কখনো মানুষকে অটল গাম্ভীর্য নিয়ে থাকতে হয়। গড়গড়ার ধোঁয়ার আড়ালে নায়েব মশায় যেন কোন গোপন ব্যথায় পীড়িত। হরদয়াল মাঝে মাঝে মুখের উপরে হাত রাখছে, তাতে তার ঠোঁট দুটি আর চিবুক ঢাকা পড়ছে। বাগচী কিছু অনভিজ্ঞ। সে পাইপ কামড়াচ্ছে বটে, কিন্তু কি তার পাইপ, কি তার দাড়ি তার চোরাহাসি গোপন করতে পারছে না।
একবার সাধারণ দর্শকরা হো হো করে হেসে উঠলো। এতক্ষণ যে মোটামুটি ভালো পার্ট করছিলো, সম্ভবত লমোহরার গৌরী, সে ভুল পথে তার যেখানে আদৌ থাকা উচিত নয়, সেখানে এসে এক দারুণ বিপত্তি সৃষ্টি করে দুম দুম করে পালালো। তৎক্ষণাৎ সিন। পড়লো এবং দারুণভাবে বাজনা বেজে উঠলো।
কেট পিছন ফিরে দর্শকদের হাসিটাকে লক্ষ্য করলো যেন। কিন্তু বললো–জমিদার দেখছি অত্যন্ত প্রজাপীড়ক এবং নীতিহীন, রায়তরা ক্ষেপে না যায়। বাগচী হাসতে হাসতে বললো–নিয়োগীমশায় দেখলে ভালো করতেন। তাঁর সাসপেনশন অব ডিসবিলিফ নিয়ে ভয় রইতো না।
কিন্তু নায়েবমশায় যেন এই সুযোগের অপেক্ষা করছিলো। বললো–বুড়োমানুষ তো। একভাবে এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকা কষ্টের। আপনারা বসুন। ওদিকে দেখি ঠিক চলছে কিনা।
হরদয়াল বললো–আপনাকে বলা হয়নি। মিস্টার ও মিসেস বাগচীকে জলযোগের বদলে আমার সঙ্গে রাতের খাওয়া সারতে বলেছি।
বাঃ বেশ, অতি উত্তম করেছেন। বলে নায়েব উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু যেতে গিয়ে বোধ হয় কিছু দরকারি কথা মনে পড়লো। বললো–রানীমার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো নাকি? বিকেলের দিকে খুঁজছিলেন আপনাকে, পরে বললেন, থাক আজ।
-বাইরে গিয়েছিলাম একটু। বললো– হরদয়াল।
-এবারের উৎসবের উপহার শুনেছেন? এবার কিন্তু বেতন বেড়ে যাচ্ছে না। বলেছেন, সব কর্মচারীকে বারো দিনের বেতন অতিরিক্ত এককালীন দেওয়া হবে। আদায় ভালো হয়নি, তাই সারা বছরের এবং ভবিষ্যতের জন্য বেতনবৃদ্ধি নাকচ করেছেন।
–কিন্তু বর্তমানে তো নগদ বেশি যাবে। হরদয়াল বললো।
-তা হবে। এবার দুটো নতুন পদ সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের মধ্যে একটি রাজকুমারের ব্যক্তিগত পরামর্শদাতার। বললেন, সে বিষয়ে আপনার সঙ্গে আগেই আলাপ হয়েছে। এই পদে উনি এমন একজনকে চান যিনি রাজবাড়ির ধরন-ধারণ বোঝেন, রাজকুমারকে ভালোবাসতে পারবেন, নিজে বিশেষ সচ্চরিত্র হবেন, অথচ ইংরেজিতে ভালো।
হরদয়াল বললো–এমনটি রানী কিছুদিন থেকে ভাবছেন। সেরকম একটি মানুষ পেতে হবে তো।
–দেখা যাক। বলে নায়েব চলতে শুরু করলো।
হরদয়াল ঘড়ি বার করে বললো–সে কী, পৌনে নয় হচ্ছে। আসুন মিস্টার বাগচী, এই সুযোগে আমরাও উঠি। ডিনার জুড়োতে দিলে হবে না।
.
০৫.
