ডানকান বললো, ১৮৫৮-৫৯ ভালো ছিলো না। ৬০টা দেখে নেওয়া গেলো। হাতের তাস কি সবসময়ে টেবলে ফেলা যায়? আমার বন্ধু আর্চিবলড হিল কলকাতায় খোঁজ নিচ্ছে।
চা শেষ করে ডানকান উঠলো। তার তো পোশাক পরাই ছিলো। রাস্তায় ঘোড়া ধরে সহিস। এখন প্ল্যান্টেশন দেখতে বেরোবে। দেখা দরকারই তা নয়। আরামদায়ক রোদে ঘোরা, ব্যায়ামও বলতে পারো। তবে নিশ্চয়ই জানিয়ে দেওয়া আমি এখানেই।
কিন্তু আশ্চর্য, সবুজ শাড়ি-পরা স্ত্রীলোকটি কি তাকে লক্ষ্য করছে? কীবল চা শেষ করে উঠলো। ডানকান ঘোড়ায় উঠছে। কীবলের নিজেরও পরনে ব্রিচেস, রাইডিং কোট, হাতে ক্র-হুঁইপ, তার জন্যও ঘোড়া অপেক্ষা করছে।
সে ঘোড়ায় উঠলো। বারান্দা-দেওয়া টুপিটা টেনে দিলো কপালে। সামনে পথের উপরে রায়তদের ছছটো এক জটলা দেখে সেদিকে চললো সে, যেন ভিড়টাকে ভেঙে দিতে। –এখানে কী করছো তোমরা?
তাদের একজন বললো–আমি কৃষ্ণানন্দ। দেওয়ান মনোহর সিং-এর কাছ থেকে ফিরছি। দাদনের সময় যায়, এবার কী বন্দোবস্ত? আমরা কি ধানের দিকে যাবো? বড়োসাহেব মনোহর সিং-এর কাছে শুনতে বলেছিলেন। মনোহর বললো–ছোটোসাহেব ব্যবস্থা করছে।
কীবল ঘোড়ার লাগামে ঢিল দিয়ে ঘোড়র পেটে গোড়ালি দিয়ে আঘাত করে বললো, বড়োসাহেব কিছু না বললে কিছু হবে না।
ঘোড়াটা ক্যান্টারে চলেছে। আচ্ছা, সে ভাবলো, এদিকে প্ল্যান্টেশনের এদিকের সীমায় এসে পড়া গেলো। ঘোড়াটার মুখ ফিরিয়ে বাঁয়ে চক্কর দেবে নাকি? কিন্তু তার মনে পড়লো, বেডশীট দুটোকেই বদলে নিতে হবে। রাগটাকেও। এই ভেবে তার মন থমকে দাঁড়ালো, যদিও ঘোড়া তার হাত ও পায়ের ইঙ্গিতে গ্যালপে চলেছে। তার থমকে-থাকা মন ঘোড়ার খুরের ধপধপ শব্দটাকে যেন গবেষণা করছে।
কিন্তু, আশ্চর্য, ঘটলো কী করে? তখন বিকেল শেষ হচ্ছে। সদর থেকে ফিরে সে কি ক্লান্ত, হাতে পায়ে ব্যথা যেন। বারান্দাতেই ফুলী চায়ের সরঞ্জাম গোছাচ্ছে। দাঁতে বোঁটা চেপে ধরা একটা গোলাপ ঝুলছে চিবুকে। সে নিজে বোধ হয় জিজ্ঞাসা করেছিলো, হোয়াইট কোথায়। ফুলী হেসে তার ইয়ার-ডুপ দুলিয়ে ইঙ্গিত করেছিলো। আটচালা বড়ো হলেও অনেক পার্টিশন কাঠের। গোসলখানা থেকে জলের শব্দ ও ডানকানের মোটা গলার গান আসছিলো। কীবল ফুলীর ডান কনুইয়ের উপরে চেপে ধরেছিলো। ফুলী কিন্তু তার দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে হেসেছিলো।
কিন্তু আধঘণ্টা বাদে নিজের শোবার ঘরে গিয়ে সে নতুন আয়াকে দেখতে পেয়েছিলো, ম্যাকফার্লান আসবে বলে তিন-চার দিন আগে যে নিযুক্ত হয়েছিলো। নীলে সাদা ডুরে খাটো শাড়ি, দাঁতগুলো ছোটো ছোটো, ঝকঝকে সাদা, চোখ দুটো কিন্তু আশ্চর্য রকমের বড়ো। যেন বিছানা ঝাড়ছে। আধঘণ্টা বাদে আবার সেই লণ্ঠন দিয়ে গিয়েছিলো। পোশাক ছেড়ে ডানকানের সঙ্গে কথা বলতে যাওয়ার সময়ে তার অনুমান হয়েছিলো, জানলার বাইরে ওপাশের বারান্দায় সে দাঁড়িয়ে আছে।
কীবল বুঝতে পারছে, সে আবাদের অনেক বাইরে এখন। অনেক রোদ যা তাকে স্নান করাচ্ছে যেন। …যখন সে ডিনারে যাচ্ছে সেই আয়া বলেছিলো, সে বাড়ি যাবে কিনা? আর কাজ আছে কিনা? কীবল কোনো উত্তরই দেয়নি।
কীবল বুঝতে পারলো না কখন সে লাগাম টেনেছে। ঘোড়াটা দাঁড়িয়ে পড়েছে, তার দুই উরুর মধ্যে হাঁপাচ্ছে, কাঁপছে।
