কৃষকদের মধ্যে পরিপকরা যখন ইতিকর্তব্যতার চিন্তায় ব্যস্ত, বুধেভাঙার পাঁচ-ছয়জন সান্দার যেখানে মুখনীচু করে বসেছিলো তার মধ্যে থেকে হঠাৎ একটি অপরিচিত লোক উঠে দাঁড়ালো। আঠারো-উনিশ বছর বয়স হবে তার। সে উঠে দাঁড়িয়ে আবার ধপ করে বসে পড়লো।
নায়েব বললো, তুমি কে, কিছু বলবে?
লোকটি আবার উঠে দাঁড়ালো। ঘরের একটা থাম হাতের কাছে পেয়ে সেটাকে অবলম্বন করে কিছু সাহস পেলো। বললো, জে, ইজু।
ইজু কে?
জে, ইজু সান্দার।
তা না হয় বুঝলাম। কার ছেলে তুমি? বাপ বড় বাপের নাম বলো।
লোকটি মুখ চৈত্রের ঝলসানোনতুন আমপাতার মতো ঝরে গেলো। সে বললো, ইয়াকুব সান্দার আমার ধর্মবাপ। কও না, আজা, লোকজনের মধ্যে আমাকে বেহাল করো কেন। তখন রজব আলি উঠে দাঁড়ালো। সে বললো, নায়েবকে নয়, রামচন্দ্রকে লক্ষ্য করে, বুঝলেন না মোণ্ডল, আমার কাছেই থাকে ও। ইয়াকুবের ছাওয়াল। আমার সেই ইয়াকুব, তার।
তোমরা জমি চাও? কিন্তু রজব আলি, তোমার পত্তনিটুকুও তো তুমি ইস্তফা দিয়েছে।
জে।
বর্গা চষতে পারবে?
জে।
কতটুকু চাও?
ক, ইজু, ক’ বলে রজব আলি ইয়াজকে আবার তুলে দিলো।
ইয়াজ বললো, জে, বেশি চাই না। একা একা দুইজন আমরা, লাতি আর আজা। দশ বিঘা কি পনরো, জলের ধার ঘেঁষে দেন।
হাল বলদ নেই তো? পাঁচ পাবে। তা বেশ, পরে এসে টিপসই দিয়ে কাগজ কলম ঠিক করে নিয়ে। কিন্তু, রামচন্দ্র, তুমি কিছু বলছে না?
অধম আর কী বলবি। গোঁফ চুমরে রামচন্দ্র মাথা নোয়ালো।
ছিদাম ফিসফিস করে বললো, জ্যাঠা, রজব আলি তার লাতির জন্য কয়,কও জ্যাঠা, আমার জন্যে আমি কবো?
ক এবার।
ছিদাম বললো, হুজুর—
তুমি কেষ্টদাসের ছেলে না?
আঁগে।
তুমি জমি চাও?
আঁগে।
কতটা পারবে?
আঁগে, ষাট কি সত্ত্বর বিঘা।
দূর পালা! এ কি গান বাঁধা?
ছিদামের কান লাল হয়ে উঠলো। সে বললো, আঁগে, যদি না পারি প্রাণ দিবো।
তুমি কি চাকর রেখে জমি চষতে পারবে, এমন মূলধন আছে? হাল-বলদ আছে?
একটু পাবো না জমি? ছিদামের দু চোখ জলে ভরে এলো।
পাঁচ-দশ যা হয় দিতে পারি যদি রামচন্দ্র তোমার হয়ে কথা দেয়। এখন সকলে চিন্তা করো, পাগলের মতো কথা বলো না। কিন্তু রামচন্দ্র, কর্তা তোমার জন্যে বিশেষ করে কিছু জমি দেগে রেখেছেন একলপ্তে ত্রিশ বিঘা।
রামচন্দ্র বললো, আজ্ঞা।
কোথায় তা বুঝতে পেরেছো? সিঙ্গী জমিদারের সীমানা সামিল।
আজ্ঞা, বুঝলাম।
ভয় পাও নাকি?
