রানী ভাবলেন : ইনি মহান অর্থাৎ অনন্তকালের প্রতীক। কোটিকে কোটি দিয়ে গুণ করেও অনন্ত হয় না। যাহা হয় তাহা কালেই হয়। কালের বাইরে কিছু হয় না। হওয়া অর্থে জন্ম, বেড়ে ওঠা, মৃত্যু, মিলন, বিচ্ছেদ। আমাদের জ্ঞান, বুদ্ধি, অনুভূতিতে ইনি সীমাযুক্তা কিন্তু অনন্ত ব্যাপ্তিতে প্রবাহিতা, সুতরাং জ্ঞান ও অনুভূতি উভয়ের প্রতি উদাস। সুখ কী? দুঃখ কী?
পুরোহিত ঘণ্টা বাজালো মৃদু শব্দ করে। ঝুঁকে পড়ে একমুঠো ফুল নিয়ে মেরুদণ্ড সোজা করে বসলো। দ্রুত অস্ফুট স্বরে কিছু বলছে, তার বুকের পাশ দুটো যেন ফেঁপাচ্ছে। দ্যাখো তন্ত্রধারকের গাল বেয়ে ধারা। রানীমা বলেছিলেন বটে, আমার হয়ে অঞ্জলি দিও। সে কি ভয় পাচ্ছে? ফুলের সঙ্গে সঙ্গে ফুলকে প্রতীক করে নিজের চেতনার সীমা দ্বারা আবদ্ধ সব কিছুকে সীমাহীনতায় নিমগ্ন করার ভয়?
.
০৮.
নয়নতারা তার বাড়ির কাছাকাছি এসে একটু আস্তে চলতে শুরু করলো। মৃদু ক্লান্তিও বোধ করছে সে। রাত জাগার ক্লান্তির সঙ্গে উপবাসের লঘুতা। সার্বভৌমপাড়ার এই পথেও দূরে দূরে দু-একজন লোক, গাছের ছায়ায়, আলো-অন্ধকারে চলেছে। শেষ রাতের হিমেল বাতাসে শেষ রাতের মলিন চাঁদের আলোতে পথের ধারের দুএকটা পশ্লব মৃদু মৃদু নড়ছে।
একটু চমকে গেলো সে। একটা মাঝারি চেহারার পালকি নিঃশব্দে, বিনা হাঁকে কিন্তু অস্বাভাবিক দৌড়ে, যেন তার গায়ে এসে পড়তে পারে, সে সরে দাঁড়ানোতে তার পাশ কাটিয়ে উড়ে গেল যেন। একজন ছিপছিপে চেহারার বরকন্দাজই যেন পালকির ওপাশে দৌড়চ্ছে।
নয়নতারা কৌতুক বোধ করলো। কৌতূহলও। এ পথে এখন কে এমন যায় পালকিতে? হতে পারে কোনো জোতদার যে আমন্ত্রণ সেরে ফিরছে। কিন্তু মজা দ্যাখো, হুমহাম নেই বেহারাদের। অবশ্য সে শুনেছে, জোতদাররা রাজবাড়িতে সম্মান দেখাতে রাজার নিজগ্রামে যানবাহনের ব্যবহারে বাহুল্য করে না।
কৌতূহল ও কৌতুক নয়। বিদেশী বাকরীতিতে, বিস্ময় ও ভয়ই তার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সে নিজের বাড়ির দরজায় পা দিয়ে দেখলো, পালকিটা আরো এগিয়ে তার বাড়ির উঠোনে দাওয়া ঘেঁষে নামানো হলো। মলিন নিষ্প্রভ আলো সত্ত্বেও পালকির চতুষ্কোণ গাঢ় ছায়া, বেহারাদের ছায়া কালো ঘন-সন্নিবিষ্ট দীর্ঘতা-চোখের ভুল হতে পারে না। আগের চিন্তার ছায়া পড়লো মনে, কোনো অর্থশালী জোতদার? সঙ্গে সঙ্গে কী এই একটা অনুচ্চারিত শব্দ প্রতিস্পর্ধায় তার সমস্ত চেতনায় ঝঙ্কার দিয়ে উঠলো।
কিন্তু অন্যপক্ষেরও চোখ ছিলো। সেই ছদ্মবেশী বরকন্দাজ অত্যন্ত দ্রুত নিশব্দে এগিয়ে এলো। সে খুক করে কাশলো। তারপর যেন অব্যক্ত কান্নার শব্দ করলো।
রূপচাঁদ? নয়নতারা বিস্মিত প্রশ্ন করলো।
মা, আপনাকে মা-জি বলেছি সেই কতদিন আগে।
–বেশ তো! তাতে কী হলো?
