হরদয়াল বললো–ওটা কিন্তু পাণ্ডুলিপিতে আছে। কলকাতায় পেয়ে নকল করে রেখেছিলাম।
-আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, সেই প্রবন্ধের কি এই উদ্দেশ্য যে সেই ইংরেজ জমিদাররা স্থায়ীভাবে এদেশে বসবাস করলে এ দেশের টাকা এ দেশেই থাকবে, নাকি জ্ঞান বজ্ঞানের প্রসার, ইনডাস্ট্রির প্রসার, এসবের আশাও করেছিলেন।
হরদয়াল বললো–আবার তাহলে পড়তে হবে। যতদূর মনে পড়ে সেসব ছাড়াও ধর্ম এবং সংস্কৃতির কথাও ছিলো। বোধ হয় সংস্কৃতির বিনিময়ও। কিন্তু বিশ বছর আগেকার মত, রাজা কি বর্তমানে মত পরিবর্তন করতেন না? হরদয়াল হাসলো। কিন্তু তার ক্রুর কাছে গাম্ভীর্যও দেখা দিলো। সে ভাবলো, যেমন আজ ডানকানরা এলো না। সে বললো– কলকাতায় কিন্তু এটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে ৫৭-৫৮র সেই সব ব্যাপারের পরে ইংল্যান্ডের। লোকেরা দূরে দূরে সরবে।
আলাপটা এগোলো না। টেবিল পাতা হয়েছে এই খবর জানালো হরদয়ালের ভৃত্য। অপেক্ষাকৃত ছোটো টেবিলে প্রকাণ্ড উজ্জ্বল হারিকেন ঘিরে তিনজনের ডিনার। বসা হলে হরদয়াল বললো–এক কাজ করলে হয়; আমাদের খাবারগুলো দিয়ে ওরা যদি চলে যায়, মসেস বাগচীতবে ফ্যামিলি ডিনারের মতো আমাদের সার্ভ করতে পারেন। বেশ ইনফর্মাল হয়।
কেট বললো–নিশ্চয়, সে তো খুব ভালোই হবে।
ভৃত্য ও বাবুর্চি দুজনে সার্ভ করবে স্থির ছিলো। হরদয়াল তাদের ডেকে বললো–তোমরা। কোর্স কটিকে একইসঙ্গে টেবিলে রাখো। মেমসাহেব ব্যবস্থা করবেন। তাছাড়া তোমরা তো এতক্ষণ বেরোতে পারোনি, এবার একটু ঘুরেফিরে আনন্দ করো।
তারা ব্যাপারটাকে আদেশ মনে করেই টেবিল সাজিয়ে দিয়ে চলে গেলে কেটের অসুবিধা হলো। সুপটাকে বোঝা যায়। মাছ ভাজা, মাংসের কারিকে বোঝা যাচ্ছে। লুচি নম্বন্ধেও কিছু জ্ঞান আছে তার। কিন্তু দুটো সুদৃশ্য পাত্রে দুরকমের পোলাও দেখে সে বিব্রত হলো। কোনটা কোন কোর্সে চলবে, কোনটির পরে কোনটি–এটা তাকে চিন্তিত করলো।
তখন হরদয়াল বললো–হোস্টেসের রুচিই আমাদের রুচি।
বাগচী বললো– হাসতে হাসতে-দেখ কেট, বই বাছাই-এর ব্যাপারে দেওয়ানজির রুচির কথা তুলেছিলাম, এবার কিন্তু
সুপের সঙ্গে সঙ্গে রুচির কথাকেই ফিরিয়ে আনলো হরদয়াল। বললো, বলার আগে ভাবলো, যেন নিজের মনের দিকে চেয়ে কিছু অনুভব করার চেষ্টা করলো, তাকে সলজ্জ দেখলো। -আচ্ছা, মিস্টার বাগচী, আপনার কি কখনো এমন হয়েছে যে আপনার ফেভারিট কোনো কবির চাইতে সেদিন অন্য কবিকে ভালো লাগছে।
একটু বুঝিয়ে বলুন।
মনে করুন শেলীর তুলনায় কীটস।
কীটস নিশ্চয়ই বড়ো কবি। বিশেষ কোনো মনের অবস্থায় কাউকে আরো ভালো লাগে যদি অন্যায় কী?
