ডানকান কি বিচলিত? তার কাবার্ডে কি অনেক কঙ্কাল? ইন্ডিগো কমিশন নিয়েই চিন্তা। আলোচনায় আর্চি হিলের নাম উঠেছিলো। ম্যাক আর্চির নাম জানেনা। ডানকান বলেছিলো, আর্চি একজন প্ল্যান্টার যার কথার মূল্য আছে। আলোচনায় লর্ড পামারস্টোন এবং গ্ল্যাডস্টোনের কথা উঠেছিলো। গ্ল্যাডস্টোন, যেনাকি চ্যান্সেলার অব দি এক্সচেকার। ডানকান বলেছিল, হুইরা ব্যবসা বাণিজ্যকে শেষনা করে ছাড়বেনা। ম্যাক কীবলের সমবয়সীহবে। সে কিন্তু খুব সহজভাবে একটা পরিবর্তনের কথা বলেছিলো। সে আর কম্পানির কর্মচারী নয়, সেক্রেটারি অব স্টেটের কর্মচারী।
আজ কথা কম হচ্ছে, ডানকান ভাবছে। হয়তো কমিশন নয়, স্ত্রী-পুত্রের কথাই ভাবছে। তারা সেই ৫৭-তে হোমে গিয়েছে, এদেশে আসতে চাইছে না। যদিও ১৮৫৭-৫৮র ব্যাপারগুলো তারা প্রত্যক্ষভাবে জানে না। ফলে এখন এই ১৮৬০-এর শেষেও এই মরেলগঞ্জ স্ত্রীলোকহীন। এই পর্যন্ত ভেবেই কীবল তাড়াতাড়ি মুখ তুললল, বললো–হোয়াইট, তুমি কি মনে করো কম্পানি রুল আর সেক্রেটারি অব স্টেটের শাসনে সত্যই তফাত হয়? কাল্পনিক নয়?
ডানকান বললো, তুমি কি হোয়াইট মিউটিনির খবর রাখো?
কীবল হেসে বললো–তা আবার কবে করলে, কিংবা করতে চলেছো?
ডানকান রসিকতার দিকে না গিয়ে বললো, দুই শাসন এক হলে কম্পানির দশ হাজার ইংরেজ সৈনিক ও অফিসার পদত্যাগ করতে চায় কেন? তারা কম বোঝে? আর সবচাইতে বড়ো প্রমাণ এই কমিশন! জাস্ট থিংক অব ইট! আমি আমার রায়তদের সঙ্গে কী করেছি, তার বিচার? ম্যাঞ্চেস্টারে কাপড় হবে, কিন্তু তার রং? এদিকে দ্যাখো, ম্যাক ছোকরা বলছিলো, সে চায় না কমিশন তার জেলায় কিছু কেলেঙ্কারি খুঁজে পায়। যেন আমরা তার। অধীন আর আমাদের কাজের জন্য তার দায়িত্ব আছে। এর চাইতে বড়ো, ঔদ্ধত্য স্বপ্নে দ্যাখো? উত্তেজিত ডানকান ঢেকুর তুলো।
ব্রেকফাস্টে হাল্কা বিষয়ই ভালো, তাছাড়া সে কি ক্লান্তনয়? না, সকালে কেন ক্লান্ত হবে? এই ভেবে কীবল বললো, তুমি কি সত্যই যাচ্ছে হোমে?
–নিশ্চয়, ইস্টারে অবশ্যই। তার আগে তোমার পিক আপ করা চাই। তবে কিডিসদের আনবো কিনা ভাবতে হবে।
-কেন, এখানে কি তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বোধ করেছো? ১৮৫৭ বারবার হয় না।
ডানকানের মুখ একটু লাল হলো, সে বললো–ইন এ সেন্স তা বলতে পারো। ১৮৫৯ এর চাষীদের ঔদ্ধত্য ভাবো। আমার মনে হয়, এর চাইতে গায়েনা ভালো, নীলের চাইতে সুগার ভালো; সেখানে অন্তত কোয়েকাররা নেই।
-এখানে কোয়েকার? কোথায়, কলকাতায়?
নয় তো কমিশন বসায়? জাস্ট থিংক অব ইট!
