রাজকুমার হেঁটে গিয়ে চেয়ারে বসলো। পিছন দিকে যেন আর একটু ঘেঁষে বসলো। কিন্তু এই চোখে কি ঘুম আসে? ইস্পাত হলে তা সাদা হতে হবে এমন নয়, নীলাভ হতে পারে। প্রান্তগুলো লাল, কোলে কালিমা।
নয়নতারা বললো–এই তামাকই ঘুম তাড়িয়েছে।
রাজু চোখ মেলে চাইলো। নয়নতারাই বরং চোখ নামালো। রাজু হাসলো। অনুচ্চ, কিন্তু তা যেন সেই গ্রামের তুলনায় তরল। যেন কয়েকটি কাঁচের গুলি একসঙ্গে গড়িয়ে গেলো। সে বললো–বলো এখন কী করি? কিংবা দ্যাখো আমাদের দুজনকে ঘিরে কেমন নিস্তব্ধ অগাধ রাত্রি এই মহলে। তুমি কি ওই দেয়ালগিরি দুটোকে নিবিয়ে দেবে?
নয়নতারা জিজ্ঞাসা করলো–তুমি এতক্ষণ কী করছিলে, রাজকুমার?
রাজকুমার বললো–সে এক ভারি মজার ব্যাপার! রূপচাঁদকে সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়ির নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে বেরিয়েছিলাম। (মুখটা কঠিন হলো যেন)। রূপচাঁদ হয়তো গুলি খেয়েছিলো, আমি মদ ছাড়া কিছু খাইনি। জানো, একবার রূপচাঁদকে জিজ্ঞাসা করলাম, বল তো কোন ঘরটা মানায় নয়নকে?
-কিন্তু তার জন্য রাত জাগতে হবে কেন?
বাহ, অন্যান্য দিন দেখার সুবিধা কোথায়? লোকজনে আসবাবপত্রে গিস্ গি করে? জানো, অনেক কিছু জানতাম না এই রাজবাড়ির। জানো, রূপচাঁদ ক্রীতদাস? জানতে না তো? রাজু হাসলো।
-এতে হাসির কিছু নেই।
নেই? জানো রূপচাঁদের উপরে খুশি হয়ে বললাম, বাগচীমাস্টার বলেছে আইনে আর ক্রীতদাস রাখা যায় না। তুই তোর লখনউ-এ ফিরে যা। তাতে ও যেন কাদলো। নাকি আমি ভয় পেলাম। ওর চোখ দুটো ভিতরে ঢুকে গেলো যেন মড়ার খুলিতে। বললো, রাজবাড়ির বাইরে যেতে তার খুব লজ্জা করবে। আচ্ছা, আমি ঠিক উচ্চারণ করছি তো কথাগুলো?
এ রকম ঠাট্টা আমার ভালো লাগে না, রাজকুমার। আমাকে কি তোমার কাছে যেতে দেবে? পা-টা একটু দেখবো।
-আসলে রূপচাঁদ ঠিকই বলেছে। আমাকে যদি কেউ রাজবাড়ির বাইরে যেতে বলে আমারও লজ্জা করবে।
-তুমি কি আজকাল রূপচাঁদের সঙ্গে তুলনা করছে নিজেকে?
কী যে বলো! রূপচাঁদ গুলি খায়! উ-উ, লাগে!
–একটু স্নানের ঘরে এসো। পা-টা ধোয়া দরকার।
-আচ্ছা, নয়ন, তেলাপোকাকে শুড় নাড়তে দেখেছো? আমার নিজেরই মনে হলো আজ তা দেখে-পণ্ডিতরা বলেন, তা করে নাকি ওরা বুঝতে চেষ্টা করে কোথায় আছে।
কথাটা অসংলগ্ন হলো। এই শীতের ভোররাতে তোমার তেলাপোকা আবিষ্কারে। উৎসাহ বোধ করছি না।
রাগ কোরো না। আমি রাজবাড়িটাকে মেপে দেখছিলাম মনে মনে। রাজকুমারের দৃষ্টিটা হঠাৎ যেন গম্ভীর হলো। সে বললো, গোড়াতে ছিলো না। পরে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ মনে হলো, আমার মা, আমার নয়নতারা, আমার গ্রাম, আমার বাড়ি তার মধ্যে ঠিক যেন আমি কোথায় বুঝতে পারছিলাম না। জানো, আর বিদ্রোহ হবে না।
নয়নতারা বললো–তাও ভালো, আমি ভাবি নতুন রানী এলে তার জন্য প্রাসাদের কোথায় কী বদলাবে তাই দেখতে ঘুরছিলে।
মধুর রসিকতাটার উত্তর দিতেই যেন অভ্যাসবশে মুখটা তুলো রাজকুমার, কিন্তু উত্তরের মুহূর্তটা পার হয়ে গেলো।
নয়নতারা ভাবলো, কিছু কি দুশ্চিন্তা করতে হবে রাজকুমারের জন্য? এগুলো কি নেশার ঘোরের গোপনে জেগে ওঠা কোনো ব্যথা?
