হরদয়াল থেমে দাঁড়ালো। হাসিমুখে বললো–গুডনাইট! একটা ভালো ডিনারের জন্য এক নিঃসঙ্গ মানুষের ধন্যবাদ নিন।
একবার বাগচী ফিরে দেখলো, হরদয়াল যেন দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হরদয়ালের অজ্ঞাতসারে তার গতিবিধি লক্ষ্য করা ভালো হবে না মনে করে তারা হাঁটতে লাগলো।
কেট বললো–আশ্চর্য নয়, এই মানুষ, যাকে লোকে বাঘের মতো ভয় পায়, কত কাছে আসতে পারেন অবলীলায়!
বাগচী বললো–কিন্তু, কেট, ওটা কী দেওয়ানজির আদেশ–ওই চাকরিটা নেওয়া?
কেট ব্যাপারটার এরকম ব্যাখ্যা আশা করেনি। সে বিস্মিত হয়ে বললো–তাই মনে করো?
-দেওয়ানজি বলছিলেন রানীমা আমাকে দেখেই পদটির কথা চিন্তা করেছেন।
কেট হাই তুলো। বললো–কিন্তু ওটা কী কথা হলো পিউরিটান সম্বন্ধে?
বাগচী বললো–এরকম কথা আছে বটে। পিউরিটানরা টাকা ধার দিতে আপত্তি করেন! আধ পয়সা সুদ মাপ করাকে দলিলকে সুতরাং সত্যকে অবজ্ঞা করা মনে করেন। বলা হয়, ইংল্যান্ডের ক্যাপিটালের অনেকটা এইসব পিউরিটানের সঞ্চয়।
হরদয়াল চলতে শুরু করে পথচারীদের এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করতে লাগলো। পথচারীরা তাকে চিনতে পারলে কথা বলতে চাইবে, যা তার এখন ভালো লাগবে না।
সে রাজবাড়ির হাতায় পৌঁছালো। সদরদরজা দিয়ে খানিকটা গিয়ে পরে তার কুঠিতে যাওয়ার পথ। সে এক মুহূর্ত যেন দ্বিধা করলো কোনদিকে যাবে। আতসবাজি শেষ হয়েছে, রাজবাড়ির দেয়ালের আলোগুলোও এখন স্তিমিত। তার মন যেন একটা সুখ ও একটা নিরানন্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়লো। সে নিজেকে শোনালো; কীটসই তো। এতক্ষণ তো কীটই মনে ছিলো। সে হিম ও পরিপক্ক ফলে আনত ঋতু। সেই হেমন্তের কবিতা! মনে মনে কবিতাটা আবৃত্তি করাতে গিয়ে শেষের দিকে পৌঁছে তার মন উদাস হয়ে গেলো।
সে নিজের বাংলোর দিকে চলতে চলতে ভাবলো, সে এখন তার লাইব্রেরিতে যেতে পারে। তার আর কিছুই করার নেই। বলতে পারা যায় সেই প্রথমবারের পর থেকে তার কাজ কমে যাচ্ছিলো। তাহলেও গতবারেও নায়েবমশায় কী হবে কী হবে না তা নিয়ে আলাপ করেছিলো! এবার…প্রথমবার সেই উৎসবে দেওয়ান কুঠিরই যথেষ্ট গুরুত্ব ছিলো। সেই বাঈজীনাচ যা থেকে উঠে গিয়ে পিয়েত্রো বাঘে-বলদে একঘাটে জল খাওয়ানোর কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছিলো, দেখো স্ত্রীলোক নিয়ে নাচের আসরে গোল না-হয়। ডানকান ও সদরওয়ালা ডেপুটি দুইয়েরই তখন মদে বেসামাল অবস্থা। সেই রাতেও তার নিঃসঙ্গ মনে হয়েছিলো নিজেকে, কিন্তু পরমুহূর্তেই কর্তব্যের অনেক কোলাহল তার চারিদিকে কৌশল, মন্ত্রণা, ভবিষ্যৎদৃষ্টি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলো।
হরদয়াল তার বসবার ঘরে বসলো। চিন্তার খেই তুলে নিলো একটা। তো, বাগচীকে কিন্তু রাজবাড়ির কাছাকাছি আনলেও বলা যাবে না এই উৎসবটা প্রকৃতপক্ষে সেই একটা ঘটনার উপরে পর্দা টেনে দেওয়া। যেন কিছুই হয়নি বোঝাতে ডানকানকে নিমন্ত্রণ করা। তদন্তে এসেছে এমন সদরওয়ালাকে বিভ্রান্ত করা। বাগচীকে বলা যাবে না রানীর জন্ম বৈশাখে বলেই তার এক নাম বিশখা।
হরদয়াল জামা জুতা খুললো। তৃষ্ণা পেয়েছে তার। ডিনারে মদটা ভালো ছিলো। আর্মেনিটা এই এক ব্যাপারে ঠকায় না। সে উঠে টেবিল থেকে পোর্টের অর্ধসমাপ্ত বোতলটা এবং একটা নতুন গ্লাস নিয়ে ফিরলো। এখন পোর্টই। কলকাতায় এ রকম প্রবাদ, পোর্ট হজমের সাহায্য করে। আবার কলকাতা থেকেই বন্ধু লিখেছে মদ্যপান নিবারণের কথা, যা হয়তো এ মাসের শেষ আধুনিক কথা। ঠোঁটে সেই গাঢ় রঙের মদ তুলে হরদয়াল মনে মনে হাসলো। একেই কী বলে সভ্যতার ফল নাকি? সেনাটকে মদ্যপানকে ধিক্কার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন এই, মাইকেল ডাটু মদ ছেড়েছেন কি?
