এটাই কি ভালো হয়? বেচারারা যদি তাদের অভিজ্ঞতার গল্প করে, বলবে, পূজায় কী দরকার পড়ায় সার্বভৌমপাড়া থেকে নয়ন-ঠাকরুনকে আনতে হয়েছিলো। নয়নতারা ভাবলো, এটা কি একটা ধোঁকা তৈরী করছে রূপচাঁদ? কিংবা সে কি ভাবছে, তার এখন রানীমার কাছে আশ্রয় নেওয়া উচিত? পালকি নিশব্দ হলেও দ্রুতগতি। কী গ্লানি!
নয়নতারা একটু হাসলো যেন, বললো, বলো কী রূপচাঁদ? সেখানে পূজার ভিড়ে কোথায় কোন কাজে আটকে পড়বো। গলার কাছে একটা বাধা। সেটাকে গিলে ফেলে সে বললো–গাড়ি বারান্দা থেকেই রাজকুমারের মহল কাছে হবে।
গাড়িবারান্দার আলোটা যেন বাসি। গাড়ি বারান্দা থেকে হল, হল পার হয়ে ঢাকা অলিন্দ দিয়ে সিঁড়ির ঘর, এখন সব জায়গাতেই আলো কম। আলো থেকে দূরে দূরে যে অন্ধকার তাই বরং গুণবান, তার স্নিগ্ধতা আছে।
সিঁড়ির মাথায় চৌকোণ জায়গাটা যাকে ল্যানডিং বলা হচ্ছে সেখানে একটা আলোর পাত। নয়নতারা সেখানে পৌঁছতে রাজচন্দ্র বলে উঠলো–কে নয়ন? কথা ছিলো।
এখন নয়নতারার অবাক লাগলো যে তার এত নিশব্দ চলার শব্দও রাজকুমার শুনেছে। এই রাতে, রাত যখন শেষ হতে চলেছে, সে জেগে আছে! কিন্তু এসবের আড়াল থেকে তার মনে হলো, কী ঘটেছে যে ঘুমোত পারেনি? কী আশায় জেগে আছে?
একটু সাহসের সঙ্গে আধখোলা দরজাটার কাছে গিয়ে সে বললো–এই দেখুন, সকলের মধ্যে থেকে যদি এমন করে অনুরোধ করবেন?
রাজচন্দ্র বললো, রাজকুমারের মনে থাকে না। কী করি? তুমি যে আমার নয়ন, বড়ো লাজুক। অথচ নিচে ওই যে জনারণ্যে যার কথা হচ্ছে সে কিন্তু বেশ সাহসিকা।
নয়নতারা বললো–ঘুমোননি কেন?
তোমাদের এই উৎসবের এত সোরগোল! এই বলে রাজচন্দ্র সরে এসে নয়নতারার মুখোমুখি দাঁড়ালো, বললো–বাহ কী সুন্দর এই চুল কয়েকটি!
নয়নতারা ভাবলো, কার কথা বলছে রাজু? কে যথেষ্ট সাহসিকা?
রাজচন্দ্র বললো–আর দ্যাখো তো এই রূপসীর কপাল!
নয়নতারা বললো–আপনি কি কোনো পালাগানের কথা ভাবছেন, রাজকুমার?
রাজচন্দ্ৰ হেসে বললল, তুমি কী আজও আবার মনে করিয়ে দেবে বিদ্যা নামে সেকন্যে সাধারণ মানুষী নন?
-আপনি ওরকম করে কথা বলবেন না। আমি বলছিলাম, আজ নিচের চত্বরে নাটক হয়েছে। পালাগান হয়নি।
নয়নতারা ভাবলো, আশ্চর্য নয় কি যে জানলার নিচেই এত সোরগোল তুলে, ভালো হোক মন্দ হোক, একটা নতুন কিছুহলো যার নামনাটক, অথচ রাজকুমার যেন অন্য কোথাও থেকে এইমাত্র এলো! যেন রাজবাড়ির কোথাও ছিলো না!
রাজকুমার বললো–হয়নি? না হোক। কিন্তু তা বলে তোমার চুলগুলি যদি এই রাতের আলোয় কপালে লতিয়ে সুন্দর দেখায়, কেউ কি বলবে না?
