হরদয়াল একটু ইতস্তত করে বললো–কথাটা পরে বলবো ভেবেছিলাম, কিন্তু উঠে পড়লো। কিছু মনে যদি না করেন, বলি। প্রকৃতপক্ষে যা বলতে যাচ্ছি তাতে আমার লোকসান, গ্রামেরও ক্ষতি। কিন্তু রানী যেদিন প্রথম এ কথাটা তুলেছিলেন তখন, আমার ধারণা, তার চোখের সামনে আপনি ছিলেন।
বাগচী বলোনা না, এ আপনি কী বলছেন? ইংরেজিতে না-হয় দক্ষতা হয়েছে, আর তা ইংরেজ পরিবারে ত্রিশ বছর কাটিয়ে। কিন্তু অন্য গুণগুলো?
হরদয়াল বললো–আমি আপনাকে এত রাতে মত দিতে বলছিনা, কিন্তু ব্যাপারটা শুনুন। নায়েবমশায় এই এস্টেটে পঞ্চাশ বছর কাজ করছেন। বয়স সত্তর হয়। নিজেকে ক্লান্ত বলছেন। এ অবস্থায় রানীমা একজন কর্মচারীকে সেই পদের উপযুক্ত করে ট্রেনিং দিয়ে নিতে চান। এই প্রাইভেট সেক্রেটারির পদটা একটা স্টেপিং স্টোন। রানীর কথা শুনে আমিও ভেবেছি। স্কুলটার সর্বময় কর্তৃত্ব আপনারই থাকবে। হয়তো হেডমাস্টার অন্য কেউ হবে। আপনি কিউরেটর রূপে থাকতে পারেন। আমার মনে হয়, প্রাইভেট সেক্রেটারির কাজ এক্ষেত্রে রাজকুমারকে কিছুটা পরামর্শ দেওয়াও বটে।
–কিন্তু রাজবাড়ির ব্যাপার। বাগচী বললো, আমি তো বুঝতেই পারছি না।
হরদয়াল বললো–এটা এমন নয় যে আমরা খাওয়া থামাবো। মিসেস বাগচী, এরপরে আমাদের কী দেবেন?
আমার মনে হয়, আপনি যে রাজকুমারের সঙ্গে আজকাল সন্ধ্যায় গল্পগাছা করেন তা রানী জানেন, আর তা থেকেই আপনাকে নিয়োগ করার কথা রানীর মনে হয়েছে।
হরদয়াল নতুন একটা খালি প্লেট সেকেন্ড কোর্স নেওয়ার জন্য কেটের সামনে বাড়িয়ে ধরলো। বললো–এবার যদি বিরিয়ানি দেন আমি মাছভাজা চাইব। বাগচী সাহেব যদি মাংস নেন আমার আপত্তি নেই। এই বলে সে হাসলো। প্লেটটা নিজের সামনে নামিয়ে নিয়ে মাছের ফর্ক খুঁজে নিয়ে সে খেতে আরম্ভ করে বললো– আবার, এমন হতে পারে, মশাই, রানী লক্ষ্য করেছেন সেই সব আসবে আপনি মদ খান বটে, কিন্তু তা সন্ধ্যার ঠোঁট ভিজানোমাত্র। পাইপ টানেন, তা কদাচিৎ।
বাগচীর মুখে আশঙ্কার চিহ্ন দেখা দিলো। তার উপরে নজর রাখা হচ্ছে এরকম ভেবে সে বিপন্ন বোধ করলো। হরদয়াল হেসে বললো–না, সে রকম নয়। আমাদের সকলকেই এমনভাবে দেখে নেওয়া হয়েছে। শুনেছি। নায়েবমশায় তখন আমিন যখন রানীমার হাতে এস্টেট আসে। বিচার করে তাকে নায়েব-ই-রিয়াসৎ করেছেন।
হেসে বাগচী বললো–দেওয়ানজি, আর কিছু না-হোক, রাজবাড়ির এই একটা ধরন আমার জানা হলো।
হরদয়ালও হেসে উঠলো।
.
০৬.
