আজ চাষের দিন নয়, আনন্দের দিন। মহিম সরকার অতঃপর মুঙ্লা, ছিদাম ও রামচন্দ্রকে নিয়ে তার বাড়ির দিকে রওনা হলো। তার দুই ছেলে লাঙল উল্টো করে জোয়াল চাপিয়ে বলদগুলোকে তাড়িয়ে নিয়ে পিছন পিছন আসতে লাগলো।
দুপুরে রামচন্দ্র ও মহিম আলাপ-আলোচনায় ব্যস্ত ছিলো। মহিমের বড়োছেলে দুটিও যোগ দিয়েছিলো। এমন সময়ে মহিম সরকারের বড়োজামাই এলো। এ লোকটি মুঙ্লার বিয়ের সময়ে আসতে পারেনি। সে জামালপুরে রেলের কারখানায় কাজ করে। অল্পবয়সে সাধারণ শ্রমিক হয়ে রেলের কাজ নিয়েছিলো, এখন অনেকটা দূর উঠেছে। তার ছেলেমেয়েরা সকলেই ইংরেজি স্কুলে পড়ে। তার একটি বদ্ধমূল ধারণা ছিলো, অনেক ব্যাপারেই মূলীভূত বিষয়টি তার চোখে যেমন পড়ে আর কারো তেমন পড়ে না।
আলাপের মাঝখানে সে বললো, মানুষ ভাবে এক, কিন্তু অন্য হয়ে যায়।
তা হয়।
অনেকে অপুত্রক অবস্থায় জামাইকে ছেলে বলে মানুষ করে কিন্তু বুড়োবয়সে ছেলেপুলে হলে জামাইকে আর আপন মনে হয় না।
এরকমও হয়। মহিম সরকার বললো, আমার ছাওয়াল আছে, জামাইকে কিন্তুক পর করি নাই।
আমার-আপনার কথা নয়। এমনকী এরকম দেখা গেছে, জামাইকে বঞ্চিত করার জন্যে পুত্রের আশায় মানুষ দ্বিতীয় বিবাহ করেছে। মানুষের অসাধ্য কী? বললো রামচন্দ্র।
আলাপটা মহিমের ভালো লাগলো না। সে এর আগের আলাপের জের টেনে বললো, তাইলে মুঙ্লা কয়দিন আমার কাছে থাকবি?
তা থাক, কাকা, আপনের কাছে ছাওয়াল বিগড়ায় না।
তাইলে, ভানুও কি থাকবি? মহিম এ প্রশ্নটা যেন ভয়ে ভয়ে উত্থাপন করলো।
রামচন্দ্র হেসে বললো, আপনের ইচ্ছা।
ভান্মতি ঘরের ভিতর থেকে শুনছিলো, সে বেরিয়ে এসে বললো, আমি কৈল চিকন্দিতে যাবো। আমার শাশুড়ি কয়ে দিছে তাড়াতাড়ি ফিরতি।
মহিমের চোখে অশ্রুবিন্দু দেখা দিলে, সে হাসতে হাসতে বললো, দেখলা, রামচন্দ্র, দেখলা।
রামচন্দ্র বিমুগ্ধ হয়ে বললো, চল, মা, চল তাই।
সন্ধ্যার দিকে মহিম সরকারের গাড়ি করে রামচন্দ্র ও ভান্মতি ফিরে চললল। রামচন্দ্রর খুশি খুশি লাগছিলো কিন্তু তার মধ্যেও কী একটা সমস্যা যেন ওত পেতে আছে। সেটা সামনে এসে স্বরূপ প্রকাশ করছে না, কিন্তু তার নিশ্বাসের, কখনো বা তার নড়াচড়ার শব্দ কানে এসে গা শিরশির করছে।
