একটা সিঁড়ি এখানে নিচের বাঁধানো চত্বরে নেমে গিয়েছে। থামের গায়ে হেলান দিয়ে কে একজন বসে সে-সিঁড়িতে। নয়নতারা চাঁদরের ঘোমটাকে কপাল মুখের দুপাশ ঢেকে ঠোঁটের কোণ পর্যন্ত এগিয়ে আনলো। সিঁড়ির লোকটি মাথা ফেরালো।
শাড়ি ঘিরে এই পশমিনা চাদর যা আর শাল নয়, মোটা বুনোটের যা আধো-অন্ধকারে গড়া থেকে পৃথক নয়। কিন্তু এ কি সত্য প্রত্যেকের হাঁটার ভঙ্গি পৃথক যাতে শুধু হাঁটা দেখে বোঝা যায় কে চলেছে? লোকটি সম্ভবত রূপচাঁদ। হয়তো এখনই জানতে চাইবে নয়নতারাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে হবে কিনা। নয়নতারা দেয়াল ঘেঁষে সেই দেয়ালগিরি পার হয়ে এলো। ছি ছি, নয়নতারা!
চাদরটাকে একটু টেনে নিজের হাত দুখানাকেও ঢাকলো সে। সামনে একটা ছোটো দেয়াল। এখানে পথ বাছাই করতে হবে তাকে। সামনের দেয়ালটার গায়ে তার ছায়া পড়লো। মাথাটা একটু নিচু করে যেন নিজের ছায়াতে ডুবে দেয়ালটার বাঁ পাশ ঘুরে দেয়ালটাকে পার হলো সে, এবং তারই ফলে যেন উপরের মহলে যাওয়ার সিঁড়ির সামনে এসে পড়লো। উপরের মহল, যেখানে রানী এবং রাজকুমারের ঘরগুলি। রানীমা তো এখন পূজার সামনে।
কাচকড়ার দেয়ালগিরি সিঁড়িতে। কাঠের সিঁড়ি। কী অসম্ভব নির্জনতায় চওড়া, পিছল ধাপগুলো চকচক করছে। যাকে ল্যানডিং বলা হয় তার উপরে বেশ খানিকটা আলো। রাজকুমারের ঘরের দরজা ল্যানডিং থেকে একপাক ঘুরলেই। কিন্তু আলোটা কি তার ঘরের? জেগে আছে কেউ?
এ কি নিমন্ত্রিতদের জন্য পান আনতে যাওয়া?
নিশ্বাসে একটা অসমতা দেখা দিচ্ছে। কিন্তু তাই বা কেন, সে তো এখনো সিঁড়ির গোড়ায়। মানসিক শ্রম? নিশ্বাসের অসমতা তার অনুভূতির ভুল ভাবতে গিয়ে তার অস্ত্রে কোথাও কাঁপন লাগলো। বুকের মধ্যে রক্ত কেমন করছে, সেজন্যই যেন ঠোঁট দুটিও ঈষৎ ফুলে গেলো।
রাজু কি জেগে আছে? এখন তো অনেক রাত, নাকি তার ত্বকেই এটা কাপন। সে নিজেই লক্ষ্য করেছে, রাজু নাটক দেখতে যায়নি।
আসলে–আসলে এইসব বিচিত্র রকমের আলোই দায়ী। ঠিক যেন আলোও নয়। রক্তস্রোতে সেই আলো মিশে গিয়ে কী সব ঘটাতে পারে।
সিঁড়ির গোড়া থেকে ডাইনে কিছু দূরে একটা বড়ো জানালা, নাকি ফ্রেঞ্চ উইনডো বলে। নয়নতারা একটু তাড়াতাড়ি সেদিকে সরে গেলো। সে তো পান নিতে এসেছে। সে বড়ো জানলাটার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো, আর তখন এক ঝাপটা ঠাণ্ডা বাতাস লাগলো তার কপালে।
