কিন্তু আসল কৌতুকটা অন্য দিকে। এক ঘোর কুসংস্কার যেন তাদের। তারা বহুবিবাহ প্রথা লোপ অথবা বিধবা-বিবাহ প্রথার প্রচলনকে নিতান্ত মূল্যহীন মনে করে, স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে নিজ নিজ জননীর কথা মনে রেখে কৌতুক বোধ করে। বহুবিবাহ সম্বন্ধে তাদের যুক্তি রামলক্ষ্মণাদির একদারনিষ্ঠা, ভীমার্জুনের বহুবিবাহ সমাজে কী এমন ক্ষতিবৃদ্ধি করে? বহুবিবাহ কি ভদ্রসমাজে ছিলো? শ্রীচৈতন্যের কাল থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পর্যন্ত যাঁদের নাম আমরা জানি সকলেরই পিতা, দেখা যাচ্ছে, একদারনিষ্ঠ। অন্য দিকে বহুবিবাহ গণিতশাস্ত্র অনুসারে অসম্ভব। যেহেতু স্ত্রী পুরুষের সংখ্যা সবসময়ে সমান থাকে, বহুবিবাহ ব্যাপক চলতে থাকলে বহু অবিবাহিত পুরুষ থেকে যায়, যাদের হিংস্রতায় বহুবিবাহকারীরা নিহত হতো। সতীদাহ প্রথা লোপহওয়াকে তারা ভালোই বলে, কিন্তু জিজ্ঞাসা করে বৎসরে হাজার রমণীর সেই মৃত্যুর চাইতে তেমনি হাজার রমণীর বারাঙ্গনায় পরিণত হওয়াকে হেডমাস্টারমশায় সুখদায়ক মনে করেন কিনা? যারা সতীদাহ প্রথা লোপে অগ্রণী তাদের সমাজে বারাঙ্গনা-প্রীতি যথেষ্ট। তাদের বক্তব্য বিধবাবিবাহ প্রথা হিসাবে অচল হবে, কেননা যে দেশে কুমারীর বিবাহই সমস্যা সে দেশে বিধবার সুযোগ কোথায়? গোপাল একটু বয়স্ক, সে বলেছিলো এই কথাতেই আমরা পুরুষের সমস্যায় আসি। সে বাঁকা করে বলেছিলো, কলকাতার তারা পুরুষের সমস্যার কথা তোলেন না, কারণ তাহলে তাদের পৃষ্ঠপোষক ইংরেজ শাসকের সঙ্গে বিবাদে অবতীর্ণ হতে হবে। পুরুষের সমস্যা অবশ্যই অর্থ উপার্জনের, সমস্যা বলহীনতার যা নারীকে আদর করে, রক্ষা করে।
তখন টপ-হ্যাট মাথায় ঠিক করে বসিয়ে বাগচী একজন বলশালী পুরুষের মতো দীর্ঘ পদক্ষেপে চলেছে। তার হাতের ছড়ি অনেক সময় শূন্যে চক্র খাচ্ছে, ফরাসী গোটিযুক্ত মুখে হাসি-হাসি ভাব। চতুষ্পঠীতে যা সে শুনে এলো তা সব পিছিয়ে যাওয়ার ব্যাপার, যে পথে সে এবং তার স্কুল শিরোমণির পথটা যেন তার বিপরীত দিকে। কিংবা বলবে সেই টোলটি এক পুরনো মতবাদের গভীর কিন্তু স্রোতহীন দহ? ওটা কিন্তু দারুণ প্রশ্ন-বৈধব্য জীবনযাপন, সতী হিসাবে দগ্ধ হওয়া কিংবা কলকাতার বারাঙ্গনার সংখ্যা বৃদ্ধি করা কোনটি বেশি যন্ত্রণার? ও দিকে দ্যাখো ভীমার্জুন এমনকী দ্রৌপদীর বহুপত্নীত্ব বা বহুপতিত্ব কোন নীতির? তাদের সেই সমাজে কি তাদের কেউ ধিক্কার দিয়েছে? যদিও সেই সমাজে একপতিত্ব নীতির পরাকাষ্ঠা গান্ধারী বর্তমান। এর কারণ কি এই যে ভীমার্জুন বলশালী, দ্রৌপদী ওজস্বিনী। যেন বিবাহের ব্যাপারটাই গৌণ, আলোচনার গুরুত্ব পায় না।
