ব্যাকুল হয়ে বললো–রাজু, এসব তুমি ভাবছো কেন? রাজু।
নয়ন।
নয়নতারা মুখ নামালো। রাজু হাসলো। বললো–নয়ন, একবার এক বোকাছেলে তোমাকে নিজের আংটি দিয়ে তোমার আংটি নিয়েছিলো। মুখ ভোলো। এই জানলাটার পাশে আসবে, নয়ন?
নয়নতারা বললো–রাজু তোমার জোব্বাটা খোলো। বিছানায় এসো। আমি চুল খুলে দিচ্ছি।
খাটের বাজু ধরে দাঁড়ালো নয়নতারা। তারপর সে বিছানার এক প্রান্তে বসলো। রাজচন্দ্র তার সামনে এসে দাঁড়ালো। কোথা থেকে মুখে একটা হালকা হাসি আনলো, বললো–এ কী নয়ন? তোমার চোখের কোণগুলিতে মুক্তো? এসব কথা তুলে আমি অন্যায় করেছি। আমাকে মাপ করো। জানো, একা একা আমার মনে হতে লাগলো, সেই একটা মানুষ একটা গুলিতে মাটিতে পড়ে কেমন হাহাকার করেছিলো! তুমি দেখো, তুমি দেখো, এই রাত্রির প্রভাব রাত্রি শেষ হতেই শেষ হবে। তুমি মুখ তোলো, ওই জল আমার সহ্য হয় না।
নয়নতারা বললো–তোমার মদ তো এ ঘরেই থাকে, কোথায় আছে বলো।
-এঃ? রাজচন্দ্র বললো।
নয়নতারা ভাবলো, সারাদিন নির্জলা উপবাস করেই বোধ হয় তার এরকম বোধ হচ্ছে। কেমন যেন ছায়া-ছায়া নয়? অথচ দ্যাখো, রাজকুমার বিদেশী এই জবরজং পোশাকের দু পকেটে হাত দিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে। এমন তো নয় যে সে ভুলে যাবে কী করে শেষ রাতে সে নিজে এ ঘরে এসে পৌঁছলো। এটা কি এক অভিনয়ের পোশাক? কিংবা কিংবা এটাই কি একমাত্র কিছু যা রাজকুমারকে এই বর্তমানের, এই বাস্তবের অস্তিত্বে ধরে রাখছে? এমন উপবাস ভালো হয়নি। ভয় ভয় করে উঠলো তার। রানীমা কিংবা পিয়েত্রোর সম্ভাব্য বিদ্রোহের নায়ক, তার নিজের এক কাল্পনিক সিংহাসনের রাজার অস্তিত্ব থেকে সরে এসে রাজকুমার কি সত্যই অতীত এবং বায়বীয় হতে পারে? এগুলোর চাইতে বিষণ্ণ আর কী আছে?
উৎসবের রাত্রিতে তখন নিদ্রা ও বিশ্রামের শ্লথতা লেগেছে। জানলার নিচে তখন আলোর তুলনায় কোমল শীতল অন্ধকার। কালো আকাশে অজস্র হীরার টুকরার মতো তারা। হঠাৎ আবার সাড়াজাগানো ঢাকের শব্দ কানে এলো। রাজচন্দ্র বললো–দ্যাখো, দ্যাখো নয়ন, এ আবার কী জুলুস!
মশাল, পুরোহিত, ঢাক–কোথাও যাচ্ছে, সদরদরজার কাছে দেখা গেলো।
নয়নতারা উঠে এলো। রাজচন্দ্র বললো– বুঝেছি, শেয়ালকে দিতে যাচ্ছে। তাহলে যজ্ঞ শুরু হতে দেরি নেই। জানো, নয়ন, এবার উৎসবে আমার কী লাভ? রানীমা এবার আমাকে কী উপহার দিচ্ছেন? বিশেষভাবে ইংরেজি ভাষায় দক্ষ একজন সবসময়ের সহচর থাকবে। নাকি প্রাইভেট সেক্রেটারি। ছোটোলাট, বডোলাট, জঙ্গি লাট সকলেরই নাকি একজন করে থাকে। রানীমার প্রস্তাব। নায়েব-ই-রিয়াসত মন্তব্যের জন্য আমাকে পাঠিয়েছিলেন। লিখে দিলাম, আপত্তি নেই।
নয়নতারা ভাবলো, কী বিষঃ রাজু! আর এ বিষণ্ণতার মধ্যে দ্যাখো ঠাট্টা যেন অপমানের মতো।
রাজু বললো–নয়ন, আমাকে মার্জনা করো। চলো না-হয় পুজোর কাছে।
নয়নতারা ভাবলো, আর আমি নিজে সময় নিয়ে অঙ্ক কষছি যেন কোন ব্রহ্মা-ঠাকরুনের অঙ্কের হিসাবে পৃথিবী চলে। এদিকে এখনই ভাবছিলাম (অনুভূতিকে ভাবনা মনে হলো), রাজু সময়ের তলায় তলিয়ে গেলো, আমরা আর-সকলে যখন অনায়াসে ভাবছি।
কিন্তু সে হাসলো, যেমন করে সেই পারে। উঠে দাঁড়াতেই তার চুলগুলো পিঠের উপরে ছড়িয়ে পড়লো। রাত জাগার কাজল চোখে, চোখ দুটো ঝিকমিক করলো। বললো, তুমি এখন ঘুমোবেনা বুঝতে পারছি। আমি এখন পুজোর কাছে যাবো। তুমি আসবে? কিংবা কিছুক্ষণ পরে তোমাকে ডাকতে পাঠাবো কাউকে।
সে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুললো।
১১. ইতিহাসের এই এক নিয়ম
একাদশ পরিচ্ছেদ
০১.