ডিনার ও ওয়াইন শেষ করে তারা বাইরে এলে হরদয়াল জানতে চাইলে বাগচী আর একবার থিয়েটারের দিকে যেতে চায় কিনা। ঘড়ি দেখে বাগচী বললো– রাত এগারোটা হতে চলে।
তারা সদরদরজার কাছে এসেছিলো। তখনো সেখানে বেশ লোকজন, পালকি, গোরুগাড়ি। বোধ হয় নিমন্ত্রিতরা ফিরে যেতে শুরু করেছে।
হরদয়াল হেসে বললো–রাজবাড়ির আমরা আজ কেউই ঘুমবো না। আপনাদের সঙ্গে খানিকটা চলি।
তারা পথে চলতে শুরু করলে কেট বললো–এঁরা এত রাতে ফিরছেন, পথে বিপদ হতে পারে না?
সম্ভাবনা কম, বললো– হরদয়াল। যতদূর জানি নতুন ঠগী-ঠ্যাঙাড়ের দল তৈরী হয়নি আর।
বাগচী বললো– শ্লীম্যানের কথা বলছেন? এখানে তা হলে ঠগী-ঠ্যাঙাড়ে ছিলো?
হরদয়াল কথাটা বলার আগে হাসলো, একটু দ্বিধা করে বললো–না। বছর চল্লিশ আগেকার কথা। আমদের নায়েবমশায় তখন তশীলদার। তখনকার রাজার হুকুমে বরকন্দাজ নিয়ে পথে নেমেছিলো। লোকে বলে দুই সপ্তাহে দশ দিনে পঞ্চাশজনকে মাটিতে পুঁতে দিয়েছিলো যাদের কিছু তখনো জীবন্ত।
কেট বললো– কী সাংঘাতিক! এই নায়েবমশায়?
বাগচীও চমকে উঠেছিলো। বললো–বটে? না, সে ভদ্রলোক তো হিসাবমতো বছর ত্রিশের একজন তখন। কিন্তু সে-ও ভাবলো, এখন সেই দুর্দম বৈর কি বয়সে নিশ্চিন্ত? হোক ঠ্যাঙাড়ে-ঠগী, তাহলেও সেভাবে বিনা বিচারে শেষ শাস্তি দেয় অতগুলো মানুষকে? সেই নৃশংসভাবে? কিন্তু এটা তো আজকের আবহাওয়া নয়। সে বরং প্রাচীরের উপর দিয়ে আলোয় উজ্জ্বল রাজবাড়ির দিকে লক্ষ্য করে বললো–অনেক খরচ হবে, কী বলেন?
শীতের রাত এগারোটা। অন্ধকার তো বটেই, বাতাসেরও কামড় আছে। সে রাতে উপরন্তু ধোঁয়ানো মশাল ছিলো পথের উপরে এখানে ওখানে। একটা-দুটো ছুটে চলা পালকি, কোথাও কাঁচকোচ শব্দ তুলে গোরুগাড়ি। পায়ে হেঁটে চাঁদরে মাথা মুড়ে পথচারী। অনভিজ্ঞ বাগচী-দম্পতির কাছে কখনো বা স্বপ্নে দেখা এমনই বোধ হতে লাগলো।
হরদয়াল হেসে বললো–আমাদের রানীর এই এক বদনাম আছে, তিনি কৃপণ। কাজেই এ ব্যাপারে হাজার পঞ্চাশের বেশি খরচ হতে দেবে না নায়েবমশায়। হরদয়াল রানীকে কৃপণ বলে বোধহয় মজা পেলো। সে বললো–আপনাকে একটা ব্যাপার বলতে পারি। রানী কয়েকটি ব্যাপারে প্রোটেস্টান্ট কিংবা পিউরিটানদের মতো যেমন নিজের খাওয়াদাওয়া, পূজাটুজা, যেমন টাকা জমানো। আপনি শুনলে অবাক হবেন, জমিদারীর লভ্যাংশের শতকরা প্রায় চল্লিশ দিয়ে প্রতি বছর, বছরে দুবার করে স্টক ইত্যাদি কেনা হয়। রেলের স্টক, কয়লাখাদের ডিবেঞ্চার, বিশেষ কম্পানির কাগজ।
তারা স্কুলবাড়ির কাছাকাছি এসে পড়েছিলো। বাগচী এবার বললো–দেওয়ানজি, আপনার অনুগ্রহের জন্য ধন্যবাদ। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। আপনি কুঠিতে ফিরুন।
