সেই প্রথমবার দেওয়ানকুঠির নাচের আসরের আলো নিবে গেলে সে এরকম মাঝরাতে এই পূজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলো। রানী উঠে এসেছিলেন। পিয়েত্রো ডানকান প্রভৃতি নাচমহলে খুশি হয়েছে জেনে নিয়ে রানী জানিয়েছিলেন পূজা শেষ হতে দেরি আছে। এখন দেওয়ান বিশ্রাম নিতে পারে।
চেহারার বৈশিষ্ট্য বলল, কিংবা বসার ভঙ্গি, অনেক ভিড়ের মধ্যেও তাকে চিনতে পারা যায়। হরদয়াল দেখতে পেলো কিছু দূর থেকেই, দালানের মেঝেতে রানী বসে আছেন। এখানকার আলো চোখ ধাঁধানো নয়। অনেক প্রদীপ, কিন্তু আলোটা কোমল। রানীর পরনে দুধ-গরদের থান, তার চোখ দুটো আয়ত।
দালানের নিচে হরদয়ালের সামনে আট-দশজন মানুষ, তারা পূজায় উৎসাহী। ওপারের রকে পুরনারীদের ভিড় এখনো রেশমে অলঙ্কারে উজ্জ্বল। পুরুষদের মধ্যে একজন কথা বললো। গলার স্বরে নায়েবমশায়কে চিনতে পারা গেলো।
নায়েবমশায় বললো–সব ব্যবস্থা ঠিক করা আছে। দশজন বরকন্দাজ ঘুরে পাহারা দিচ্ছে। এবার আমি যাই।
এ রকম অনুমতি রানীর কাছেই চাওয়া হয়। রানী বললেন–এসো, বাবা।
হরদয়াল তো দেখতেই পাচ্ছে সব ব্যবস্থা ঠিক করা আছে। নায়েবমশায়ের চালটা ধীর, কিন্তু নিশ্চয় ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকে না। বরকন্দাজদের কাঁধে আজ বন্দুক থাকবে।
কী হবে কিছু খোঁজ করে?
কিন্তু রানী উঠলেন। যেখানে নায়েবমশায় দাঁড়িয়ে ছিলো সেদিকে না গিয়ে রেলিং বরাবর সরে এলেন। বললেন–হরদয়াল? এখনো পুজো শেষ হতে ঘণ্টাতিনেক। তুমিও বিশ্রাম নিতে পারো।
আশ্চর্য নয়? হরদয়াল চোখ তুলে তাকালো, যেন ঘোমটা ঘেরা মুখটাতে সে একটু স্পষ্ট করে দেখলো।
রানী ঈষৎ হাসলেন। বললেন–শালটা ঠকায়নি। মানিয়েছে তোমাকে।
.
০৭.
দ্বিতীয় নাটক শেষ হওয়ার কিছু আগেই চিকের আসন থেকে উঠে পড়েছিলো নয়নতারা। সে পূজার কাছে আমন্ত্রিত মহিলাদের রকে গিয়ে বসলো। কে একজন জিজ্ঞাসা করলোনাটক থেকে এলেন? কেমন হচ্ছে নাটক? হচ্ছেই তো, বলে নয়নতারা পাশ কাটালো।
পুরোহিতের ঈষৎ প্রকাশিত মন্ত্রোচ্চারণ দ্রুততর হয়েছে এখন, যেন তা শব্দ ঝংকারের নেশা। মাঝে মাঝে দ্রুত লয়ে ঢাক বেজে উঠছে কিছুক্ষণের জন্য। রাত বেশি হলে তা অনুভূতিতে ধরা পড়ে।
আসল কথা, সারা রাজবাড়ি জুড়ে যে আলো ছিলো তা এখন মৃদু হয়ে আসছে। আলো এখানেও কোমল। সেজন্য বোধহয় স্ত্রীলোকদের ভিড় কচিৎ ঝিকমিক করছে। নয়নতারার মনে নিজের জড়োয়র কণ্ঠীর কথা উঠলো। সেই কবে সেটা রানীমা দিয়েছিলেন নিজে হাতে তুলে।
আলোর দিকে আবার চোখ পড়লো তার। হ্যাঁ, উৎসবই তো। নয়নতারা কিছুক্ষণ যেন এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসায় ব্যস্ত রইলো যে মশালচিরা আন্দাজ করতে পারে কতটুকু তেলে আলোগুলো কতক্ষণ জ্বলবে, ফলে একবার জ্বেলে দেওয়ার পরে আলোগুলোকে আর উস্কে দেওয়ার দরকার হয় না।