গ্লাসটা শেষ করেও তৃষ্ণা না-মেটায় সে ভাবলো : বোধ হয় বাতাসে যাওয়া আরামের হবে। সে নিজেকে মৃদু ঠাট্টা করে মৃদু হেসে ভাবলো–এত রাতে কীটস আর অট হয় না!
শোবার ঘরে গিয়ে জামাজোড়া খুলে চটি পরে চাদর গায়ে দিতে গিয়ে হাতের সামনে যে শাল পেলো তাই পরে পায়চারির ভঙ্গিতে কুঠি থেকে বার হলো। বাইরের আলো শালে পড়ায় সে ভাবলো, এটা কেন? ভৃত্যদের কাজ। বালাপোষ সরিয়ে তার জায়গায় নতুন কোনো শাল রেখেছে।
আলো অনেক স্তিমিত, তাহলেও এখনো যথেষ্ট, এখনো মানুষজন চলেছে। সদরের পেটা ঘড়িতে বারোটা বাজলো।
শালটা এমারেল্ড রঙের, মহামূল্য তাতে সন্দেহ কী! য্যাকব নিজেই বলেছিলো। আজ সকালের কথাই তো। য্যাকব তার পুটুলি নিয়ে এসে খুলে শালটা বার করে বলেছিলো, এটা, সার, আপনার জন্য। হরদয়াল বলেছিলো, রাখো, রাখো। যা আছে তা পরি কখন? তখন য্যাকব বলেছিলো, রানীমা নিজে পছন্দ করে এটা আপনার জন্য পাঠিয়েছেন। আমার শুধু পৌঁছে দেওয়া।
রাজবাড়ির সেই একটা খিলান বিশেষ আলোকিত। সেখানে কয়েকজন ব্যস্ত সমস্ত দাসদাসীকেও দেখা যাচ্ছে। থিয়েটারের চত্বর পার হয়ে সে পূজামণ্ডপের খিলানটার দিকে গেলো।
আসলে তো মন্দির নয়। রাজবাড়ির অন্দরে ঘোড়া ও পালকি ঢোকার পথ। তারই পাশের দালানে রদবদল করে, দেয়াল তুলে, রেলিং-এ ঘিরে পূজার জায়গা করা হয়েছিলো। প্রথম বার এত আলো ছিলো না। কিন্তু আন্তরিকতা কি বেশি ছিলো? রাজকুমারের বিপদমুক্তির দরুন কৃতজ্ঞতা জানানোর ব্যাকুলতাও ছিলো।
হঠাৎ হরদয়াল স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। চিন্তাটা কোথা থেকে উঠলো ভেবে পেলো না। কিন্তু তা তার মনকে বিবশ করে দিলো। কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হলে সে বরখাস্তই হয়। রানী তাকে দেওয়ান পদ থেকে বরখাস্ত করেছিলেন, কিন্তু বিতাড়িত করেননি। কুঠিতে থাকতে দিয়েছেন, তার স্কুলে টাকা দিচ্ছেন, লাইব্রেরির বই কেনার খরচ দিয়ে চলেছেন, সে কি এজন্যই যে রাজকুমারের সেই অপরাধের সংবাদ সে জানে? যে বিবেক সেবার সে বিসর্জন দিয়েছিলো রাজকুমারকে রক্ষা করতে, যার মৃত দেহটাকে যেন সে টেনে চলেছে, তা যেন তাকে অস্থির করে তুলো।
