.
এরকমই একটা ছোটো ঘটনায় হেডমাস্টার বাগচীর ক্রোধের বিবরণ পাওয়া যায়। অথচ সে তো আদৌ ক্রোধী ছিলো বলে মনে হয় না। তখন বাগচীর স্কুলে সেই পরীক্ষা নেওয়ার পরীক্ষা চলেছে। স্কুলের সর্বোচ্চ শ্রেণীতে সর্বরঞ্জন ইংরাজির পরীক্ষা নিচ্ছে, অন্যান্য। শিক্ষকেরা নানা শ্রেণী নিয়ে ব্যস্ত। মৌখিক পরীক্ষা সুতরাং শিক্ষকদের পরিশ্রম করতে হচ্ছে। বোঝা যাচ্ছে, তা জন্মোৎসবের পরে এবং সেবারের ক্রিস্টমাসের আগে, কিন্তু ঠিক কখন ধরা যায় না। পরীক্ষার একটা উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে। রোল নাম্বার অনুসারে। ষষ্ঠ বালক ইসমাইল আসতে বাগচী বললো–বসো, ইসমাইল, বলল এবার, তোমার ধর্ম কী?
-মুসলমান।
–তোমার ভগবান কজন?
–একজনা, স্যার।
বাহ! তুমি প্রার্থনা করো? কোন দিকে মুখ করে করো?
–পশ্চিম, স্যার।
–কেন, তা কেন? অন্য দিক নয় কেন?
–পশ্চিমে মক্কা স্যার।
–ও, আচ্ছা, আচ্ছা। ওই ম্যাপটার কাছে যাও। বলো পশ্চিম কোন দিক হয় ম্যাপে?
বাঁ দিক।
বাহ! ম্যাপটা?
–আশিয়ার, স্যার।
সুন্দর! মক্কা কোন দেশে?
–আরব দেশে।
–বেশ, আরব দেশ প্রথমে, পরে মক্কা দেখাও।
ইসমাইল মক্কা খুঁজে বার করতে পারলো না। বাগচী তখন তাকে মক্কার গল্প, মহম্মদের গল্প বলে জিজ্ঞাসা করলো, ক্লাসে কখনো মক্কার ম্যাপ দেখেছিলো কিনা? মক্কা কোথায় জানতে ইচ্ছা হয়েছিলো কিনা?
সে কি কিছু মুখস্ত বলতে পারে? ইসমাইল নমাজের একটুখানি আবৃত্তি করলো। বাগচী বললো–তাহলে মক্কা বার করা উচিত ছিলো। এই সময়ে ইসমাইল ভয়ে ভয়ে বললো– চোখে কম দেখছি, স্যার।
কম দেখছো? বাগচী সোজা হয়ে সললো। ভূগোল, ইতিহাস, স্মৃতিশক্তি, সপ্রতিভতা–এসব নিয়ে পরীক্ষা। সব থমকে গেলো। কেন কম দেখছো?
ইসমাইল দ্বিধা করতে লাগলো। তখন হঠাৎ বাগচীর মনে পড়লো, কিছুদিন আগে তার এক ছাত্রের চোখের অসুখ নিয়ে কথা হয়েছিলো। অন্য ছাত্ররাও ছিলো। তার নাম তো ইসমাইলই বটে। সে কি এই ইসমাইল?
বাগচী চেয়ার থেকে উঠে ইসমাইলকে জানলার ধারে আলোয় নিয়ে তার চিবুক তুলে ধরে চোখ পরীক্ষা করলো। তার তো এখন ঠিকই মনে পড়ছে বটে। বিশ্রী রকমের কনজাংটিভাইটিস ছিলো সেটা। সে ইসমাইলকে জিজ্ঞাসা করলো চরণবাবু ওষুধ দিচ্ছিলো কিনা, সে ওষুধ খেয়েছে কিনা? অবশেষে বললো–চরণবাবুকে ডেকে আনো তো, পরামর্শ আছে।
চরণ এলে বাগচী বললো– কী ব্যাপার চরণ, ইসমাইলের চোখটা-কী ওষুধ দিয়েছো?
চরণ বললো–হামোমেলিস, স্যার, আর্নিকা দেবো কিনা ভাবছি।
বাগচী বললো–ডাক্তার হয়েছে, না? বুদ্ধিতে কুলোয়নি, আমাকে খবর দিলে না কেন?