আজ্ঞা, রাজার হুকুম হলে লাঙলও ধরতে হবি।
আচ্ছা, তাহলে এখন তোমরা যাও। সাতদিন পরে আবার হাটবারে এসো।
সকলে চলে গেলে রামচন্দ্র বললো, নায়েবমশা–
বলো। আরও চাও বুঝি জমি? দাদপুরের দশ-বারো ঘর প্রজার ঘরদোর জমিজিরাত পদ্মায় গিয়েছে। তাদের জন্যও জমি রাখতে হবে তো। আর বিলমহলের তাতীরাকর্তার খাতিরের লোক তাও জানো।তবে তোমার জন্যে যে জমির কথা বললাম, একলপ্তে অত বড়ো জমি আর কোথাও নেই। সেটেলমেন্টের দাগি নিয়ে যা গণ্ডগোল।
আজ্ঞা পরে আপনেক কবো। একটা কথা আপনেক জিজ্ঞাস করবার চাই। সামাইন্য কথা। ধরেন যে আমার ঘরবাড়ি যদি কারো নামে লিখে দিই তাইলে সে কি আমাক তাড়ায়ে দিবের পারে?
তা তো পারেই।
রামচন্দ্র একটু চিন্তা করে নিয়ে বললো, আপনে উকিল পাস। কন, এমন কী উপায় আছে যে জমি আমারই থাকবি কিন্তুক আমার অভাবে আর একজন হার হবি কিন্তু আমার পোষ্যদের অযত্ন করবি নে।
তা আছে। তাকে উইল বলে।
উইল? সে কাগজ লেখা যায়?
তা যায়। কিন্তু উইল করার মত বুড়ো তুমি হওনি। আর তাছাড়া তোমাদের পরিবারের হক নিয়ে গোল হবার কারণ দেখি না।
না, গোল আর কী।
কাছারি থেকে বেরিয়ে রামচন্দ্র স্থির করলো সদরে গিয়ে তার উকিলকে দিয়ে উইল লিখিয়ে নেবে।
রামচন্দ্র চলে গেলে নায়েব চিন্তা করলোলোকটার এমন হঠাৎ পরিবর্তন হলো কেন? এমন চপলমতি নয় যে জমির কথা শোনামাত্রই মাথা খারাপ করে হৈচৈ শুরু করবে। কিন্তু ধীরে সুস্থে হলেও জমি নেওয়া সম্বন্ধে তার মতো চরিত্রের লোকের কাছে নির্দিষ্ট একটা প্রস্তাব আশা করা গিয়েছিলো। এমন সুযোগ প্রতি বৎসর আসে না।
২৮. আলেফ সেখের সঙ্গে
আলেফ সেখের সঙ্গে আবার একদিন রামচন্দ্রর দেখা হলো।
রামচন্দ্র যাচ্ছিলো চৈতন্য সাহার বাড়িতে কিছু কাপড় কিনতে। আলেফ সেখ বিপরীত দিক থেকে আসছিলো। কতি যাওয়া হইছিলো?
এই এদিকে। আলেফ যে রায়দের জমিটাই আবার দেখতে গিয়েছিলো সেটা প্রকাশ করলো না। সে বললো, বিড়ি খান।
রামচন্দ্র বিড়ি নিয়ে ধরালো।
আলেফ বললো, সেই যে জমির কথা কইছিলাম মনে আছে?
আছে।
বসেন না একটু, আলাপ করি। আলেফ পথের ধারে ঘাসে-ঢাকা জমি দেখে উবু হয়ে বসে পড়লো। অগত্যা রামচন্দ্রকেও বসতে হলো।
আলেফ বললো, যা কইছেন মিথ্যা না, মণ্ডলের ব্যাটা। এখন জমি আর কনে আছে এ গের্দে। কী যেন কইছিলেন, মসনদ না কী? বাড়ি করবের হয় তো ওইখানে।
রামচন্দ্র নিরুত্তর। আলেফ বলে চললো, কিন্তুক লোকের কাছে খবর নিয়ে কলকেতায় রায়বাবুদের সরকারের ঠিকানায় চিঠি দিছিলাম। ফিরে আসছে। ধরেন যে রেজেস্টারি চিঠি, বিলি হওয়া লাগতো।
এখানে মিহিরবাবুর কাছে খোঁজ পালেও পাতে পারেন।
কন কী? তার কাছে খোঁজ নিবের গেলে সে কি নিজেই কিনবের চায় না?
রামচন্দ্রর মনে হলো লোকটি বৃথা ঘুরছে। রায়বাবুরা যদি জমি বিক্রিই করবে তবে এটা এতদিন পড়ে থাকতো না। সকলের চোখেই পড়েছে জমিটা। সে আলেফের জন্য একপ্রকার সহানুভূতিও বোধ করলো। সে বললো, মিছা কেন্ ঘোরাফেরা করেন। ও জমি যদি নেওয়ার মতো হবি তাইলে আর কেউ না পারুক, সান্যালকর্তা এক কথায় নিবের পারতো।