মহিমের বড়োজামাইয়ের বক্তব্যটুকু মনে পড়লো তার। রামচন্দ্র ভাবলো, আচ্ছা, সে কি আমাক লক্ষ্য করে কইছে। তা না কবের পারে, কিন্তু এমন কথা ওগরে সকলের মনে হবের পারে। ধরো, যদি ভান্মতিও মনে করে অবশেষে জোতজমা কিছুই মুঙ্লাক দিবো না? তাইলে ভান্মতির মনে সুখ থাকবি নে, তার ভালোবাসা শুকায়ে যাবি। তারপর রামচন্দ্র নিজের মনের অন্দরে প্রবেশ করে সেখানে যারা ছিলো তাদের পরিচয় নিতে লাগলো। মুঙ্লাকে জ্ঞাতসারে কোনোদিন অনাদর করেছে এমন কারো সাক্ষাৎ সেখানে পাওয়া গেলো না। নিজের ছেলে হলে ভালো হতো এমন দু-একটি ইচ্ছার সঙ্গে দেখা হলো বটে কিন্তু তারা নিতান্ত অযত্নে অপুষ্ট। রামচন্দ্র স্থির করলো এই যে নিজের মনের কথা লোকে জানুক আর না জানুক, যা করতে হবে সেটা প্রকাশ করে বলাই ভালো। তার অভাবে মুঙ্লা সম্পত্তি পাবে এটা সকলেই আন্দাজ করে, তবে সেটা সকলে জানলেই-বা কী ক্ষতি! লাভ আছে বরং। মহিমের বড়ো জামাইয়ের মতো যাদের মন তারা মুঙ্লাকে আর একটু শ্রদ্ধা করবে। তাছাড়া, ব্যবস্থাগুলি পাকাঁপোক্ত রকমে
করে গিয়ে অনেক মানুষ উত্তরাধিকারীকে ফ্যাসাদে ফেলেছে।
রামচন্দ্র বললো, ভানু, ঘুমাইছো?
না, বাবা।
সদরে যাওয়া লাগবি। ভাবি যে সম্পত্তি সব মুঙ্লার নামে লিখে দিবো।
কেন, তা দেওয়া লাগে কেন্? আমার ও বাপ তা দেয় না।
তোর বাপ বুঝি তোর সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করে? তাইলে আমিও তাই করবো। জমি সব মুঙ্লাক লিখে দিবো।
তারপর সে যদি আমাক আর আপনেক তাড়ায়ে দেয়?
আমাক দিলেও দিতে পারে, তোক দিবে কেন্?
আপনেক তাড়ালে সে আমাকও হলো।
রামচন্দ্র জানে যে বয়সে স্বামী পৃথিবীর সকলের চাইতে আপন হয়, সে বয়স হলে ভান্মতির এই মত বদলাবে, কিন্তু তার আগে পর্যন্ত সে তার জীবন ধন্য করতে পারে।
তবু কথাটা অত সহজে ভুলবার নয়।
.
প্রায় একমাস পরে। সান্যালমশাইয়ের নায়েব গ্রামের অপেক্ষাকৃত শক্ত চাষীদের সঙ্গে সঙ্গে রামচন্দ্রকেও ডেকে পাঠালো। সকলে সমবেত হলে নায়েব ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললো। বুধেডাঙায় সান্দাররা ফৌত হওয়ার দরুন কিছু খাস জমি পড়ে আছে, কিছু জমি তারা ইস্তফাও দিয়েছিলো। আর তাছাড়াও বুধেডাঙার লাগোয়া সিকস্তি এবার চাষযোগ্য হবে।তা তিনশো বিঘা হবে চাষযোগ্য সিকস্তি।পত্তনি দেওয়া হবে?না, বর্গাদারি। খাসেই থাকবে, বরং আরও খাজনা বাকি জমি খাস করা হবে। কীভাবে বর্গা হবে? হাল-বলদ বীজ যদি চাষীর হয়, তিন ভাগের দুই ভাগ চাষীর; হাল বলদ বীজ যদি রাজার হয় আধাআধি ভাগ।
রামচন্দ্রর পাশে ছিম উসখুস করে উঠলো। রামচন্দ্র চাপা স্বরে ধমক দিয়ে বললো, বোস। নায়েব আরও বিশদ করে বললো, বিল-মহল থেকে দশ ঘর লোক আনাবেন কর্তা। দাদপুর ভাঙছে নদীতে, তাদেরও প্রায় দশ বারো ঘর আসবে। এখন তোমাদের মধ্যে কারা জমি নেবে স্থির করে এসে জানাবে। পরে যেন বলল না–রাজা তোমাদের না জানিয়ে অন্যায় করেছেন।
