তারপর তার টেপির কথা মনে হলো। টেপি তার সঙ্গীটিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে চেয়েছিলো, কিন্তু পরে ব্যাপারটা অন্যরকম হয়েছে। টেপির আজকের সজ্জা অন্যান্য দিনের চাইতে অধিকতর উজ্জ্বল। এ কি কখনো হতে পারে টেপিকেও নিজের হাতে সাজিয়ে দিয়েছে ওই সাহেবটি। সাহেবের মেজাজ তো! সে কি আর টেপির মতো একটি মেয়েকে সাজিয়ে দেয়। যখন মাধাই তাকে জামা পরিয়ে দিয়েছিলো তখন মাধাইয়ের উপস্থিতির ভয়ে সুরতুন ত্রস্ত। এখন মাধাইকে তেমন ভয়ংকর বোধ হলো না। ফলে, সেই জামা পরার ঘটনাটা মনে পড়ে সুরতুনের শরীর থরথর করে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো। মাটিতে যেন পা সোজা হয়ে পড়বে না। সার্কাসের সময়ের অনুভবগুলি জড়িয়ে গেলো এই কাঁপুনির সঙ্গে। টেপির জীবনের কথাও মনে পড়তে লাগলো।
ঘরের কাছে এসে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সুরতুন কী হবেকীহবে এই ভয়ে অস্থির হয়ে ইতিউতি করতে লাগলো। তার সহসা মনে হলো টেপি যেমন ওষুধ কিনেছিলো তেমন কিছু আরও সংগ্রহ করা দরকার। টেপিকে যেমন ওরা সাজায় তেমনি তো সাজিয়েছে মাধাই তাকেও।
মাধাই দরজা খুলে তার চৌকিতে বসে জুতো জামা খুলে বললো, জামা রাখ, একটু জল দে, খাই।
সুরতুন জল গড়িয়ে দিয়ে মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো।
মাধাই বিছানায় শুয়ে বললো, এখন আর কী, ঘুমা গা যা। কাল মনে করিস মাথায় দেওয়ার তেল আনে দেবো। তোরা আমার কেউ না, কিন্তুক তোরা ছাড়াই বা কে আছে আমার।
বাইরের অন্ধকারে জামাকাপড় পাল্টে সুরতুন কোথায় রাখবে বুঝতে না পেরে ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক করছে। সে ভেবেছিলো মাধাই ঘুমিয়ে পড়েছে। মাধাই বললো, রাখ, আমার জামার পাশেই রাখ। কাল তোর জন্যি দড়ির আলনা করে দেবো। কিন্তুক ময়লা হলে চলবি নে।
বিব্রত সুরতুন কিছু না বলে বাইরে চলে গেলো।
পরদিন সকালে সুরতুন ঘর ঝাট দিচ্ছে, মাধাই কলে জল সংগ্রহ করতে গেছে, এমন সময়ে টেপি এলো৷ এদিক ওদিক চেয়ে ফিসফিস করে টেপিবললো, মাধাই কনে?নাই তো? তোমাক একটা কথা বলবের আসলাম।
কও না।
কাল যে-ওষুধ কিনছিলাম তা কৈল কাউকে কবা না, মাধাইকেও না।
কে, কী হলে?
ও বিষ। কাউকে খাওয়ালি সি ঘুমাতেও পারে, মরবেরও পারে।
সব্বোনাশ!
একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়লো টেপির। সে বললো, তা ভাই, তুমি সাক্ষী থাকলা। এই দ্যাখো যতটুক্ কিনছিলা ধরাই আছে। তুমি নিজে হাতে নিয়ে ফেলায়ে দেও।
তুমি ফেলায়ে দেও, তাইলেই হয়। তুমি তো তাক বিষ দিবের চাও নাই।
সুরতুনের ইচ্ছা হলো সে টেপিকে প্রশ্ন করে তার নতুন সঙ্গীটির সম্বন্ধে; কিন্তু কথা সংগ্রহ করতে পারলো না।
এমন সময়ে দু-হাতে দুবালতি জল নিয়ে মাধাই এলো। ঘরে জল রেখে ফিরে এসে বললো, টেপি যে? অনেকদিন পরে আলি।
খুব মিষ্টি হেসে টেপি বললো, আলাম। তুমি ভালো আছো?
তোর মা কনে? বাঁচে আছে?
আছে, চালের কারবার করে না। কাছেই এক গাঁয়ে বসছে।
গাঁয়ে বসে কী করে?