উস্কে দিতে গিয়ে প্রদীপটা নিবে গিয়েছিলো। …কিন্তু তখন অনেক রাত হবে। দরজা খুলে অন্ধকারে রাজকুমারকে দেখে সে অবাক হয়ে গিয়েছিলো। রাজকুমারের চোখ দুটো আয়ত। কোথা থেকে একটা মদির সুঘ্রাণ উঠছে। সে নিজে বলতে পেরেছিল শুধু বসো, রাজকুমার, আমি আসছি। ফিরতে একটু দেরিই হয়েছিলো তার। ফিরে সে দেখেছিলো, রাজু তার বিছানাতে ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশ্চিন্ত ঘুমের নিশ্বাসে বুক ওঠা-পড়া করছে। একটু কি হেসেছিলো তখন সে? আর-একটু গাঢ় হোক ঘুম বোধ হয় এই ভেবে সে প্রদীপের সামনে বসে ছিলো। তখন প্রদীপটা উস্কে দিতে গিয়ে নিবিয়ে ফেলেছিলো। বিছানায় গিয়ে রাজকুমারের অধিকার করা বালিশের কোণে মাথা রেখে সেও দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলো। কী অবুঝ, কী কিশোর, রাজকুমার!
ঢং করে একটা শব্দ হলো। তবে একটা মৃদু প্রতিধ্বনিও উঠলো। রাত একটা হলো পেটাঘড়িতে। কে একজন পানের অভাব অনুভব করলো। পান তখনো নিশ্চয় অনেক থাকতে পারে কিন্তু ততটা রাতে কে আনবে তা জোগাড় করে?
কিন্তু নবকুমার সব জায়গাতেই থাকে। নয়নতারা উঠে দাঁড়িয়ে বললো–দেখছি।
দরবার-হলের পিছন দিকের একটা ঘরেই পান সাজা হচ্ছিলো। আর সেদিকটা, যেন হঠাৎ লক্ষ্য করলো নয়নতারা, যেন জনশূন্য হয়ে এসেছে। ছিঃ নয়নতারা!
নাটক আর পূজার আকর্ষণ তখন দাসদাসীদেরও টেনে নিয়েছে। তা বলে একেবারেই কেউ নেই এমন নয়। দূরে বাঁধানো উঠোনের একপাশে একজন এখনই বঁটা নিয়ে ব্যস্ত। ওদিকের দালানের খিলানের থামের পাশে আর একজন প্রদীপের আলোয় সলতে পাকাচ্ছে, যদি দরকার হয়। পান সাজার ঘরের ঝাড়লণ্ঠনের বেশ কয়েকটা শাখা নিবে গিয়েছে। পানের সরঞ্জামের সামনে একজন দাসী বটে। আলো যেখানে লালমেঝেতে পড়ার ফলে রঙিন, সেখানে দাসীটি পা ছড়িয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে ঘুমোচ্ছে। দরজার কাছে নয়নতারা বললো–শুনছো, ওরা পান চাইছে।
কথটা বলে নয়নতারা সরে এলো। তার ঠোঁট দুটিতে একটা হাসির ভাব ফুটলো। অনেকের ঘুমের ভঙ্গি হাস্যকর।
পূজার দিকটায় গুমোট, এদিকে বরং বাতাস চলছে। খিলান ধরে রাখা থামের আড়ালে টানা দালান, কিন্তু ওখানে পথটা মোড় নিয়েছে দুই দেয়ালের জোড়ে। আর জোড়ের কাছেই দেয়াল। সিঁড়িটা সন্ধ্যার মতো না-হলেও এখনো উজ্জ্বল–যেন খানিকটা জায়গায় দুধ ঢালা। এপারে ওপারে আলো কম। মাঝখানে ওটা যেন স্রোতের ব্যবধান। সাবধানে পার হতে হবে। ঝটিতি আলোটুকু পার হলো নয়নতারা। কিন্তু কোথায়?