ইতিহাসের এই এক নিয়ম, তার উপকরণ না-পেলে সংক্ষেপে বলা ভালো। আমাদের অনুমান ইতিহাস-কথাতেও সে রকম প্রথাই থাকা উচিত। মরেলগঞ্জে এবং রাজনগরে এক বিদ্বেষ-প্রীতির টানাপোড়েনের সম্বন্ধ তৈরী হচ্ছিলো। কিন্তু সেই শীতে রানীমার জন্মতিথিতে ডানকানের পক্ষ থেকে কেউ না আসলেও বিদ্বেষটা না বেড়ে প্রীতির ভাবটাই দেখা দিয়েছিলো যেন। দিন চার-পাঁচ পরে ডানকানের এই উপেক্ষার কথা না তুলেও নায়েবমশাই বলেছিলেন, ওকে চাপে রাখো। কেন তা হলো না তা নিয়ে অনেক গবেষণা চলতে পারে, কিন্তু সঠিক যেটা জানা যায় তা বিশেষ সংক্ষিপ্ত। যেমন জন্মতিথির এক সপ্তাহ গেলো না। নায়েবমশাই অন্য অনেক দপ্তরের কাজের মধ্যে ল-মোহরারের দপ্তর দেখতে দেখতে বলেছিলেন, মনোহর সিং-এর সেই টেরেসপাসের হামলার কী হাল? গৌরী বলেছিলো, আজ্ঞে, আপনি ঢিলে দিতে বলেছিলেন। নায়েব বললেন, আর কেন? তদ্বির করো, সমন বার করাও। কিন্তু সে সকালেই বাড়ি যাওয়ার মুখে যখন, তার নিজের ভাষায় বুড়ো হাড়ে রোদ লাগাতে তিনি বারান্দায়, দেখলেন, মরেলগঞ্জের ফিটন ঢুকলো রাজবাড়ির দরজায়। অবাক কাণ্ড! ফিটন থেকে নামলো মনোহর সিং। এদিক ওদিক না চেয়ে সোজা, চলে গেলে দেওয়ানকুঠিতে। এখন তো সকালের কাছারি ভাঙতে আরো আধঘণ্টা। রোদে রাখা চেয়ারটায় বসেই গৌরীকে ইঙ্গিত করলেন। মনোহর সিং আধঘণ্টা বাদেই ফিরে গেলো। গৌরী দেওয়ানকুঠিতে গেলো। হরদয়ালকে জানালো নায়েবমশায় জানতে চাইলেন, যে এসেছিলো সে সত্যি মনোহর সিং কিনা। দেওয়ানের কাছে গৌরী জানালো, মনোহর সিং কাঁদছিলো! তার বিবাহ একাধিক, কিন্তু ছেলে একটিই। সে নাকি কলকাতায় লেখাপড়া করতো। কী করে কার পাল্লায় পড়ে ক্রিশ্চান হয়েছে কিংবা হবে। আমাদের দেওয়ানজি তাকে উদ্ধার করার ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন কীনা। নায়েব তামাক খাচ্ছিলেন। তিনি ঠাট্টা করে হেসে উঠতে গিয়ে বেদম হলেন। দশ-বিশ মিনিট কথা বলতে পারলেন না। তার বাড়িতে যাওয়ার পালকি এলো। বাড়িতে যেতে উঠলেন হাসি-হাসি মুখে। পালকির পাশে দাঁড়ালেন। গৌরীকে ডাকলেন। সে এলে কুটি করে ভাবলেন। বললেন, মনোহরের ওই একই ছেলে? আচ্ছা, গৌরী, মামলায় কী বা হয়? তা, তুমি টেরেসপাসের মামলাটা তুলেই নাও। তিনি পালকিতে উঠলেন। নায়েবমশায়ের হঠাৎ এই মত-পরিবর্তন কাছারিকে ধোঁকায় ফেলেছিলো। কিন্তু সেই ধোঁকা দূর করার মতো কোনো বিশদ বিবরণ কি পাওয়া যায়?