কীবলের গায়ে রোদ। উষ্ণতায় অনুভব করলো, ঘুমিয়ে নিলে হয় ব্রেকফাস্টের পরে। কিন্তু সে নিজেকে সজাগ করলো। বললো–তুমি কিন্তু কোয়েকারদের প্রশংসাই করতে, যদি আমার ঠিক মনে থেকে থাকে।
ডানকান বললো–সে তাদের ধর্মের ভণ্ডামির জন্য নয়। লন্ডন স্টক মার্কেটের বিশিষ্ট ফোর্স হিসাবে। বলা হতো, যত ধার্মিক তত রেলওয়ের স্টক।
প্লেট বদলে দিলো আয়া। কীবল বললো–ধর্মের কথায় বলি, রলের চার্চ মিশনের জন্য একশো একরের টিলাটা আমি আবার দেখেছি। ওটাই ভালো হবে। সদরে কিছু খবরও জেনে এসেছি। ওটা ফরাসডাঙার পিয়েত্রোর ছিলো।
ডানকান গুমরে ওঠার ভঙ্গিতে বললো, তার জন্য সদরে যাওয়া দরকার ছিলো না। ওটা ইদিলপুর পরগনা। মনোহর সব খবর রাখে। পরগনাটা সেই খেকশিয়াল পিয়েত্রোর ছিলো। কিছু খাস ছিলো যার গোটাটাই সে তার তাতিদের, রায়তদের, বরকন্দাজদের মোকরারি দিয়ে গিয়েছে। বাকিটা জোতদারদের। পাঁচ-ছজন তারা। তাদের নাম মনোহর দিতে পারে।
কীবল ডানকানের চাইতে একদিকে অন্তত এগিয়ে তা বোঝানোর সুযোগ নিলো, বললো, কিন্তু পিয়েত্রো জীবিত নয়। রেভেনু কে দিচ্ছে পরগনার? ম্যাকফার্লান নিজেও শুনে অবাক। বললো–জানতাম না তো, খোঁজ নিচ্ছি।
চা নিয়ে এলো ডানকানের আয়া। মাঝখানে চেরা একমাথা খয়েরি চুলের নিচে বড়ো বড়ো চোখ, তার নিচে বাদামী ফুলোফুলো গাল যাতে অনেক ব্রণ, চোখের মণিকে নীলচে গ্রে রং বলতে হবে, ছাপা ছিটের গাউনে ঢাকা পিছন দিকটা ঘোটকীকে পরাস্ত করে। কীবল মুখনা তুলে চোরাচোখে চাইলো। ফুলীততক্ষণে কিচেনের দরজার কাছে। বাইশ হতে পারে বয়স। হয়তো ডানকানের আগে যে ছিলো তার, কিংবা কলকাতা থেকে আনা। কিন্তু কয়েকদিন আগে ভোররাতে স্নাইপ শুটিং-এর জন্য বন্দুক আনতে গিয়ে তাকে ডানকানের শোবার ঘরের দরজা খুলে বেরোতে দেখা গিয়েছিলো। আর সে কিন্তু এতটুকু বিব্রত ছিলো না। বরং কিচেনে ডেকে ছোটোসাহেবকে গরম এক কাপ চা করে দিয়েছিলো।
কিচেনের দরজার পাশে কীবল জুড়ান পাইকের সেই তৃতীয় স্ত্রীকে দেখতে পেলোলা। জুড়ান, তার মনে পড়লো, সে এখানে আসার এক সপ্তাহের মধ্যে বল্লমের খোঁচায় এক রায়তকে খোঁড়া করে দিয়েছিলো। একটা ঝোপের মাত্র ব্যবধান ছিলো তার আর সেই ঘটনার মধ্যে। সেই রায়তের পা থেকে দরদর করে রক্ত পড়ছে। সে ডানকানকে জিজ্ঞাসা করেছিলো, বাধ্য হয়েই যেন, এটা কী? এরকম কেন হবে? জুড়ান পাইকের তৃতীয় স্ত্রীর পরনে সবজে চেকশাড়ি, দাসীরা যেমন পরে।
কীবল বললো–যাটের রেভেনু তো কেউ না কেউ দিয়েছে। অথচ পিয়েত্রো তখন মৃত। ম্যাক অবাক হয়ে বললো–তাই তো, নীলামে ওঠেনি পরগনা! তুমি বোধ হয় এসর আগে ভাবোনি, হোয়াইট?