কী আশ্চর্য! নিচে কাছারির আঙিনার এদিকে ওদিকে আলো এখন অনেক কম। সদরদরজার নিচে ঝাড়টা বেশ স্পষ্ট। কাছারির বারান্দার দেয়ালগিরি যেগুলো চোখে পড়ছে, প্রদীপের মতো মৃদু। এত সহজে এত তাড়াতাড়ি কেমন একটা পরিবর্তন হয়। রাজবাড়ির দেয়ালের আলো, কাছারির দেয়ালের আলো, সদরদরজার আলো সব মিলে আলোর একটা জাজিম বিছানো ছিলো। যেন বিভিন্ন উৎসের আলো খানিকটা গিয়ে থেমে যাচ্ছে, মধ্যে মধ্যে অন্ধকারের গলিপথ।
জানলাটার নিচে দুধাপ সিঁড়ি।
নয়নতারা নিজের গলার মধ্যে কী অনুভব করলো। যেন তা বাষ্পের মতো, যা থেকে জল হয়। হঠাৎ তার মনে হলো, কেটের অভিনন্দনই তাকে এমন কষ্ট দিচ্ছে। তার বলা উচিত ছিলো, মিথ্যা। আর বুকের মধ্যে যে-চাপ সে তো উপোসের জন্য। মিথ্যা নয়, রাজকুমারের বিয়েতে যে-উৎসব হবে এই উৎসব দিয়ে তার ধারণাই করা যায় না।
উপোস রানীমাও করছেন রাজকুমারের কল্যাণ কামনায়। অনেক বেলায় সে একবার রানীমার চোখে পড়ে গিয়েছিলো। বলেছিলেন, মুখ শুকনো দেখছি, খাওনি তুমি? সে বলেছিলো, রাত হয়ে গেলো, এখন আর খাবো না ভাবছি।
দুটো বাজলো দেউড়িতে। এরই মধ্যে! কৌতুকের তো! শব্দ লক্ষ্য করে অস্পষ্ট হলেও নয়নতারা দেউড়ির সেই বরকন্দাজকে দেখতে পেলো যে ঘড়ি পিটলো।
কিন্তু তিরস্কারে কার না চোখে জল আসে?
ওরা বোধ হয় থিয়েটারের দল যারা মঞ্চের সামনে নেমে সব জিনিসপত্র গুছিয়ে তুলছে। তাদের শরীরের উপরের দিকটায় কিছু আলো।
তিরস্কার কোথায়? সেই যে ব্রহ্মঠাকুরানী একটা হাসির অঙ্কের ধাঁধা পেতেছিলো।
লোকগুলোর, দ্যাখো, পিঠে আলো পড়ছে। সুতরাং ওই ছোটো ছোটো দলগুলো যা চোখে পড়ছে, যারা দেউড়ির দিকে চলেছে, তারা উৎসব শেষে ঘরে ফেরার দল। দেউড়ির বাইরেও এই রাতেও তাহলে লোক চলেছে। তাদের কেউ কেউ নিশ্চয় সার্বভৌমপাড়ার পথ দিয়ে যাবে।
ফ্রেঞ্চ উইনডোর নিচে সিঁড়িতে পা দিলো নয়নতারা। একটু অসুবিধা হয়ই, ধাপগুলো স্বাভাবিকের চাইতে উঁচু। কিন্তু মাটিতে পা দিয়েই সে তরতর করে হেঁটে চলতে পারছে। কোনো একটা দলের পিছনে পৌঁছে, দলটার পাশ কাটিয়ে একটু তাড়াতাড়ি হেঁটে তার আগের দলটিকে ধরে, এমন করে একটু তাড়াতাড়ি চলে। শাড়ি-চাঁদরে সে তো নিজেকে ভালো করেই ঢেকে নিয়েছে, সে নিজের বাড়িতে পৌঁছে যেতে পারবে। হলোই বা শেষ রাত।
প্রতিমার সামনে রাখা ঘিয়ের প্রদীপের সারিতে তন্ত্রধার পলতেগুলোকে উস্কে দিলো। পূজা এখন শেষ হতে চলেছে, বোধ হয় যজ্ঞ শুরু হবে। পুরোহিতের কিছু পিছনে যাঁকে প্রতিমার মুখের দিকে চেয়ে স্তব্ধভাবে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে, তিনি রানীমা-ই। এখানে আসবার আগে স্নান করেছিলেন। চুলগুলো ভিজে ছিলো, নির্জনতায় এখন ঘোমটার পাশ দিয়ে সেগুলোকে সামনে এনেছেন। সে চুল অজস্র, আসনের উপরে লুটোচ্ছে।