দেওয়ানকুঠি রাজবাড়ির প্রাচীরের মধ্যেই, সুতরাং তারও কিছু আলোকসজ্জা আছে। যদিও তা অন্যান্য অংশ থেকে স্তিমিত। আলো দেওয়ার কৌশলে কুঠির স্থাপত্য-সৌন্দর্যকেই শুধু প্রকাশ করা হয়েছে। বাগচী দম্পতিকে নিয়ে সেদিকে যেতে যেতে হরদয়ালের মন প্রথম উৎসবের দিকে ফিরে গেলো। তখন সে-ই দেওয়ান। আর গোটা উৎসবটা ছিলো তার ফরমায়েশ মতো। সেবার এতক্ষণে কুঠির হলঘরে সারেঙ্গী, পাখোয়াজ বাজছে, বাঈজী। নাচছে। ডানকান মদের ঘোরে বোকার মতো হাসছে, বাইজীদের সম্বন্ধে উত্তেজনা গোপন করতে পারছে না। শেষে পিয়েত্রো বলেছিলো তুমি বাঘে বলদে একঘাটে জল খাওয়ালে, হে দেওয়ান।
তারা দেওয়ানকুঠির সিঁড়িতে পা রাখতে হরদয়ালের ভৃত্য পর্দা টেনে ধরে দাঁড়ালো। এটা হয়তো হরদয়ালের পছন্দ যে ভিতরের ও বাইরের আলো এরকম নয়। এটা তার বসবার ঘর যেখানে টিপয়ে রাখা একটা হারিকেনমাত্র স্তিমিত আলো দিচ্ছে। কিন্তু বসবার ঘরে না বসে সে তার লাইব্রেরিতে গেলো। সেখানে জলচৌকির উপরে ঢোলক আকৃতি চকচকে কাঁচের ডোমে উজ্জ্বল মোমের শামাদান। জলচৌকির কাছাকাছি কয়েকটা সোফা, হরদয়ালের নিজের আরামকেদারা।
হরদয়াল বললো–মিস্টার বাগচী, ওরা টেবিল পাততে পাততে ক্ষুধা বাড়াতে একটু চলবে কি? বাগচী কিছু বলার আগে হরদয়াল নিজেই ওয়াইনের বোতল আর গ্লাস নিয়ে এলো। সে তিনটি গ্লাসে ঢাললো। কিন্তু কেট বললো–আমি এ রকম কখনোই খাই না। আপনারা খান। আমি বরং আপনার লাইব্রেরি দেখি। আগে যেমন দেখেছিলাম তার চাইতে বই আর শেলফ দুই-ই বেড়েছে মনে হচ্ছে। সে দেয়াল বরাবর সাজানো শেলফগুলোর দিকে হাঁটতে শুরু করলো। সুতরাং গ্লাস হাতে বাগচী এবং হরদয়াল তাকে অনুসরণ করলো। কেট একবার বললো–দেওয়ানজিকে কিন্তু এই লাইব্রেরিতে না-ঢুকলে বোঝা যায় না।
বিব্রত হরদয়াল বললো–না না, এ সবই রানীর আনুকূল্যে।
বাগচী বললো–কিন্তু বই বাছাই করার রুচি?
হরদয়াল তা সত্ত্বেও বললো–বই আর এত কোথায় আসছে এদেশে যে বাছাই করা হবে। যা পাওয়া যায় তাই কিনে ফেলা হয়।
কেট বললো–বই-এর জন্য টাকা খরচ কিন্তু সংস্কৃতির একটা প্রমাণ।
তারা ঘরের মাঝামাঝি একত্র হলে বাগচী ভাবলো, কালচার, ও হ্যাঁ, কালচার। সে বললো–দেওয়ানজি, রামমোহন রাজার সব বই কি আপনার আছে?
–আপনার কি বিশেষ কোনোটির কথা মনে পড়েছে?
বাগচী বললো–সেই পার্লামেন্টের উদ্দেশে লেখা প্রবন্ধ।
–কোনটি? সেই রিমারস অন দা কলোনাইজেশন অব ইন্ডিয়া বাই ইউরোপীয়ানস?
-তাই হবে নাম। যেটায় রাজা ইংল্যান্ডের কিছু লোককে জমিদার হিসাবে ভারতে স্থায়ী বসবাস করানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
