কেউ কারো অক্ষমতার কথা প্রকাশ করলে তার বিপক্ষরা অনেকসময়ে হাসিমুখে বলে, কে, ভাই তুমি তো পাকা মজিদ দিছো।
হাট থেকে প্রয়োজন মতো সওদা সংগ্রহ করতে না পারলে গৃহিণীর কুটিতে ক্রুদ্ধ হয়েও কৃষকরা বলে ঝাজের সঙ্গে, কেন্, আমি কি পাকা মজিদ দিছি?
কেউ হয়তো একটা ঘর তুলছে। কেমন হলো ভাই, ঘর? পাকা মজিদ-মধুর রসিকতার উত্তর আসে।
এ হেন পাকা মসজিদ তুলেও আলেফ সেখের মনে শান্তি নেই। কিছুদিন আগে একটা ঘটনা ঘটে গেছে। সদর থেকে এক সাইকেল-চড়া খাকি-পরা সরবরাহ কর্মচারী এসেছিলো। যে পথে পথে বেড়ায় তার সঙ্গেই দেখা হওয়া স্বাভাবিক, আলেফ সেখের সঙ্গেই তার দেখা হলো।
সে বললো, আলেফ সেখ সেক্রেটারির বাড়ি কোনটা?
ওই পাকা মজিদ।
তা শুনেছি, কিন্তু ওখানে তো আরও দু’একটা বাড়ি চোখে পড়ছে। আপনি কি তাকে চেনেন?
আমিই আলেফ সেখ।
লোকটি যেন এই ধরনের রসিকতায় বিরক্ত হয়েই আলেফ সেখকে পিছনে ফেলে পাকা মসজিদ লক্ষ্য করে চলে গেলো। পরে অবশ্য লোকটি তাকে চিনতে পেরে ক্ষমা চেয়েছিলো।
কিন্তু এরকম কেন হবে? এরফানের গায়ের রং তার তুলনায় কিছু পরিষ্কার তার জন্য তো সে দায়ী নয়, তেমনি একবুক শাদা দাড়ি রেখেও এরফানের তুলনায় তাকে গম্ভীর দেখায় না, তার জন্যও তাকে দায়ী করা যায় না। তখন তার পরনে একটা খাটো তফন ছিলো, কাঁধে গামছা ছিলো। কিন্তু পায়ে জুতো এবং মাথায় ছাতাও ছিলো। এরফানকে অবশ্য এরকম বেশে কেউ পথে দেখতে পায় না। কিন্তু ভদ্রলোক বলেই কি তাকে দিনরাত্রি চোগা-চাপকান এঁটে থাকতে হবে? জমিজিরাতের কাজ করতে হবে না?
এক সন্ধ্যায় হাত-পা ধুতে বসে নিজের হাত-পায়ের আঙুলের পিঠে কড়াগুলি তার চোখে পড়লো। সে স্ত্রীকে বললো, একখানা ঝামা দেও তো। দ্যাখো তো এ কি থাবা না হাত? এ কি ভদ্রলোকের পা? জুতাই বদলাবের হবি। এরফানের মতো হাল্কা একজোড়া নেওয়া লাগে।
এসবের চাইতেও বড়ো অশান্তি আছে। বিষয়টি তার সেক্রেটারি হওয়ার সঙ্গে সংযুক্ত। অন্য অনেক প্রবাদ বাক্যের মতো এটাও চরনকাশির খোঁড়া মৌলবীর রচনা। আলেফের কপালে একটা ছোটো অর্বুদ আছে। খোঁড়া মৌলবী বলে, ওটা কিছু নয়, নমাজ পড়তে পড়তে হয়েছে তবে এটা কাপড়ের জন্যে; শীতকালে কমিটির কম্বল দেওয়ার কথা, তখন আরও একটা কড়া পড়বে। আলেফ সেখ জানে, কমিটির কাজে গোলমাল আছে। চৈতন্য সাহা এবং ছমিরুদ্দিন একসঙ্গে হলেই ফিসফাসকরে আলাপ শুরু করে। জমির কাজকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয় বলে ব্যাপারটা সে তলিয়ে দেখার চেষ্টা করে না।
কিছুদিন আগে একশ টাকার দুখানা নোট নিয়ে চৈতন্য সাহা এসেছিলো। নেন, সামাইন্য কিছু। লজ্জায় যেন মাথা ভূমি স্পর্শ করবে।
