মানুষের কৃতকর্মের শেষ বিচারে বলা যায় এই কাজটি না করে তার উপায় ছিলো না। কিন্তু তার জীবনধারা অনুসরণ করতে করতে সবসময়ে বলে ওঠা যায় না তার ভবিষ্যতের ঘটনা আগেরগুলির পরিণাম হবে কিনা। হিসাবের চাইতে বড়া যেন কিছু এসে পড়ে।
আগের ঘটনার অল্প কিছুদিন পরেই তাদের পরিবারে এলো বিঘোর দুর্দিন। ছিনাথের স্বাস্থ্য কিছুদিন থেকে ভেঙে পড়েছিলো। সেবৎসর শীতের গোড়াতে যখন তার জ্বর হতে শুরু করলো। তখন সে নিজেও হাল ছেড়ে দিলো। তার জ্বর সাধারণ নয়, বিপথ থেকে কুড়িয়ে-আনা বিষাক্ত ক্ষতগুলো সহস্ৰমুখে আত্মপ্রকাশ করলো। মৃত্যুটা হলো বীভৎস। তারপর এলো না খেয়ে-থাকার দিন, গোরুকে বিষ দেওয়ার দিন। বাঁশির বদলে বিষ উঠলো হাতে।
উঠে দাঁড়িয়ে মাধাই বিড়ি ধরালো। গ্রামের জীবন সে চিরকালের জন্য ত্যাগ করে এসেছে। এত দূরে থেকেও যখন তার বাবা-মা বর্তমান ছিলো, তাদের গৃহ ছিলো, সে-সময়ের কথা মনে হলো। কেন হলো এ কথা বলা শক্ত। হাতের কাছে অবশ্য ফতেমা আছে; তার স্নেহ অন্য অনেক স্নেহশীল দিনের কথা মনে আনতে পারে।
ফতেমার কথা মনে হলো। সে লাজুক নয়, প্রয়োজন হলে সে অগ্রসর হতে পারে, তার সঙ্গীদের মুখে ছোটোখাটো ঘটনা শুনে মাধাই বুঝতে পেরেছিলো, কিন্তু এমন সোহাগ-ঝরানো কথা শুনবার অবকাশ মাধাইয়ের আগে হয়নি। স্ত্রীলোক এমনভাবে কথা বলে বলেই বোধ হয়। শ্রান্ত পুরুষরা বাড়ির দিকে ছুটে যায়। কিন্তু সাধারণের চাইতেও বুঝি-বা বেশি কিছু ফতেমা, ভেঙেপড়া পুরুষের পদস্খলন যারা স্নেহ দিয়ে ক্ষমা করতে পারে তাদের মতো বোধ হয় সে। বোধ করি এমন স্ত্রীদের কাছেই পুরুষ বার বার ফিরে আসে।
পরদিনও ফতেমাকে মাধাই যেতে দিলো না। ঘুম ভেঙে উঠে সে বললো, আজ না গেলি হয় না?
থাকবের কও, ভাই?
হয়, থাকো।
চার-পাঁচ দিন ফতেমা বেঁধে খাওয়ালো মাধাইকে। মাধাই যখন স্টেশনে ঘুরে বেড়ায় তখন তাকে দেখে তার সঙ্গীরা অবশ্যই বুঝতে পারে না তার অন্তরকে গত কয়েকটি দিন কত কিছু এনে দিয়েছে। ইতিমধ্যে একদিন সে বলে ফেলো জয়হরিকে, হাত পোড়ায়ে খায়ে বেটা ছাওয়ালের চলে না। ফতেমা রাঁধে খাওয়ায়, বেশ আছি?
ফতেমা থাকে নাকি আজকাল তোমার কাছে?
আছে কয়দিন।
কিন্তু সেদিনই অন্য একসময়ে জয়হরি রসিকতা করে বললো, দুটাই রাখবা?
মাধাই বুঝতে না পেরে বললো, কী কও?
কই যে, দুজনকেই পুষবা? শেষ দুজনে চুলাচুলি হবি।
না, ওরা ঝগড়া করে না।
পুরুষের ভাগ নিয়ে করবি।
রসিকতার তলদেশ দেখতে পেয়ে মাধাই প্রায় ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলো, বিরস মুখে বললো, ওরা আমাকে ভাই কয়।
সন্ধ্যায় ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফিরে সে দেখলো ফতেমা কুপি জ্বালিয়ে ঘরের কাজ করছে।
সুরো কই?
