দুজনে পাশাপাশি দেওয়ানকুঠির দিকে চলতে লাগলো। এই সময়ে পিছন থেকে ফেলিসিটার বললো–আমার কথাটা একবার ভাববেন, সার!
হরদয়াল চলতে চলতে খানিকটা মুখ ফিরিয়ে বললো–তোমার সেই রোডরোলার তো? তা কিন্তু নৌকোয় আনতে মরেলগঞ্জের সেই এক গ্লোসে ঠোকাঠুকি হয়ে যেতে পারে। সেবাগচীকে বললো, এবার ডানকানের দারুণ ক্রিস্টমাস। অনেক গেস্ট। ইয়াকোভের মতে তা নাকি কমিশন। কিন্তু কমিশনারদের কারো কারো মেমসাহেবও আসছেন, অবশ্য যাদের তা আছে।
তারা তখন দেওয়ানকুঠির সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। পায়ের শব্দে হরদয়াল মুখ ফিরিয়ে বললো–ও, তুমি যাওনি? আরো কিছু আছে নাকি সওদা?
-তাহলে রোডরোলারটা মঞ্জুর তো সার? ও ছাড়া কি পাকা রাস্তা হয়, সার?
-আমি তো বলেছি, নরেশ কলকাতা যাচ্ছে, সে দেখবে। পছন্দ করে নেওয়া হবে। আচ্ছা, রসো। তুমি যখন থেকেই গেলে, তোমাকে সেই আহিরীটোলার বাড়িটা সম্বন্ধে বলে দিই।
তখন বাগচীকে একদিকে ফেলিসিটারকে অন্যদিকে নিয়ে হরদয়াল তার ড্রয়িংরুমে বসলো। বাগচীর কাছে অনুমতি চেয়ে নিয়ে ফেলিসিটারকে একটা বাড়ির নক্সা দেখালো। বললো–নরেশকে সব বলে দেওয়া আছে। সেই সব কাজ দেখে করাবে। তোমাকে প্রয়োজন মত মিস্ত্রি, কুলি সরঞ্জাম জোগান দিতে হবে। নক্সাটা দ্যাখো। নিচের এই হলটাতে ক্রিস্টমাস গাছ হবে। সেটাই সেদিন বসবার ঘর। তার পশ্চিমের এই বড়োঘরটাতে হবে ডাইনিংরুম। এই হল আর ডাইনিং রুমের উত্তরদক্ষিণের ঘরগুলোর সব কটিতেই শোবার ঘর করে সাজাবে। গালচে, খাট, বসার কিছু আসন, আয়না, টেবিল, সাইডবোর্ড। ফার্নিচার যেন খেলো রং-চটা না হয়, ভাড়া নেওয়ার সময় দেখবে। ওসব ঘরে ধরো আমি, বাগচীসাহেব, এমন আরো কেউ কেউ থাকবো। দোতলার ঘরগুলোর জন্য তোমার ভাবনা নেই। সাফসুতরো করাবে ভালো করে। মেঝের পুরনো শ্বেতপাথরে কিছু করাতে পারবে না। কিন্তু দেয়ালে ছাদে দাগ না থাকে। ফার্নিচার সবই এখান থেকে যাবে। ওখানে রানীমা, রাজকুমার, আর তাদের পরিবারের যাঁরা যাবেন থাকবেন। তুমি দেখবে, নরেশ পৌঁছে কোনো অসুবিধায় না পড়ে।
ফেলিসিটার অবশ্যই উকর্ণ হয়ে শুনছিলো। বললো–আপনারা কবে তক গিয়ে পৌঁছবেন?