আলেফ সেখ টাকাটা রেখে দিয়েছিলো। তার আট-দশদিন বাদেই চুরির ব্যাপারটা ঘটে গেলো। চুরি করে সরকারি সওদা? রাগে আলেফ ফেটে ফেটে পড়তে লাগলো। সদর থেকে কোনো লোক তদন্তে এলো না, সেজন্য সে সরকারকেই গালাগালি করলো। তারপরই এলো কনক। সংবাদটা একটু বিলম্বে পেয়েছিলো আলেফ। সাজপোশাক করে মাথায় একটা কাবুলি মুরেঠা পরে এরফানের বাড়িতে গেলে সে তাকে নিয়ে তদন্তস্থলে যাবে এই ইচ্ছায়, কিন্তু সেখানেই খবরটা এসে পৌঁছলোকনক দারোগা চৈতন্য সাহাকেই চোর সাব্যস্ত করেছে।
আলেফ কিছু না বলে এরফানের মুখের দিকে চেয়ে রইলো। এটা ছেলেছোকরাদের গান বাঁধার ব্যাপার নয়। আলেফের নিজের পোশাক তাকে ধিকৃত করতে থাকলো, সেই দুশো টাকা দিয়ে সে এই নতুন আচকান-শিলোয়ারের দাম দিয়েছে।
হঠাৎ সে বলে বসলো, কেন, ছাওয়াল কী কবি?
আলেফ চিন্তায় যতদূর এগিয়ে গিয়েছিলো স্বাভাবিকভাবেই এরফান তা যায়নি। সে বললো, এ কী কও?
টাকার কথা বলতে বলতে সামলে নিয়ে আলেফ বললো, কনকদারোগা তো আমার-তোমার বাড়িও খোঁজ করতি পারে। ছাওয়ালের মনে সন্দেহ হতি পারে। তার মাথা হেঁট হবি। কও, আমরা কি চোর?
আলেফ দমদম করে হেঁটে নিজের বাড়িতে ফিরে পোশাক খুলে ফেলো। তার স্ত্রী বললো, সে কী, ফিরে আলে?
আলেফ তারস্বরে বললো, খবরদার!
তার স্ত্রী বিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইলো।
ব্যাপারটা থিতিয়ে গেলে আলেফ একদিন চৈতন্য সাহাকে নিজের শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে ডেকে পাঠালো। এরফানকে বলে এলো একটা টাকা-লেনদেনের সাক্ষী থাকতে হবে। চৈতন্য সাহা এলে টাকা দুশো তাকে ফিরিয়ে দিয়ে সে বললো, তোমার টাকা তুমি রাখো। এরফান ফুর্সি টানতে টানতে ব্যাপারটার সাক্ষী হয়ে রইলো।
চৈতন্য-ছমিরের সংস্পর্শে ভদ্রলোকের থাকা উচিত নয়। আলেফ স্থির করলো, এ বিবেচনা থেকেই সান্যালমশাই গ্রামের কোনো ভদ্র ব্যক্তিকে তাদের দিকে এগিয়ে না দিয়ে তাকেই ঠেলে দিয়েছিলেন। তাই যদি হয়, সে এখনো সান্যালমশাইয়ের চোখে ভদ্র হতে পারেনি।
কিন্তু সান্যালমশাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যায় না। ইতিমধ্যে সে একবার সান্যালমশাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলো। কলকাতা থেকে তার ছেলে এসেছিলো, সঙ্গে সেও ছিলো। সান্যালমশাই কখনো তাকে, কখনো ছেলেকে প্রশ্ন করে সব খবর জেনে নিলেন। কিছু পরেনায়েবকে ডেকে বললেন–দুশো টাকা দিয়ো তো আমাকে।নায়েব টাকা এনে দিলে টাকাটা তার ছেলের হাতে দিয়ে তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, কল্যাণ হোক। ছেলে বিস্মিত হয়েছিলো, সান্যালমশাই হেসে বলেছিলেন, বই কিনো।
