টাকার অঙ্ক দুটিতেও মিল দ্যাখো। সেটা ছেলের কৃতিত্বের পরিচয়, আর এটা? আলেফ প্রথম কয়েকটি দিন ঘুরঘুর করে বেড়াতে বেড়াতে চিন্তা করলো কনজর রাখতে হবে চৈতন্য সাহা আর ছমিরুদ্দিনের উপরে। কিন্তু পরে ভাবলো, যা হয় করুক, আমি আর ওতে নাই।
.
জমিটা পড়ে আছে। রায়দের জঙ্গলের কাছাকাছি। জঙ্গল এককালে বাগান ছিলো, আর এ জমিটায় ছিলো প্রাসাদ। এখন কলওয়ালাদের হাতে পড়ে ইটগুলিও বিকিয়ে গেছে। ভিত্তির ইটপাথরগুলো ভোলার খরচ বিক্রির দামে পোষাবে না বলে সেগুলি মাটির নিচে থেকে গেছে। বুনো ঘাসে ঢাকা জমিটা। দুটি তালগাছ আছে। দ্বিতীয়টি জন্মাবার আগেই প্রথমটি বাজে পুড়ে নেড়া হয়ে গেছে। সে দুটি চিল-ওড়া নীল গভীর আকাশের মাঝখানে পরস্পরের সঙ্গী।
এটা অত্যন্ত পুরনো সত্য-জমি এবং নারী। আদর যত্ন না পেলে ওরা হাজা-শুখা কিংবা বন্য এবং হিংস্র। একদিন চিন্তায় কিছু রসিকতা মিশিয়ে আলেফ ভাবলো : নারীর সঙ্গে জমির এইটুকুমাত্র তফাত যে নতুন ও লোভনীয় দেখলেই তাকে ভালোবাসা যায়। তার জন্য ছেলে বউয়ের কাছে মাথা হেঁট করতে হয় না।
আলেফ সেখকে এ জমির দিকে অনিবার্যভাবেই আসতে হতো। তার মন চৈতন্যর চুরির ব্যাপারে অবলম্বনহীন হয়ে পড়েছে বলেই সময়ের দিক দিয়ে কিছু আগে হলো।
রেবতী চক্রবর্তী একদিন আলেফকে রায়দের পতিত জমিতে ঘুরে ঘুরে লাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মাটি পরখ করতে দেখতে পেলো।
ওখানে কী?
না, কিছু না। এমনি ঘুরে দেখলাম।
ভালো জায়গা বটে ঘুরে দেখার। মাটির তলায় একতলা সমান ইটের গাঁথুনি আছে। সাপখোপের আড্ডা। কত গর্তগাড়া দেখছেন না? বাস্তুসাপের বাচ্চারা ধাড়ীদের মতো খাতির রেয়াৎ করে না।
তা তো বটেই, তা তো বটেই, বলে আলেফ জমিটা পার হয়ে রেবতী চক্রবর্তীর কাছে রাস্তায় উঠে এলো।
অন্য কথা দু’চারটে বলে পথ চলতে শুরু করলো দুজনে। খানিকটা দূরে যাওয়ার পর জমিটা আবার চোখে পড়লো আলেফের। আরও দু’চারটে অন্য কথা বলে আর-একবার জমিটা দেখে নিয়ে আলেফ গদগদ করে বললো, বড়োলোকের কাণ্ডকারখানা আলাদা।
কেন, বড়োলোকের জমিতে সোনার টুকরো পেলেন নাকি?
তানা, তবে কওয়া যায়। সোনার টুকরা ছাড়া কি জমিটা?তানা। বলতিছি ধরেন যে এদেশে তো রায়রা আর আসবি নে।
ও পড়ে আছে, পড়েই থাকবে।
তা কেউ কিনে নিলেই পারে। লাট দিতে হয় না, লাখেরাজ ভূঁই। সেসে আর কয় টাকা। এক লটে পঞ্চাশ বিঘা ঢালা, নিখরচা।
এই দ্যাখো! বড়োঘরের জিনিসের দিকে নজর দেওয়া কেন!