গাঁয়ে পাঠাইছি। শ্বশুরের অসুখের খবর নিয়ে আইছিলো একজন।
রাত্তিরেও রাঁধা লাগবি নাকি?
হয়।
রাত্রিতে নতুন করে রাঁধার প্রয়োজন হয়েছে কেন সেটা ফতেমা ঠিক সাহস করে বলতে পারলো না। ফুলটুসির ছেলে জয়নুল ও সোভান এসে খেয়ে গেছে।
মাধাই ঘরের ভিতরে বসে বিড়ি টানছে, আর ফতেমা বাইরে রান্না করছে। ফতেমা বললো, আনাজ নামানের সময় কঁচা তেল লঙ্কা দিয়ে নামালি খাও?
মাধাই বললো, হুঁ।
কৌতুকের মনে হলেও সত্য যে একয়েকটি দিনেমাধাই একপক্ষে সুরতুন-ফতেমা অন্যপক্ষে এদের পারস্পরিক অবস্থানের যেন কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। এরা যেন খানিকটা আশ্রিতের মতো, খানিকটা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলো মাধাইয়ের চোখে। এখন যেন তার সমকক্ষ বলে বোধ হচ্ছে।
কিছু সময় ঘরে কাটিয়ে মাধাইয়ের মনে হলো ফতেমার সান্নিধ্যে বারান্দায় গিয়ে সে বসবে। এরকম আকাঙ্ক্ষা এর আগে কোনো সময়েই তার হয়নি। কিন্তু জয়হরির রসিকতাটাও তার মনে পড়ে গিয়ে মনে অস্বাচ্ছন্দ্য এনে দিলো।
ফতেমা বাইরে থেকে ডেকে বললো, লাকড়ি কৈল নাই। দু-এক দিনের মধ্যে আনতে হবি।
কাল মনে করায়ে দিও কী কী লাগবি!
মনের অস্বাচ্ছন্দ্যের চাইতে সান্নিধ্যের আকাঙ্ক্ষাই অবশেষে প্রবল হলো। মাধাই বাইরে গিয়ে বললো, আবার আসলাম তোমার কাছে বসতে।
কেন্, ভয় করলো সোনাভাই? ফতেমা যেন শিশু-ভ্রাতার ভয় দূর করছে।
মাধাই অপ্রতিভের মতো হাসলো। উঠে যাচ্ছিলো সে, ফতেমা হাত বাড়িয়ে তার হাত ধরে বসালো।
বোসো না কেন, ভাই।
মাধাই লক্ষ্য করলো ইতিমধ্যে ফতেমারও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। প্রথম দিনের তুলনায় কিছু পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে তাকে। পরিধেয় ও মাথায় চুলেই পরিচ্ছন্নতার ভাবটা বেশি লক্ষণীয়। মাধাইয়ের মনে হলো, ফতেমা পথে বেরিয়ে পড়ার আগে হয়তো এরকমই ছিলো কিংবা এর চাইতেও বেশি ছিলো তার লক্ষ্মীশ্রী।
একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে মাধাই বললো অবশেষে, রান্না করো তুমি, আমি একটু ঘুরে-ফিরে আসি।
পরদিন দুপুরবেলায়। মাধাই ডিউটি সেরে ফিরেছে। আহার্যের আয়োজন দেখে বিস্মিত হয়ে সে প্রশ্ন করলো, বিয়েসাদির ব্যাপার নাকি?
ফতেমা বললো, সে হারামজাদারা আবার আইছে।
কে?
কাল যারা খায়ে গিছলো।
দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। ফুলটুসির ছেলে জয়নুল আর সোভান উপস্থিত হলো। কোথায় কোনো উৎসব উপলক্ষ্যে হয়তো কেউ দরজায় কলাগাছ লাগিয়েছিলো তারই একটা তারা সংগ্রহ করে এনেছে। দেহে এমন বল হয়নি তাদের যে কাঁধে করে আনবে, সমস্তটা পথ মাটি দিয়ে হেঁচড়ে টেনে এনেছে, পথের আবর্জনায় কলাগাছটি ক্লেদাক্ত হয়ে উঠেছে।