বাগচী ভাবলো, তা নির্বলই এ সমাজ। পুরুষের সমস্যাই তো প্রবল। কলকাতায় যারা ভাগ্যান্বেষণে, তাদের কজনই বা সার্থক? এটা কি সত্য পুরুষের সমস্যা নিয়ে কথা উঠলেই শাসকের সঙ্গে বিবাদ অবশ্যম্ভাবী? এদিকেও দ্যাখো, রাজবাড়ির বাইরে এদেশে দাদনের সমস্যাটাকেই কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। কৃষক তাঁতি সবাই সমান সমস্যাজর্জর। তার মনে একবার ধনঞ্জয়ের একবার চরণের ক্লিষ্ট মুখ ফুটে উঠলো। ধর্ম কি মানুষের অতীত হীনমন্যতা, নীতিহীনতা থেকে মুক্ত করে বলশালী করতে পারে? তার মনে পড়ে গেলো কে এক ব্ৰহ্মবাদী সন্ন্যাসী রানীমার কাছে মূল্য পেয়েছে। কিছুক্ষণ সংবাদটাকে সে মনে মনে। ওজন করলো। সংবাদটানতুন। ওদিকে দ্যাখো, বোধহয় ব্রজগোঁসাই-ইব্ৰহ্ম সম্বন্ধে জানতে শিরোমণির কাছে পড়ছে। তাহলে কিন্তু নতুন ধর্ম-আন্দোলন যা কলকাতায় ইংল্যান্ডের ইভানজেলিস্টদের মতো সরব, তার নতুনত্ব থাকছে না। সেদিন এই শিরোমণি এক নতুন মত বলেছিলো, জন্মটা পাপ থেকে নয়, মৃত্যুও দুঃখের নয়–সবই বড়োজোর সময়ের ব্যাপার।
বাগচী একটু ধীরে চলতে শুরু করে নিজেকে ঠাট্টা করলো, ওদের চিন্তাকে সমর্থন করছো নাকি? না, না, সত্যই তো, বলেরই তো প্রয়োজন-যে বল কৃষক ও কারিগরকে এক নীরোগ সমাজে স্থাপন করে! সে অবাক হয়ে ভাবলো, আশ্চর্য, এমন কী হতে পারে, এইসব-কোন দহে এক আশ্চর্য ফোয়ারা আছে যা অকস্মাৎ দহকে এক বেগবতী নদীতে পরিণত করতে পারে? এমন কী হতে পারে, এমন কোন এক তোতাপুরী দেখা দেবে, যে বলশালী হয়ে ব্রহ্মবিদ্যা আয়ত্ত করবে এবং সমাজকে বলশালী করতে তাঁতিদের, চাষীদের নানা সমস্যা নিয়ে চিন্তা করবে, ধার্মিক হয়েও বলেরই প্রশংসা করবে?
সে অন্যমনস্কের মতো চলে রাজবাড়ির কাছে এসে পড়েছিলো। তখন তো বেশ বেলাই হয়েছে। কিন্তু সে চোখ তুলতেই দেখতে পেলো, সদরদরজার খিলানের নিচে দেওয়ানজি, তার সঙ্গে ফেলিসিটার। দেওয়ান ফেলিসিটারকে কিছু বুঝিয়ে দিলো। হরদয়ালও বাগচীকে দেখতে পেয়ে ফেলিসিটারকে পিছনে রেখে এগিয়ে এলো। অভ্যর্থনা জানালো। বললো–আপনার কথাই ভাবছিলাম। ডিকেনসের খানতিনেক নভেল সোফার উপরে একত্র দেখে মনে হলো পরে, হয়তো আপনি পড়ার জন্যে নামিয়েছিলেন। আজই আপনার কুঠিতে পাঠাচ্ছিলাম। চলুন, বসি গে।
বাগচী হেসে বললো–সেদিন ডারউইন পড়তে পড়তে উত্তেজিত হয়ে ওই কাজ। গৃহিণীর জন্য নামিয়েছিলাম ডিকেন্স। এখন সেগুলো নিয়ে যাই। সন্ধ্যায় যদি আসি,বসবো।
হরদয়াল বললো–ডারউইনে এত উত্তেজনা কেন? অ্যাডাম থাকছে না বলে? সেও হাসলো।