–কেউ না বলে, তুমি বলো। না হয়, কাল কোথাও চলো, বেড়াতে যাবো। কিংবা কাল এই প্রাসাদের নানা নির্জন ঘরের যে কোনো একটিতে বসে আমরা সারাদিন গল্প করবো।
কিছু বোঝ না, তুমি নয়ন। আজ তোমাকে দরকার। বরং ভোরবেলায় কাক ডেকে উঠতে যখন তোমাদের পূজার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের রাত্রি শেষ হবে, রানীমা ঘুমোত যাবেন, তখন তাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে তুমিও বাড়ি যেয়ো। বাহ, কাছে এসো।
নয়নতারা নিজের হাতের দিকে চোখ নামালো। কখনো কখনো আঙুলগুলো অশান্ত হয়।
রাজু ল্যানডিং-এর ব্যানিস্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। বললো–তোমার প্রথমবারের উৎসবের কথা মনে আছে নয়ন? সে হাসলো যেন। সকালে উঠে অবাক! কিংবা তখন উঠিনি, ভাবছি এ কোথায়? দেখি, পাশে ঘুমিয়ে আছো তুমি। কী করে যে হয়? একটা রাত ঘুমিয়ে থাকলাম, একটা কথাও হয়নি! কোথা থেকে সুঘ্রাণ আসে?
কথার কি নিজেরই জন্মানোর ক্ষমতা আছে? নয়নতারা বললো, শুনেছি, এক রকম মৃগের ওই দশা হয়।
কিন্তু কথাটা বলে ফেলেই পিছিয়ে এলোয়নতারা, যেন অদৃশ্য কোন গণ্ডি তার পায়ের আঙুলে মুছে গিয়েছে। যেন অদৃশ্য এক পর্দা কিছু সরে গেলো হাত লেগে। এরকম অবস্থায় ভয় ভয় করে ওঠে।
কিংবা খানিকটা ভয় তার ছিলোই, যেজন্য রাজচন্দ্রকে সে ভালো করে দেখেনি। তার মনে হলো, এমন মৃদু সুরার গন্ধ ছিলো সেই প্রথম উৎসবের রাত্রিতে রাজুর মুখে! চোখের প্রান্তগুলো লাল হয়ে উঠেছে। আর যেন টালমাটাল করছে দৃষ্টি। পায়ের ডিম-ছোঁয়া ঢিলে জোব্বা, ঢিলে পালুন, চটি, ধোঁয়াচ্ছে এমন পাইপ বাঁ হাতে, একগোছা চুল কপালের উপরে। বাঁ পায়ের পাৎলুনে রক্ত!
এসো নয়ন, বললো– রাজু।
-কোথায় যাবো? নয়নতারা ভাবলো, রাজকুমরের কাছে গিয়ে কি তাকে অনুরোধ করা যায় ঘুমোতে যেতে?
রাজচন্দ্র ল্যানডিং বরাবর একটু সরলো। এমন কোনো কোনো জায়গা আছে যেখানে দাঁড়ালে কুয়োর গোড়ায় সিঁড়ির শেষ ধাপটা চোখে পড়ে। সেখানে কি কাউকে চোখে পড়লো? কেউ কি সেখানে ক্লান্তিতে বিবশ হয়ে মুখ ঢেকে বসে আছে?
রাজু বললো–এখন আর আমার কিছু দরকার নেই, রূপচাঁদ। ওদিকেও পুজো শেষ হতে চললো। একবারে স্নান শেষ করে পুজোর কাছ থেকে ঘুরে এসে ঘুমোবো। তুমি ওদের ভোররাতেই গরম জল দিতে বলল।
রাজু ব্যানিস্টার থেকে সরে এলো। তার কি তখন পা টললো?
নয়নতারা বললো–কোথাও যাবে বললে?
রাজু এগিয়ে গিয়ে তার শোবার ঘরের দরজা খুললো। ঘরে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে তামাকের থলে বার করতেই নয়নতারা বললো–খুব হয়েছে! ভালো হয়েছে বাগচী মাস্টারের শিক্ষা। কিন্তু এখন অনেক রাত। রাজু পাইপ থেকে ভস্মাবশেষ গালিচার উপরেই ঢালছিলো, হাত বাড়িয়ে পাইপটা নয়নতারার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো–নাও।