–ভালোই লাগছিলো। বললেন, চল তো সব ঘুরে দেখি। এ-ঘর ও-ঘর, এখানে আলোর নিচে, ওখানে ছায়ায়, এ মহল, সে মহল, সঙ্গে বেড়াচ্ছিলাম, মনে হলো হাসছেন, মনে হলো কিছু খুঁজছেন, ক্রমশ রেগে যাচ্ছেন, এক জায়গায় হোঁচট খেলেন, তারপরে বললেন, তুই জানিস না, হতভাগা, আমি একা থাকতে পারি না? তারপর বললেন, কোথায় সে? আরো রেগে বললেন, আধ ঘণ্টার মধ্যে যদি তাকে আমার ঘরে না-আনতে পারিস, কাল সকালে তোর মুখ যেন দেখি না।
রাজকুমারের কথা বলছ, রূপচাঁদ?
–অমন রাগের কথা আমি কখনো শুনিনি। মনে হলো, ভয়ঙ্কর রকমে জোর খাটাতে চাইছেন।
-তুমি পালকি এনেছো কেন? গ্রাম ছাড়া হওয়ার ভয়ে?
তর্জন-গর্জন নয়, কিন্তু সে রাগ এতটুকু মিথ্যা নয়।
নয়নতারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলো, তারপর কী ভেবে পালকিটার দিকে এগিয়ে গেলোলা। কিন্তু রূপচাঁদই এগিয়ে এসে পালকির দরজা আড়াল করে দাঁড়ালো বরং।
বললো, মা-জি, মনে হলো বে-এক্তিয়ার।
-তুমি যেতে নিষেধ করছো?
–সাধ্য কী আমার? কী সর্বনাশ না-জানি হয়! আমি বরং গ্রাম ছাড়া হই এই রাতেই।
নয়নতারা চাপা গলায় প্রশ্ন করলো–খুব মদ খেয়েছেন নাকি? সে এগিয়ে গিয়ে মৃদু আলোতে পালকির দরজার চকচকে কাঁচের হাতলে হাত রাখলো। রূপচাঁদ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো৷নয়নতারা নিজেই পালকির দরজা সরিয়ে হেঁট হয়ে পালকির গদিতে গিয়ে বসলো। দরজা টেনে দেওয়ার আগে বললো–পালকি তুলতে বলল রূপচাঁদ।
কাউকে কাউকে অভ্যাসবশেই মাথা খাটিয়ে চলতে হয়। রাতের শেষ প্রহরে রাজবাড়িতে পালকি করে পৌঁছলে বহু দূর দূর ছড়ানো গল্পের একটা উপকরণ হবে। গল্পটা কী হবে সেটাই আসল কথা। সে পালকির দরজার ফাঁকে উঁকি দিয়ে রূপচাঁদকে খুঁজলো। রূপচাঁদ কি লজ্জায় পিছিয়ে পড়েছে? নয়নতারা লজ্জার মতোই কিছু অনুভব করলো, যাকে বরং গ্লানি বলা উচিত। রাজবাড়ির হাতার যে কোনো আলো-নিবে-যাওয়া নির্জন জায়গায় নেমে পালকি আর রূপচাঁদকে বিদায় দেওয়া কি ভালো হবে? রাজবাড়ির সেই জায়গাটা রাজকুমারের মহল থেকে যত দূরে হয় ততই ভালো। রূপচাঁদের কথাতেই প্রমাণ। ব্যাপারটাকে কী অর্থে নেওয়া সম্ভব।
রূপচাঁদের মনও চিন্তামুক্ত ছিলো না। যেমন সে চিন্তার ভারে পিছিয়ে পড়ছিলো তেমন চিন্তার চাপেই এগিয়ে এলো। তখন রাজবাড়ির সদর দরজায় ঝুলানো ঝাড়ের আলো পড়ছে বেহারাদের মুখে।
বেহারারা অদ্ভুতভাবে নিঃশব্দ, তাই রূপচাঁদের চাপা গলা শুনতে পেলো নয়নতারা। আপনি কি পূজার আঙিনায় নামবেন, মা-জি?