নয়নতারা বললো– রাজু, আমি তোমার বিছানায় বসলে কি তোমার ঘুম হবে?
রাজচন্দ্র বললো–না বোধ হয়। তার চাইতে চলো তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিই। অন্ধকারে খানিকটা হাঁটা হবে।
দরজায় এখন ইংরেজি কায়দায় গা-তালা। নয়নতারা চাবি ঘুরিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। বললো–পকেটে হাত দিচ্ছো? তামুক খেতে ভালো লাগবে?
না, রাজকুমার বললো, গলার ভেতরটা যেন শুকিয়ে উঠেছে।
–একটু মদ খেলে কি হয়? কিংবা রাত শেষ হতে এখনো দুঘণ্টা বাকি।
-আমরা বরং…রাজু উঠলো। একটা জানালার কাছে গিয়ে সেটাকে খুললো। ফিরে দাঁড়িয়ে হাসলো। বললো, এমনকী রানীমার এই জন্মতিথি-উৎসবের মূলেও
নয়নতারা বললো–ঘটনাটা আমি জানি। তুমি আমাকে জানতে দিয়েছে। কী ভাবছে বুঝতে পারছি না। তোমার এই জবরজং জোব্বাটা খুলে দিই?
-তুমি তো জানবেই। তোমাকে বলতে পেরে ভারমুক্ত হয়েছিলাম। আর কী লজ্জা, বলল, তুমি সেই ভার নিয়ে একজনকে রাজকুমার করে ফেললে।
নয়নতারা বললো–এই উৎসবটার উৎসব হিসাবেও মূল্য আছে। সে হালকা সুরে বললো। প্রিয়জনের কল্যাণে অনেক কিছু করতে হয়। জানো, সেসব শুনে আমিও স্থির করে রেখেছি, মানুষের পানীয় জলের জন্য একটা পুকুর কাটিয়ে দেবো।
রাজচন্দ্ৰ নয়নতারার দিকে সরে এলো। যেন নয়নতারা কী বললো– তা ভালো করে বুঝতে! বললো– হেসে-এই, দ্যাখো, নৈনা, তুমিও একজনের পাপ স্খলনের চেষ্টায় আছে। একটি প্রাণ হরণ করে অন্য অনেক প্রাণ পোষণ করলে শোধ হয়?
নয়নতারা ভাবলো, এখনই রাজকুমার বললো, আর কোনো বিদ্রোহ হবে না। এমন জায়গায় কথাটা বলা হয়েছে যে মনে হবে আর একটা বিদ্রোহ হলে সে নিজেকে খুঁজে পায়, রাজবাড়ির ঘরে ঘরে নিজেকে খুঁজতে হয় না। আর তখন, নয়নতারার মনে পড়লো, সেই কিশোর রাজুকে সে বলেছিলো, যেহেতু রাজা অনেক আত্মসম্মানের প্রতীক, সেহেতু রাজাকে নিজের আত্মসম্মান রক্ষায় নির্দয় হতে হয়। সে ভাবলো, মরেলগঞ্জের কটুভাষী সেই তহশীলদারকে হত্যা করার ব্যাপারটাই তো রাজকুমারের মনে। তা হতেই পারে। এই জন্মতিথির উৎসব তো সেই নরহত্যাকে আলোর আড়ালে লুকিয়ে ফেলতেই শুরু করা হয়েছিলো। কিন্তু তাকে কি নিরর্থক আর ভয়ঙ্কর বোঝা বলে মনে হয়, যদি একজন নিজেকে আর রাজা মনে করতে না পারে! সে মনে মনে বললো, ঈশ্বর সাক্ষী, আমি তোমাকে ঠকাই নি। তখন সেই বিদ্রোহের আয়োজনে তোমাকে রাজকুমারই মনে হতো।