চরণ একটু দ্বিধা করে বললো–আপনি কনজাংটিভাইটিস বলেছিলেন, আসলে ওটা ঘুষির ফলে। কীবল ঘুষি মেরেছিলো।
বাগচী হুড়মুড় করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো। সে কী করবে খুঁজে পাচ্ছে না! তার চিৎকার করে কিছু বলতে ইচ্ছা করছে! তার দুহাত দু পাশে ঝোলানো, তাদের আঙুলগুলো তেলোকে কুরছে। তার চোখে রাগ আর জল যেন প্রতিযোগিতা করছে! সে তোতলাতে তোতলাতে বললল, কীবল? কেন, কেন বলোনি?
চরণ ভুল করে সত্য বলে ফেলোকীবলসাহেব আপনাদের বন্ধুলোক, স্যার।
বাগচী কী বলবে ভেবে পেলো না। তার সম্মুখে বাড়ানো ডান হাতের তর্জনী ডাইনে বাঁয়ে দুলতে লাগলো। বললো–কেন, কেন বলোনি আমাকে? ছেলেটার চোখ নষ্ট করে দিলে? এত অবিশ্বাস আমাকে? এত ঘৃণা করো আমার ধর্মকে? গেট আউট, গেট আউট!
বাগচী নিজেই তার ঘর থেকে হনহন করে বেরিয়ে গেলো।
বলা হয়, সাহেব হলে কী হবে, রাগটা বামুনে। অর্থাৎ বাগচীর রাগ পড়েছিলো। লাঞ্চ শেষে যথাসময়ে স্কুলে ফিরে পরীক্ষা নিয়েছিলো। তাকে নাকি রোগা দেখাচ্ছিলো, অসুখে ভুগলে যেমন হয়। কিন্তু একটা যেন পরিবর্তন হলো। কেট দেখলো, বাগচী যেন শীত কাতর হয়েছে। শীতের নাম করে স্কুল ফেরত বাড়ির বার হচ্ছে না। কফি নিয়ে স্টাডিতে ঢোকে, লেখাপড়া করে। পরীক্ষা চলছেই।
লাঞ্চে ফেরবার সময়ও হাতে বই পত্রিকা দেখা যায়। একদিন বললো, স্কুল থেকে দেওয়ানজির কাছে গিয়েছিলাম, আগস্টের টাইমসগুলো নিয়ে এলাম। আর-একদিন তার হাতে বড়ো এক বান্ডিল পত্রিকা দেখে কেট জিজ্ঞাসা করলে বললো– কলকাতার পত্রিকা। হিন্দু পেট্রিয়ট। দেওয়ানজির কাছে নিয়মমতো আসে। গত ছ মাসের কাগজ নিয়ে এলাম। সময় কাটবে।
এটাই আশ্চর্য, যার সময়ের অভাব ছিলো, তার সময় কাটানোর কথা উঠলো। এক সন্ধ্যায় কেট তাকে পত্রিকায় মুখ দিয়ে বসে থাকতে দেখে জিজ্ঞাসা করলো কী এমন বিষয়, এতে মনোযোগে? বাগচী হেসে মুখ তুলে বললো, আ, ডারলিং, বসো বসো, তেমন কিছু নয়। ইংরেজিটা গ্রামারে ঠিক, কিন্তু ভাষার যা আসল কথা ইমেজারি নেই, একটু বাসি মনে হয়। আর শুধু রায়তদের কথা, তাদের সুবিধা-অসুবিধা,নীলচাষ, তার দাদন এইসব। তবে প্রশংসা করতে হবে। এই হরিশ মুখুয্যে সরকারী চাকরি করেন, তার উপরে এই পত্রিকার সম্পাদক, লেখক, প্রিন্টার একাধারে একাই সব প্রায়। ভদ্রলোক সময় পান কী করে?
কেট বললো–তবে যে বলেছিলে ভাষাটা বড়ো নয়, ভাষা শিক্ষার চাইতে ভুল বানান। হলেও অন্য সব শিখে নেওয়া ভালো। তোমার কি মনে হয় না ভাষা আর কালচার খুব কাছাকাছি ব্যাপার?
বাগচী হেসে বললো–এই দ্যাখো, ডারলিং, আমি কি ইংরেজি ভাষা আর কালচারকে বাদ দিতে বলেছি? একজনের মুখের ইংরেজি শব্দগুলো কীভাবে ঠোঁট দুটিকে ফুলে পরিণত করে তা না দেখলে জগৎ অন্ধকার।
