এবাড়িতে কিছু পুরনো জিনিসও দেখতে পেলেন। যেমন একটা ঘরে দেখলেন বহু পুরনো একটা অয়েল পেন্টিং। গায়ে সার্টিনের কোট আর কোমরে বাঁধা উড়ানি। ছবিটা ছোটোবেলা থেকেই দেখেছেন। কিন্তু তিনি এই বংশের কে ছিলেন তার পরিচয় জানা যায়নি।
আর একটা ঘরে ছিল একগাদা ঝাড়বাতি। একসময়ে যখন ইলেকট্রিক ছিল না তখন ফরাশ ঘরে ঘরে এগুলো জ্বালিয়ে দিত। সেসব অবশ্য তিনি দেখেননি। কিন্তু সেই ঘড়িটা? সেটা কোথায় গেল?
দিবাকর এঘর-ওঘর খুঁজতে লাগলেন। হ্যাঁ, এই যে রয়েছে ঘড়িটা। দেওয়ালের এককোণে কালো আবলুশ কাঠের কারুকার্যকরা তাকের ওপর রয়েছে ওটা। ঝুল জমে গেছে। ঘড়িটার বৈচিত্র্য ছিল। ডায়ালের সংখ্যাগুলো ছিল রোমান হরফে আর কঁটাগুলো ছিল সোনালী রঙের। তীক্ষ্ণ তীরের মতো। ঘড়িটা প্রতি ঘণ্টায় গির্জার ঘণ্টার মতো গম্ভীর আওয়াজ দিত। সেই শব্দ এ বাড়ির যেখানে যেই থাক, শুনতে পেত।
বাড়ির নিচের তলায় একটা ঘরে পাওয়া গেল বিরাট একটা কাঠের সিন্দুক। মস্ত একটা জং-ধরা তালা লাগানো। এ-সিন্দুক ছোটোবেলা থেকেই তিনি দেখে আসছেন। কিন্তু কোনোদিন সেটা খুলে কেউ দেখত না। কারও আগ্রহ ছিল না। আজ তিনি খুললেন। দেখলেন তার মধ্যে একগাদা পুরনো কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ। অনেকগুলো পাঁজি; কিছু পুজোর সরঞ্জাম, যেমন–পিলসুজ, ঘণ্টা, পঞ্চপ্রদীপ, শাঁখ, একটা বিরাট পাঁঠাকাটার খাঁড়া।
এইসব দেখতে দেখতে তিনি আনন্দে রোমাঞ্চিত হলেন। শিস দিতে লাগলেন।
.
০৪.
সদাশিবের আতঙ্ক
দিবাকরের আনন্দ কিন্তু বেচারি সদাশিবের আতঙ্ক। এতদিন সে মনিবের সঙ্গে অনেক ভালো ভালো জায়গায় ঘুরেছে। কিন্তু এমন হতচ্ছাড়া জায়গায় এসে যে তাকে থাকতে হবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। তার এমনিতেই একটু ভূতের ভয় আছে। এখন এই বাড়িতে এসে কি জানি কেন সবসময়ে কাঁটা হয়ে থাকে। তার ঘরটাও নিচে একটেরেসিঁড়ির ঠিক পিছনে। চিৎকার করে মরে গেলেও কেউ শুনতে পাবে না।
ভয়ে যে সে কাঁটা হয়ে থাকে তার কারণও আছে।
প্রথমত, বাড়িটাই কেমন বিচ্ছিরি। এত বড়ো বাড়ি, কিন্তু জনপ্রাণী নেই! এ কিরে বাবা! সব যেন মরে হেজে গেছে। মরে গিয়ে ভূত হয়ে সবাই যেন এক-একটা ঘরে অদৃশ্য হয়ে বাদুড়ের মতো ঝুলছে।
তারপর সেই প্রথম দিন–দোতলার ঘর খুলেই মনিব এমনভাবে টর্চ নিয়ে আসতে বললেন যে দিনের বেলাতেই তার বুকে কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল। বাবু টর্চ জ্বেলে দেখে হেসে বললেন বটে কিচ্ছু না, কিন্তু নিশ্চয়ই তিনি কিছু দেখেছিলেন। মুখে কবুল করলেন না।
এর ওপর এখানে আসার ঠিক তিন দিনের মাথায়–
রাত তখন সবে সাড়ে সাতটা কি আটটা, সে রান্না করতে করতে নিজের ঘরে এসেছিল দেশলাইয়ের খোঁজে। হঠাৎ দেখল কে যেন পা টিপে টিপে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে।
সদাশিব তখনই সিঁড়ির মুখে ছুটে গিয়ে হাঁকল, কে?
কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। আবছা মূর্তিটা কিন্তু তখনও উঠছে।
চোর মনে করে সদাশিব পিছনে ধাওয়া করল। কিন্তু ঠক করে দেওয়ালে মাথা ঠুকে যেতেই সে দেখল কেউ কোথাও নেই। অন্ধকারে তারই মাথা ঠুকে গেছে।
এতক্ষণে দেশলাইটার কথা মনে পড়ল। দেশলাইটা হাতেই রয়েছে। দেশলাই জ্বেলে সাবধানে নিজের ঘরে এসে ঢুকল।
চোখের ভুল নিশ্চয়। নইলে চোরটা পালালো কোথা দিয়ে! তবু তার মনে হতে লাগল– চোর বটে তো! না অন্য কিছু?
নিশ্চয়ই অন্য কিছু। নইলে ফের একদিন ঐরকম দেখবে কেন?
রাত তখন নটা। সে বাবুর রাতের খাবার নিয়ে ওপরে উঠছিল। সিঁড়িটাও বিচ্ছিরি। সোজা নয়, সাপের মতো এঁকেবেঁকে উঠে গেছে। তেমনি অন্ধকার। বাঁকের মুখে তেমন কিছু আছে কিনা দেখার উপায় নেই।
সে উঠছিল। হঠাৎ মনে হলো অল্প দূরে কালোমতো কিছু একটা যেন সিঁড়ির ওপরে পড়ে রয়েছে।
কি ওটা?
সদাশিব একটু দাঁড়িয়ে পড়ল। বুঝতে চেষ্টা করল জিনিসটা কি?
তারপরেই ও চমকে উঠল। দেখল জিনিসটা নড়ছে। শুধু নড়াই নয়, সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। ক্রমে বুঝতে পারল একটা যেন মানুষের শরীর। শরীরটা হামাগুড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। পরিষ্কার দেখল পরনের কাপড়টা সারা গায়ে জড়ানো–মেয়েরা যে ভাবে শাড়ি পরে।
সে চিৎকার করে উঠল। পরক্ষণেই মূর্তিটা যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে নিচে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সদাশিবের সামলাতে একটু সময় লাগল। তারপর খাবার নিয়ে ওপরে গেল। ভাবল মনিবকে ব্যাপারটা বলবে। কিন্তু বলতে পারল না। কেননা তার মনিব মানুষটা অদ্ভুত। তিনি ভয় পান না। ভয় পেতে ভালোবাসেন। তিনি নাকি ভয়ের খোঁজেই এখানে এসে বাস করছেন।
কিন্তু একটা দুর্ভাবনা থেকেই গেল–এই যে সে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে অত জোরে চিৎকার করল তবুও তা বাবুর কানে পৌঁছল না!
দুদিনের এই ঘটনায় সদাশিব যে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকবে তাতে সন্দেহ কি?
আরও একটা ব্যাপার ইদানীং ঘটছে। সেটা অবশ্য এ বাড়িতে নয়।
মাঝে মাঝে অনেক রাতে তার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। একদিন অমনি ঘুম ভেঙে গেলে সে শুনতে পেল অনেক দূরে একটা শব্দ–খটাখটখটাখটখটাখট …।
শব্দটা যেন পাকা রাস্তায় হচ্ছে। নিস্তব্ধ রাত্তিরে শব্দটা বেশ পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু কিসের শব্দ ঠিক বুঝতে পারল না। এক একসময় এক একরকম মনে হলো। একটু পরেই শব্দটা থেমে গেল।
এমনি শব্দ পরপর তিন দিন শুনল। শব্দটা তার কোনো ক্ষতি করছে না। কিন্তু কেবলই মনে হতে লাগল খুব শীগগিরই এ বাড়িতে কোনো বড় রকমের ক্ষতি হবে। শব্দটা যেন সেই কথাই জানিয়ে দিচ্ছে।