হরদয়াল বললো–সেটা ভেবো না। নরেশ পরশু সকালে নৌকোয় রওনা হচ্ছে। তুমি তার সঙ্গে যেতে পারবে? নাকি মরেলগঞ্জের কাজ শেষ হয়নি? তাহলে তুমিও পরশু নৌকো ছাড়ো। পনেরোই ডিসেম্বরে বাসা সবদিক দিয়ে তৈরী হওয়া চাই।
য্যাকব ফেলিসিটার এতদিনে অবশ্য বুঝতে পারে দেওয়ানজির কথার সুর কখন কার দরবার শেষ করছে। সে ইয়েস, সার, মোস্ট ডেফিনিটলি সার্টেন, সার বলে উঠে গেলো।
তখন হরদয়াল হেসে বললো–এবার ক্রিস্টমাসে রানীমা কলকাতা যাচ্ছেন। রাজকুমার তোবটেই। তাহলে আপনিও চলুন। বাসাটার কথা তো শুনলেন। আর সবদিক দিয়ে ভালো, সামনের লনটা ছোটো। ও, আচ্ছা, সেই কথাটা। এখনো কিন্তু আপনার মত জানতে পারিনি।
বাগচী বললো–আমি ডিসেম্বরটা ভেবে দেখি। শেষদিকে জানাবো।
-তা মন্দ হবেনা, যদি পয়লা জানুয়ারী থেকেই টেক আপ করেন। হরদয়াল হাসিমুখে বললো, অতঃপর? লাঞ্চের সময় এসে যাচ্ছে, একটু অ্যাপিটাইজার
বাগচী হেসে বললো–না, না। সন্ধ্যায় যদি আসি, তখন অবশ্যই।
বাগচী ডিকেনসের নভেল তিনখানা নিয়ে চলে এসেছিলো। পথে একবার তার মনে হয়েছিলো, ভাগ্যে এখানে দেওয়ানজি আর তার লাইব্রেরি আছে।
সেদিন সন্ধ্যায় কফির কাপ নিয়ে বাগচী তার স্টাডিতে ঢুকলে কেটও তাকে অনুসরণ করলো। কফি শেষ হয়েছিলো। দু-চারটি সংসারের কথার পর কেট ডিকেন্স পেয়ে তা নিয়ে বসেছিলো। বাগচী তো কিছুদিন থেকেই যেন ভারতীয় জার্নালিজমের ভক্ত হয়ে পড়েছে। আজও সে হিন্দু পেট্রিয়টের ফাঁইল নিয়ে বসেছে। ঘণ্টাদেড়েক পার হয়েছে এর মধ্যে একটাই কথা হয়েছে। বাগচী পাইপ সাজিয়ে বলেছিলো–ম্যাচটা?
কেট বাগচীর হাতে ম্যাচবক্স তুলে দিয়েছিলো। কিন্তু একটানা ডিকেন্স পড়তে চোখ অন্তত ক্লান্ত হয়।
কেট বললো–ও, আচ্ছা, আজ তো রাজবাড়িতেও গেলে না?
বাগচী যেন চমকে উঠলো। পকেট থেকে ঘড়ি বার করে বললো–তাই তো! তারপর হেসে বললো–তাতে কী, আজ তো একবার রাজবাড়িতে গিয়েছিলাম। বই আনলাম না? তাছাড়া গ্রামের লোকের সঙ্গেও মিশেছি। তোমাকে শিরোমণির টোলের গল্প বলবো?
বাগচী শিরোমণির টোলের গল্প করলো রাতের খাওয়ার সময় পর্যন্ত। খেতে খেতে বাগচী বললো–একটু পিয়ানো বাজাও না আজ। ভেবে দেখো, ওটা রাজকুমার রেখেছিলেন এখানে বেশির ভাগ তুমি একা, কখনো কখনো তিনি, বাজাবেন বলে। সে রাতে খানিকটা পিয়ানো বাজানো হয়েছিলো।
কিন্তু কখনো কখনো একটা অনুভূতি হয় যার যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। কেটের অনুভূতি হলো তারা যেন আবার তাদের সেই মধ্যপ্রদেশের বাংলোর আবহাওয়া তৈরী করে নিচ্ছে। যেন মাঝখানে নিজেদের ছড়িয়ে দিয়েছিলো, আবার গুটিয়ে নিজেদের নিঃসঙ্গ করে নিচ্ছে কী আশ্চর্য, বাগচী এই দু সপ্তাহ তো, কি সকালে কি বিকালে, একবারও তাদের সেই ডিসপেনসারিতে যায়নি।
.
০২.
এরকম একটা সংবাদই আছে মরেলগঞ্জের জীবন সম্বন্ধে। নীলকুঠির বাংলোর পুবমুখী বারান্দায় সেদিন ব্রেকফাস্টে বসেছিলো কীবল ও ডানকান। শীতের রোদ টেবিলে, বারান্দা বটে কাঠের ফ্রেমে তারের জালে ঘেরা। বাংলোর দেয়াল পাকা, খড়ের ছাদ। আটচালা। নিচে সুরকির সড়কে ইতিমধ্যে পাশাপাশি দুটি ঘোড়া। টেবলে ইংলিশ ক্ৰকারি, ড্রেসডেনের বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। ভাসে গোলাপ। খাদ্যগুলি ইংরেজি হতে পারে না। ডিম, মুরগি, চাপাটিসকালে, লাঞ্চে, ডিনারে। বেকন,হ্যাম, পর্ক আশা করা যায় না, ভালো ব্রেডও নয়। পরশুদিন বীফ হয়েছিলো, কারণ কালেক্টর ম্যাকফার্লান এসেছিলো। তার সঙ্গে কীবল সদর পর্যন্ত গিয়েছিলো, ফিরতে বিকেল।