ডিনার শেষে ডানকান শিস দিতে দিতে উঠে গেলে সে-ও শিস দিতে দিতে তার শোবার ঘরে ফিরেছিলো। আর তখন দেখেছিলো, শোবার ঘরের অ্যান্টি-চেম্বারের মেঝেতে একটা মমামের আলোর পাশে আয়া বসে আছে। তখন রাত নটা তো বটেই। বাংলো নিঃশব্দ।
এই, খেয়েছো তুমি? দরজা বন্ধ করে দাও। আশ্চর্য যে কত সহজে ঘটে! ঘোড়াটাও, দ্যাখো, আবার গ্যালপ করছে। আর শেষ রাতে সে বলেছিলো, তার নাম মেহের, সে জুড়ান পাইকের তৃতীয় স্ত্রী। ওটাও একটা নিশ্চিন্ত।
সে অবশ্যই জুড়ানকে ভয় করে না। জুড়ান বল্লম সড়কিতে ওস্তাদ। কিন্তু পিস্তলের কাছে? জুড়ান যদি খুলিফাটা হয়ে আবাদে কোথাও পড়ে থাকে, তার এত শত্রু যে তাদের কে দায়ী খুঁজে পাওয়া যাবে না। আর ওটা কি একরকমের নিশ্চিন্তই যে জুড়ানের স্ত্রী শেষরাতে তাকে জানিয়েছে, তার উদরে তিনমাসের বাচ্চা আছে।
কীবল নিজের চারিদিকে চেয়ে বুঝতে পারলো, সে মরেলগঞ্জের সীমার বাইরে তো বটেই, রাজাগ্রামের গঞ্জের কাছে এসে পড়েছে। কী আশ্চর্য, এত কালো, সাধারণ,দাঁতগুলো সুন্দর, শরীর নিটোল, আর এত বোকা যে কিছু গোপন করতে জানে না। তাই বলে একজন কি পরের দিন সকালে উঠেই পালাতে পারে? আর যাই হোক, সে বৃটিশ আর্মির একজন অফিসার ছিলো। কীবল ঢোক গিললো। খুব জোরে জোরে সে ছুটেছে নাকি? ফেঁপাচ্ছে যেন কিছু তার ভিতরে। কিন্তু বেডশীট হয়তো ফুলীই এতক্ষণে বদলে ফেলেছে। রাগটাকে সে নিজেই বদলে নেবে। কী আশ্চর্য, সে, লেফটেন্যান্ট আর্থার হোগাৰ্থ কীবল, কী করে পবিত্রতা হারিয়ে ফেলো?
কীবল তাড়াতাড়ি তার ঘোড়াটাকে একটা ঝোপের আড়ালে নিয়ে গেলো। সে দেখতে পেলো একটা ঘোড়া আসছে। তার উপরে এক সওয়ার। অবশ্যই সে ডাকঘরে যাচ্ছে না, সে কি এরপরে ম্যাগিকে, অন্তত আজই, চিঠি লিখতে পারে? সামনে বাঁদিকে বরং সেই ক্যাথরীন বাগচীর বাড়ি।
এখন, ক্যাথরীন বাগচীর কুঠির দিকে কেন এসে পড়েছিলো কীবল তা কখনো জানা যাবে না। যদি এ রকম বলা হয়, সে প্রমাণ করতে চাইছিলো মেহের নামে অদ্ভুত সুন্দর, জন্তুপ্রায়, স্ত্রীজন্তুই একজন তাকে চেনার অতীত বদলে দিতে পারে না; আর ক্যাথরীন নামা ইংরেজ মহিলা যদি তাকে আগের মতোই সহাস্যে রিসিভ করে তাহলে বোঝা যাবে সে ময়লা নয়, তাহলে কিন্তু মনের এমন কথা বলা হয় যার প্রমাণ নেই। এর এই এক সমর্থন, সে লাঞ্চের আগে আগে ফিরেছিলো মরেলগঞ্জে, তখন তার কপালে কুঞ্চন ছিলোনা। উল্টো যুক্তি দেওয়া যেতে পারে। সে লাঞ্চের আগে আগে মরেলগঞ্জে ফিরে গিয়েছিলো, তার ঘোড়াতেই, আর ঘোড়াও ক্যান্টার করছিলো। তখন সে ভাবছিলো–এটা কি খুব ভাবার কিছু? দশ টাকার একট নোট দিলে মিটে যাবে না? দশ টাকা, ত্রিশ টাকা, পঞ্চাশ টাকা? বেশ, আজ রাতে জিজ্ঞাসা করে নেওয়া যাবে। প্রকৃতপক্ষে এটা এমন ঘটে যাচ্ছে এখানে, জুড়ান পাইক বা ফুলী নতুবা তেমন চোখ পায় কোথায় কালো চামড়ায়? জুড়ান সম্বন্ধে অনেকেই বলে সে মরেলসাহেবের। কিন্তু কাল মেহের বলেছিলো ফুলী জুড়ানের মায়ের বটে, কিন্তু মরেলের নয়। তাহলে? কীবল অবাক হলো আবার–ডানকানেরই! কিন্তু তার মন আবার থমকে দাঁড়ালো–আজ রাতে জিজ্ঞাসা করবে মানে?
