এক রবিবারে ব্রেকফাস্টের পরে কেট বললো– রাজকুমার অনেকদিন এদিক দিয়ে যান না। তুমি তো বিকেলে বার হচ্ছোই না।
বাগচী বললো, তাতে আর কী হলো?
সে নিজের চারিদিকে চাইলো। জীবন সংযুক্ত হলে স্মৃতিও সংযুক্ত হতে পারে। হঠাৎ কেটের তখন মনে হলো বাগচীর এই ভঙ্গিটা তার পরিচিত। এখানে আসার আগে, এমনকী এখানে আসার পরও প্রথম দিকে যেমন নিজেদের বসবার ঘরের বাইরের পৃথিবী সম্বন্ধে নিস্পৃহ ছিলো–এটা যেন তেমনই। তখনো এরকম বই পড়া ছিলো। বাগচী বললো– বটে, তাতে কী হলো, কিন্তু তখনই বললো, তুমি ভাবছো আমি ঘরকুনো হচ্ছি? আদৌ না, আমি এখনই বেরোতে পারি। বলতে কী যোগাযোগ দেখা দিয়েছে। কাল স্কুলে শুনলাম, আমাদের শিরোমণিমশায় পড়ে হাত ভেঙেছেন। না, ওষুধ দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। ভদ্রতা রক্ষা। তাছাড়া দেওয়ানজির সঙ্গে দেখা করা দরকার। ওই যে সেই চাকরিটার কথা, তার কিন্তু উত্তর দেওয়া হয়নি। শিরোমণির বাড়ি থেকে দেওয়ানজির কাছে যাবো। ডিকেনসের বই যে কখানা আছে তোমার জন্য নিয়ে আসবো ভাবছি।
সেদিন বাগচীরবিবার উপভোগ করতেই বেরিয়ে পড়েছিলো। সেরকম মেজাজ অনেক বিচিত্র সংবাদ সংগ্রহ করতে পারে। শিরোমণির টোলের খবর, সেখানকার সংস্কার কুসংস্কার এই সংবাদের মধ্যে ছিলো। কেটকে যা সে বলেছিলো তাতে বোঝা যায় সেখানে শিরোমণির চিকিৎসার জন্য এক দরবেশ উপস্থিত ছিলো। সেই দরবেশ দাবী করেছিলো সে বা তার গুরুপরম্পরায় কোনো বৃদ্ধ-গুরু কাছাকাছি থাকলে আলিবর্দি খাঁ সেভাবে মরতো না। হোক তরোয়ালের চোপ, সে সারতেই। তবে কিন্তু আছে, গুরুরা খবর পায়নি এজন্য যে আলিবর্দির পাপের শরীল, মনিবের সঙ্গে বেইমানি, বন্ধুত্বের নাম করে কোন পণ্ডিতকে নাকি খুন করেছিলো। সেই দরবেশের জীবনটা যেমন রহস্যের, সে জীবনটাকেও তেমন রহস্যময় মনে করে। ঠাকুরদা ছিলো ওস্তাদ ঢুলি, শেষ বয়সে এক মুসলমানী বাঈজীর জন্য সমাজের বাইরে গিয়েছিলো; বাপ ছিলো লেঠেল ডাকাত, এক বোষ্ট্রমীকে নিয়ে তিলক সেবা-টেবা করতো। দরবেশ তার গুরুদত্ত গুণ নিয়ে ভালোই আছে, পদস্খলিতা এক ভৈরবী জটা ও ত্রিশূল সত্ত্বেও ওর গৃহ রক্ষা করে। দরবেশের এই এক গুণ, ভাঙা গায়ে হাত দিয়ে ব্যথা অর্ধেক কমায়।