বড়োঘরের হলেও এ তো পর্দার বিবি না।
সেবছরে রামচন্দ্ররা কয়েকজন ভাগে কিনতে চেয়েছিলো। তার মধ্যে লেগে গেলো দুর্ভিক্ষ। ও জমিতে লোভ হলেই অনর্থ।
রেবতী চলে গেলো। ধুলোঢাকা পথে একটা পাক খেয়ে আলেফ সেখ ফিরতি পথে আঁকাবাঁকা চলতে লাগলো। আর তারপর ভাবতে ভাবতে ভেবে ওঠার আগেই সে রামচন্দ্র মণ্ডলের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত।
রামচন্দ্র বেরিয়ে এলো। জলচৌকি টেনে দিয়ে তামাক ধরালো, কাঁঠালের পাতা এনে নল তৈরি করে দিলো।
আলাম ঘুরতে ঘুরতে। তা কেমন আছেন? শুনলাম ছাওয়ালের বিয়ে দিছেন।
এই হলো আলেফের ভূমিকা। এখানে আসবার সময়ে সে যেমন আঁকাবাঁকা পথে এসেছিলো তেমনি আঁকাবাঁকা কথায় সে জমির প্রসঙ্গে এসে পৌঁছলো।
রামচন্দ্র বললল, হ্যাঁ, সখ তো হইছিলো একবার। অনেক টাকা লাগে পারলাম না।
তা ধরেন যে মিথ্যা না কথা। বড়লোকের জমি, আমাদের মতো অভাবে তো পড়ে নাই। রায়বাবুদের সরকারকে লিখছিলেন?
হুঁ। পাঁচ হাজার সেলামি দিয়ে পত্তনি বহাল।
কন কী! তাও পত্তনি। তাও ওই সাঁইত্রিশ বিঘা পতিত ভিটা।
কথায় নিরাশা ফুটাতে আলেফ জমির পরিমাণ কমিয়ে আনলো।
রামচন্দ্র বললো, কিন্তুক শুধু জমি দেখেন না সেখের বেটা। ও হতিছে জমিদারের গদি। ওখানে কায়েম হওয়া এই গাঁয়ে কায়েম হওয়ার সামিল।
আলেফ সেখ রামচন্দ্রর প্রতিটি কথার শেষে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে যতি সূচনা করে যাচ্ছিলো। সে বললো, হয়, হয়, ঠাট্টা। জমি নাই তার জমিদারী।
রামচন্দ্রর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আলেফ নিজের বাড়ির পথ ধরলো। রৌদ্র প্রখর হয়ে উঠছে। চারিদিকের দৃশ্যপট প্রখরের তুলিকায় আঁকা। অঙ্কের তৈরি পৃথিবী। পাঁচ হাজার সেলামি, পঞ্চাশ বিঘা জমি। না হয় পঞ্চাশ বিঘার প্রতিটায় আর দু’পাঁচ টাকা করে দেওয়া গেলে সরকারকে গদি-সেলামি। খাজনার হারে দু-পাঁচ আনা ফের-ফার করতে সেই পারবি।
মন যখন কোনো বিষয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে, সমগ্রকে গ্রাস করতে চায়, গভীরভাবে ডুবতেও চায়, তখন সেটা ভঙ্গিতে গোপন রাখা যায় না। আলেফের হাতের লাঠিটা দিগন্তের দিকে কী একটা নির্দেশ করতে গিয়ে একবার আকাশকে কাটছে, আর একবার মাটিকে ফুড়ছে।
চরনকাশিতে পাকা মজিদ ভোলো আর তাকে ঘিরে লাল প্রাচীর দেও। সে তোমার গ্রামের বাইরে চরুয়া ব্যাপার। মানে খানদানি, নাকি; কী যেন বললো রামচন্দ্র-জমিদারের মসনদ।
আলেফ হাসি হাসি মুখে ভাবলো আল মাহমুদ তাকে বোকা ঠকিয়েছে, অকাজের হাঙ্গামায় জড়িয়ে দিয়েছে। সেই একবার ভদ্রলোকের ছেলেরা অনেক কাপড় পুড়িয়ে দিয়ে কাপড়ের দাম চড়িয়ে দিয়েছিলো। গ্রামের লোকরা বোকা ঠকেছিলো। এই হচ্ছে রাজনীতির ব্যাপার। আল মাহমুদ একটা প্রথম শ্রেণীর আহাম্মক। শহরের লোকে ছিনেমা দ্যাখে, তা, সেটা গ্রামে কেন?
২৭. মুঙ্লার যৌতুকে পাওয়া জমি
মুঙ্লার যৌতুকে পাওয়া জমিতে এপক্ষ থেকে এই প্রথম চাষ পড়বে।