হরদয়াল ভাবলো, তার চিন্তাটা স্বচ্ছ হলো না। সে টেবিলে মন ফেরালো।
কিন্তু কেট মুশকিলে পড়লো। সে নিজে ভেবে ঠিক করতে না-পেরে হরদয়ালকে জিজ্ঞাসা করলো নিরামিষ পোলাও যদি আগে দিই তার সঙ্গে কী দেবো, মাছভাজা কী?
হরদয়াল বললো–সে আর কঠিন কী? কিন্তু সে থমকে যেন মনে করার চেষ্টা করলো। পরে বললো–আমার মনে হয়, সেবার রাজবাড়িতে নিরামিষ দোলমা দিয়ে খেয়েছিলাম। মাছ খেলে সুগন্ধ নষ্ট।
বাগচী হেসে উঠে বললো–দেওয়ানজি, খাওয়ার ব্যাপারে স্মৃতিতে নির্ভর করা সবসময়ে ভালো নয়। তোমার মনে পড়ে, কেট?
কেট বললো–গুড গড, এ কি সে রকম হতে যাচ্ছে নাকি? সে যেন কী? ও, বড়ি! বড়ি
হরদয়াল বললো– কী রকম?
কেট বললো–হরিবল্। সেদিন হেডমাস্টারের খেয়াল হলো নতুন লাঞ্চ খাবে। বোধ হয় ডালের সেই কোণগুলো যাকে বললো– বড়ি। বললো, কিছু করতে হবে না, চাল আর এগুলো একসঙ্গে সিদ্ধ করলে সুগন্ধে ঘরসুদ্ধ ভরে যাবে। বড়োজোর খাওয়ার আগে তেল দিয়ে নিও।
কৌতুক বোধ করে হরদয়াল বললো–আচ্ছা!
কেট বললো–সে কি খেতে পারা যায়? হরিব, স্ট্রেঞ্জ!
বাগচী বললো– কী জানি সে রকম কেন হলো! অথচ আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার সেই সাত-আট বছরে এটা ছিল একটা ট্রিট। আমার মনে হয় কিছু একটা মা দিতেন যা আমরা না-জানায় দিতে পারিনি। অবশ্য তখন আমরা খুবই গরীব ছিলাম।
কেট বললো– হেসে-সে জিনিসটার নাম নস্ট্যালজিয়া।
হরদয়াল বললো–ওইসব ভালো লাগা হয়তো বড়ো হলে চলে যায়, তখন স্মৃতিটা থাকে। এ বিষয়ে একটা প্রমাণ দিতে পারি। আমাদের রাজকুমার সবরকমই খান। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি সেদিনও, তিনি উত্তেজিত, বিরক্ত, খুব মন খারাপ করে থাকলে রানী একটা সহজ কৌশল করেন। বলেন, স্নান করে আয়, আমার সঙ্গে খাবি। সে কিন্তু নিরামিষ আর খুবই অল্প আয়োজনের। হরদয়াল হাসলো।
তখনো আতসবাজি শেষ হয়নি, কিংবা সেটা হয়তো শেষ হাউই-গোছার একটি। তার আলো কোনো জানলা দিয়ে টেবিলে এসে পড়লো। সে আলোটা সরে গেলে হরদয়াল নতুন আলাপ খুঁজে নিলো। বললো–মিস্টার বাগচী, নায়েবমশায় থিয়েটারে বলছিলেন তা কি শুনেছিলেন?
–আপনাদের বেতন বৃদ্ধির একটা ব্যাপার ছিলো।
-হ্যাঁ, সেই সময়ের কথাই। সেই নতুন দুটি পদ তৈরীর কথা। দুটির মধ্যে একটি বোধ হয় ধর্ম সম্বন্ধে-দেবত্র আর ওয়াকফ। অন্যটি রাজকুমারের প্রাইভেট সেক্রেটারি।
বাগচী বললো–হ্যাঁ, শুনেছিলাম। রাজবাড়িকে ভালোবাসবে, তার ধরন-ধারণ জানবে, ইংরেজিতে দক্ষ এবং বিশেষ সচ্চরিত্র হতে হবে। ইংরেজিতে দক্ষ মানুষ আজকাল কলকাতায় পাওয়া যায়, সচ্চরিত্র কথাটার ব্যাখ্যা নিয়ে গোলমাল আছে বটে, তবে বোঝা যায় কী বলা হচ্ছে। সে রকম পাওয়া একটু কঠিন। কিন্তু রাজবাড়িকে আপন মনে করবে, তার ধরন-ধারণ জানবে সে-লোক এ গ্রামের বাইরে কোথায়?