শিরোমণির টোলে ছাত্রসংখ্যা তখন কমতে কমতে পাঁচ। কুড়িজন ছাত্রের জন্য সেই কবে থেকে দেওয়া ত্রিশ বিঘা দু-ফসলী নিষ্কর ব্রহ্মোত্তর। ছাত্ররাও বিচিত্র। তিনজন উপস্থিত ছিলো, তাদের একজন ন্যায়, একজন স্মৃতি, তৃতীয়জন বেদান্ত পড়ছে। শিরোমণিই পরিচয় করে দিয়েছিলো। সে বলেছিলো, এটির নাম গোপাল। পিতার অর্থশালী যজমান আছে। আশৈশব পিতামহ পিতাকে দেখে পূজা বিবাহাদি ব্যাপারে মন্ত্রে দক্ষ। নিজগ্রামে কবিভূষণ উপাধি পেয়েছিলো। এখানে স্মৃতি পড়েছে। তন্ত্রে কিছু অধিকার আছে। কিন্তু জননীর ইচ্ছায় এবং দৃঢ়তায় এখানে ফিরে নতুন করে ন্যায় পড়ছে। ওই ফুটফুটে ছাত্রটিকে দেখুন, ব্রজ গোঁসাই, অদ্বৈত বংশের। পিতা অনেক ধনী জোতদার মহাজনের কুলগুরু। কথকতায় ইতিমধ্যে জুড়ি পাওয়া ভার। ইতিমধ্যে ন্যায় ও স্মৃতির উপাধি আছে। এই টোলে ফিরেছে। বেদান্তের জন্যে। কোন এক তোতাপুরী সন্ন্যাসী নাকি ওদের গ্রামে বারমাস্যায় ছিলো। তিনি নাকি বলে গিয়েছেন, কৃষ্ণ কালী ইত্যাদি অলীক কাব্যমাত্র। একমাত্র নিগুণ অব্যক্ত ব্ৰহ্মই সত্য, যিনি পূজা ইত্যাদিতে ভ্রুক্ষেপ করেন, ই নেই তার ক্ষেপ। ব্রজ বোধ হয় ব্রহ্মের এরকম ব্যাখ্যায় বিড়ম্বনা বোধ করলো। সে কিছুটা মুখ লাল করে বললো, গুরুমশায়, তোতাপুরী কিন্তু আমার মাকে শুধু নয়, সন্দেহ হয় এখানকার রানীমাকেও মন্ত্রণা দিয়ে থাকবেন। তাছাড়া আপনার কৃত বেদান্তসার-পাণ্ডুলিপিতে–সে থতমত হয়ে মাঝপথে থেমে গেলো। কপিল নামে তৃতীয় ছাত্রটি বয়ঃকনিষ্ঠ। শিরোমণি বলেছিলো, বারান্দার নিচে খড়ি ফাড়ছে, ওর নাম কপিল। একরকমের স্মৃতিধর। গত বৎসর পড়া বন্ধ করে আমার পুত্রের সঙ্গে কলকাতা গিয়েছিলো। ছ মাস ছিলো চাকরির খোঁজে। তারপর সেখান থেকে পদব্রজে পালিয়েছে। আহা, ও আমার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ভালোবাসে, একটু খেতে ভালোবাসে। কলকাতায় নাকি নেটিভপাড়া আছে। সেখানে নাকি হাতি গেলা কালো গঙ্গা বয়। একটু রয়ে সয়ে থাকলে দু-তিন বছরে এন্টান্সে পাস করে উকিল মোক্তার হতে পারতো। বাগচী এই জায়গায় জিজ্ঞাসা করেছিলো, আপনার এখানে ইংরেজি পড়া হয় না? সেটা তো অর্থকরীও বটে। কপিল খড়ি গুছিয়ে রাখছিলো। কথাটা তার কানে গেলো। গুরুর পক্ষে সে কথা বলেছিলো। বাগচীকে প্রায় চমকে দিয়ে সে বলেছিলো, দি অ্যাজাপশন ইজ রং, স্যার। অলরেডি দেয়ার আর দেয়ার স্কোরস অব আন্ডার এমপ্লয়েড গ্র্যাজুয়েটস্ হু ইক আউট আ মিজারেবল ইগজিস্টেন্স ইন আনক্লিন স্লাম। শিরোমণি বললো–কী বললো– কে জানে! বাগচী কিছুটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলো তুমি তো কলকাতায় ছিলে, সেখানে রামগোপাল ঘোষ, প্যারীচরণ, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে দ্যাখোনি? কপিল দ্বিধা করলো। দু হাতে জড়ো করা খড়িগুলোকে স্থানান্তরে নিতে বুকে জড়িয়ে তুলে, ইতিমধ্যেই সে লজ্জিতও বটে, বললো–একসেপশস্ টেন্ড টু প্রুভ দা রুল–ডোন্ট দে?
