী পেলে হতো। আমি রায় রাজচন্দ্র খাঁখানা।
রাজকুমার যেন দোভাষীর জন্য এদিক ওদিক লক্ষ্য করলো। তার মুখ ব্যায়ামের ফলে রক্তাভ, এখন যেন খানিকটা বিব্রত হওয়ার কুমারীর ব্রীড়ার মতো রক্ত চলাচল করছে গালে। সে কিছু না বলে অদূরে বাগচীর কুঠিটাকে দেখিয়ে দিয়ে বললো–কাম।
তার কুঠির এত কাছে দুজনে বলেই বলা যায় ভিন্ন ভিন্ন কারণে তারা বাগচীর বাড়িতেই যাচ্ছিলো।
.
সে সময়ে বাগচী তার স্কুলে ছিলো, মৌখিক পরীক্ষার ফলাফলের ট্যাবুলেশন এবং মডারেশনে সে ব্যস্তই ছিলো। লাঞ্চের পরেই সে বাড়িতে থাকবে স্থির করেছিলো। কেট তাকে বরং সকালের ঘটনাটাকে এ রকম করে বলেছিলো। লাঞ্চের পক্ষে একটু দেরি করেই এসেছিলো বাগচী। কেট বরং অপ্রস্তুত, তার কাজ তখনো শেষ হয়নি। সুতরাং এসো, এসো, কিচেনেই বসো। যেটুকু বাকি তা করতে করতে গল্প করবো। বলে বাগচীকে কিচেনে বসিয়ে কেট বললল : সে তখন সেই লাল সার্জটাকে কাটার জোগাড় করে নিয়েছে, এমন সময় দুজন পুরুষকে একসঙ্গে ঢুকতে দেখে বিস্ময়ে বাকবন্ধ তার। দুজনেরই মুখ লাল। কপালে ঘাম, দুজনের মাথাই যেন তাদের পার্লারের সিলিং ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। একজনের পরনে শালের আচকান,শালের চুস্ত, কুঞ্জাদার মুরেঠা, কোমরে লম্বা সোর্ড। আর একজনের পরনে ফ্ল্যানেলের রাইডিং কোট, ব্রিচেস, হাতে রুপো বাঁধানো ক্রপ। বাগচী মিটমিট করে হেসে বললো–একজন তো রাজকুমার। তখন কেট হেসে বলেছিলো, রাজকুমার হেসে বললেন, কেট, মিট মাই ফ্রেন্ড লেফটেন্যান্ট কীবল, মাই ফ্রেন্ড মিসেস ক্যাথরীন বাগচী। আমার ইংরেজি ফুরিয়ে গেলো। কীবল আমাকে কিছু শেখাতে চায়। তুমি প্রথমে ক্লান্তদের কফি খাওয়াও, পরে দোভাষীর কাজ করো।
কেটের শুধু বিস্ময় নয়, ভয়-ভয়ও করছিলো। কিন্তু গল্পটা বলতে গিয়ে সে অনুভব করলো, তা বোধ হয় বলা যায় না। ভয়ই কি সেটা? কীবলের চাহনিতে কী যেন ছিলো যাকে আগ্রহ জাতের কিছু বলা যায়। এবং তাতে তার মনটা যেন কেমন শিউরে উঠছিলো। যাই হোক, কী করা উচিত বুঝতে না পেরে কেট কফি করতে চলে গিয়েছিলো। ভাবছিলো, সে সময়ে কী না ঘটে। কিন্তু দু মিনিটেই পিয়ানো বাজতে শুনেছিলো। তা যে রাজকুমার তা বুঝতে পেরেছিলো।
কেট কফি নিয়ে এসেছিলো। ততক্ষণে কীবল রুমাল দিয়ে ঘাম মুছে ফেলেছে, রাজকুমার পিয়ানোর টুল থেকে উঠে এলেন। কিন্তু কফি নামাতে গিয়ে কেট দেখলো সেই সেন্টারপিসটার উপরে লাল মখমলে ঢাকা একটা প্রকাণ্ড তরোয়াল। রাজকুমার সেটাকে কোলে নিয়ে বসলে কফি খাওয়া শুরু হলো। আর আলাপও। দোভাষী হিসাবে তাকে মাঝখানে বসতে হয়েছিলো।
রাজকুমার একবার জিজ্ঞাসা করলেন, কীবল আধুনিক যুদ্ধে যোগ দিয়েছে কিনা? যখন গোলাগুলি চলতে থাকে তখন ঘোড়সওয়াররা কীরকম ভাবে অগ্রসর হয়? কীবল বলেছিলো বটে ঘোড়া ছোটানোর আগেই তরোয়াল হাতে নেওয়া হয়, ঘোড়াই বা কী। গতিতে চলে?
এটাকে কেট ইংরাজিতে অনুবাদ করে দিলে কীবল যা বলেছিলো তা ক্রিমিয়ার গল্প। শদলের ব্যাটারি দখল করতে তাদের ক্যাভালরি চার্জ করেছিলো। শত্রুরা প্রস্তুত ছিলো এটা। জানা ছিলো না। ফলে সাতশো জনের মধ্যে তিনশো জন ফিরেছিলো মাত্র। তখন মনের অবস্থা কী রকম হয় বলা যায় না। নেশা, ভয়, পিছুটান, সম্মুখবেগ সবই থাকে। জীবনের প্রথম। নারী কিংবা প্রথম বেত্রক্রিয়ার কথা মনে এসে যেতে পারে, কিংবা নিজের ঘরের কথা। কিন্তু ঘোড়ার উন্মত্ত গতি; কামানের শব্দ, আঘাত; সঙ্গীদের আর্তনাদ ও রাগের চিৎকার; অফিসারদের চিৎকার করে বলা নির্দেশ; তরোয়াল, বল্লম, লাগাম ঠিক করে রাখা; গোলার গর্ত, পড়ে যাওয়া সঙ্গীকে ও তার ঘোড়াকে টপকে যাওয়া; দুপাশের ঘোড়ার ধাক্কা থেকে নিজেকে ও ঘোড়াকে বাঁচানো–অন্য সবকিছুকে মন থেকে তাড়িয়ে দেয়।