একজন শুনালো। ভাবে মনে হলো মালা বদল করছে কারো সাথে। একটু হেসে টেপি বললো আবার, আমরা বোষ্টম।
নতুন সংসার দেখবের যাবা, কেমন?
না। মনে কয়, দূরে থাকে সেই ভালো। মাকে দেখবের চালেও গাঁজা-খাওয়া বোষ্টমদের সঙ্গে থাকবের পারি নে।
কথাটা কৌতুকের বলে মনে হতে পারে, কিন্তু টেপির বেশভূষা ভঙ্গির দিকে লক্ষ্য করে মাধাইয়ের অনুভব হলো, টেপির যে মা মাথায় গামছা বেঁধে পুরুষদের দলে বসে গাঁজা খেতে খেতে অশ্লীল রসিকতা করতে পারে, টেপির বর্তমান অবস্থা তার থেকে অনেক পৃথক। এমনকী তার এই রেল কোম্পানীর ঘর, হীন অবস্থার কোনো গ্রাম্য চাষীর কুড়ের তুলনায় যত পরিচ্ছন্নই হোক তার পটভূমিকাতেও টেপিকে যেন অসংগতভাবে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। যেন সে অন্য কোনো লোকের অধিবাসী।
মাধাই প্রস্তুত হয়ে এসে বললো, ডিউটিতে যাবো।
টেপি বললো, চলো একসাথে যাই।
খানিকটা দূর চলে মাধাই বললো, তাইলে তুই ভালোই আছিস আজকাল।
তা আছি। তুমি কেমন আছো, দাদা?
মাধাই প্রশ্নের সুরটিতে এবং তার চাইতেও বেশি সম্বোধনটিতে বিস্ময় বোধ করলো। টেপির কথাবার্তায় পরিবর্তন হয়েছে। এর আগে কোনোদিন কারো কাছে এমন সম্বোধন সে শোনেনি।
পথ চলতে চলতে ধীরে ধীরে বললো মাধাই, আমার আর ভালো মন্দ কি আছে? আছি–আছি।
কিন্তু টেপি তো সুরতুন নয়, সে বললো, বিয়ে করা, সংসার করো।
মাধাই রসিকতার সুরে বললো, তুই তাইলে কন্যে খোঁজ।
তা পারি, তুমি কও যদি আমি ভালো লোক দিয়ে কন্যের খোঁজ আনতে পারি।
খানিকটা নীরবে চলে আবার বললো টেপি, স্বজাত বিয়ে করাই ভালো, তা যদি না মানো এক কন্যের খোঁজ আমার আছে। এমন রূপ দেখলে চোখ ফেরা যায় না, কিন্তু বি-যত্নে ছাই ঢাকা।
মাধাই হাসি হাসি মুখে বললো, কেন্ রে, দিগনগরের মিয়ে? যারা চিকন চিকন চুল ঝাড়ে।
মস্করা করি নাই, দাদা। ঘরেই চোখ চায়গা, আজ কয়ে গেলাম।
আহত এবং ক্লিষ্টের একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি আছে সমবেদনার আশ্রয় খোঁজা। মাধাই একসময়ে অত্যন্ত বিপন্ন বোধ করে সংঘের কাজের আড়ালে আত্মগোপনের চেষ্টা করেছিলো। তার নিজের জীবনটাকে অর্থহীন বোধ হতো, তাই সংঘের কাজ করে, কাজের লোক হয়ে জীবনের ফাঁকিটাকে সে ভরে তুলতে চেয়েছিলো। কিন্তু সে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে অনুভব করেছিলো, ওটা বিদ্বেষের পথ, জীবন আরও ফঁকা হয়ে যায় ওপথে। নেশার মতো। যতক্ষণ বেহুস ততক্ষণ ভালো, হুঁস এলেই ঘৃণা। হঠাৎ এলো ফতেমা। পুরনো সুরতুন আর ফতেমার সান্নিধ্যে সে সমবেদনার একটু ছোঁয়াচ পেলো। পৃথিবীর অন্য সব লোকের চাইতে এরা তার বেশি পরিচিত। এদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে সময় কাটানোর সময়ে অন্য কোনো কথা মনে থাকে না। আর এদের অভাব পূরণ করা, যা সে আগেও করতো, এমন একটা কাজ যাতে নিজেকে ব্যাপৃত রাখা যায়, অথচ যা ক্লান্তি আনে না। মাধাই স্থির করলো নিজের উপার্জনের কিছুটা সে ফতেমা-সুরতুনের জন্য ব্যয় করবে এবং সেটা তার ভালো লাগবে।
