সদাশিব ঠিক করল, এবার কিছু হলেই সে বাবুকে জানাবে–তা বাবু বিশ্বাস করুন আর নাই করুন।
সদাশিব এখন পারতপক্ষে সন্ধেবেলা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চায় না। বাবুর খাবার নিয়ে যখন যায়, তখন এক হাতে থালা আর এক হাতে লণ্ঠন। লণ্ঠনে নিজের ছায়া দেখে নিজেই শিউরে ওঠে। এ তো মহা মুশকিল হলো!
ইদানীং বাবুরও বেশ পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সে। তার সেই হাসিখুশি ভাবটা আর নেই। একটুতেই রেগে যান। সবসময়ে কি যেন চিন্তা করছেন। আগে বেশ ছবি আঁকতেন। মাঝে মাঝে তাকে ডেকে বলতেন, সদা, দেখ তো ছবিটা কেমন হচ্ছে! সে তো ছবির ভাবি বোঝে। তবু বলত, খাসা।
এইটুকু শুনেই বাবু খুশি হতেন। কিন্তু এখানে এসে পর্যন্ত বাবুকে আর ছবি আঁকতে দেখেনি। এখন রাত্তিরে কি একটা খাতা পড়েন মন দিয়ে। মাঝে মাঝে তা থেকে কাগজে কি লেখেন।
বাবুর হুকুম-রাত নটার সময় খাবার দিতে হবে। তার আগেও নয়, পরেও নয়। খেয়েদেয়ে ঘরে খিল দিয়ে বাবু কি যে করেন তা ভগবান জানেন। তবে রাত দুটো-তিনটে পর্যন্ত তাঁর ঘরে আলো জ্বলতে দেখেছে। অথচ এর আগে উনি কখনো এত রাত জাগতেন না।
সেদিন অমনি রাত নটার সময়ে খাবার নিয়ে ওপরে বাবুর ঘরে গেছে। বাবু তো রেগে কাঁই। বললেন, এত তাড়াতাড়ি খাবার আনতে কে বললে?
সদাশিব মনে করিয়ে দিল রাত নটাতেই তো সে খাবার দিয়ে যায়।
মুখের ওপর উত্তর শুনে বাবু কখনো যা করেন না তাই করলেন। থালাটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন।
সেদিন সদাশিব যত না দুঃখ পেয়েছিল তার চেয়ে বেশি পেয়েছিল ভয়। সে রাতে বাবু খাননি বলে সদাশিবও কিছু মুখে তুলতে পারেনি।
তিন দিন পর আবার এমন একটা ঘটনা ঘটল যা দেখে সদাশিব এবার তার অমন বাবুকেও ভয় পেতে লাগল।
সেদিন দুপুরবেলা, বাবু কতকগুলো পুরনো ছেঁড়া কাগজ রোদ্দুরে দিয়েছিলেন। একটা ছাগল এসে কাগজগুলো চিবুতে লাগল। বাবু দেখামাত্রই ছুটে এসে ছাগলটাকে এক হাতে তুলে গলা টিপে ধরলেন। ছাগলটা ব্যা ব্যা করে ধড়ফড় করতে করতে মরে গেল।
উঃ! তখন বাবুকে কী ভয়ঙ্করই না দেখাচ্ছিল! অথচ মানুষটা কখনো একটা পিঁপড়েকেও পা দিয়ে টিপে মারেননি।
এইসব যতই দেখছে সদাশিব ততই ভয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। তার তখন কেবল এই কথাটাই মনে হতে লাগল–এ বাড়িতে কারো আসা দরকার। কিন্তু কেই-বা তার আছে?
আছে একজনই–বাবুর সেই কলকাতার বন্ধু। আঃ! তিনি যদি একবার এখানে আসতেন। তিনিই তো ভাড়াটে উঠিয়ে বাড়িটা খালি করে দিয়েছেন। তবেই না বাবু এখানে আসতে পারলেন। তা তিনি কি একবার বন্ধুকে দেখতে এখানে আসবেন না?
.
০৫.
সুরঞ্জনের সাবধানবাণী
একেই বোধহয় বলে টেলিপ্যাথি।
সদাশিব যেভাবে মনে মনে সুরঞ্জনকে ডাকছিল, সে আর না এসে পারে?
সুরঞ্জনকে পেয়ে দিবাকর খুব খুশি। অভিমান করে বললেন, এখানে এসেছি আজ দশ দিন। এত দিনে মনে পড়ল?
সুরঞ্জনও উল্টো অভিমান জানালেন, এসে পর্যন্ত একটা চিঠিও দাওনি ভাই। শেষে থাকতে না পেরে চলে এলাম।
বেশ করেছ। অ্যাই সদা
সদাশিব এসে দাঁড়ালো।
দেখছিস, কে এসেছে? আমার ফ্রেন্ড–দি ওনলি ফ্রেন্ড। ফ্রায়েড রাইস আর মাংস লাগা।
সদাশিব খুশি হয়ে চলে গেল। দিবাকর সুরঞ্জনকে নিয়ে দোতলায় উঠল।
শুনেছি কলকাতায় কোথাও কোথাও নাকি খুব পুরনো জিনিস কিনতে পাওয়া যায়? সোফায় বসে দিবাকর জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ, মাঝে মাঝে নিলামের বিজ্ঞাপনে দেখি।
তা ভাই, খোঁজ পেলে আমায় জানিও তো।
কেন? পুরনো জিনিস নিয়ে কি করবে?
এমনিই। একটা ছবির খোঁজ করছি।
এই সময়ে সদাশিব কফি আর টোস্ট দিয়ে গেল। সে ভারি খুশি। তার মনিব আবার আগের মতোন হয়ে গেছেন।
সুরঞ্জনের পরনে শার্ট, ট্রাউজার। বেশ স্মার্ট চেহারা। সবসময়ে হাসিখুশি। কোনো এক বড়ো অফিসের ছোটোখাটো অফিসার। কিন্তু কে ভাবতে পারে এই মানুষই আবার তন্ত্রমন্ত্র করেন, প্রেতাত্মা নিয়ে পড়াশোনা করেন।
একসময়ে দিবাকরের সঙ্গে কলকাতায় পড়তেন। খুব ভাব ছিল। তারপর দুজনে দুদিকে ছিটকে গেলেন যে যাঁর কাজে। তবে যোগাযোগটা ছিল বরাবর।
খাওয়া-দাওয়ার পর দিবাকর বললেন, তোমার চেষ্টাতেই বাড়িটা উদ্ধার করা গেছে। এসো গোটা বাড়িটা ঘুরে দেখাই।
দিবাকর সারা দুপুর সুরঞ্জনকে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখালেন।
বাড়ির পিছনে এক জায়গায় ভাঙা ছাদমতো ছিল। সেখানে এসে সুরঞ্জন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন।
কি দেখছ?
এখানে কি ছিল বলতে পার?
শুনেছি ঘোড়ার আস্তাবল ছিল। আমার পূর্বপুরুষেরা ঘোড়ায় চড়তে ভালোবাসতেন। পরে বোধহয় ফিটন-টিটন ছিল। ঐ দেখ না একটা ভাঙা চাকা এখনও পড়ে আছে।
সেখান থেকে দোতলায় ফিরে এসে সুরঞ্জন জিজ্ঞেস করলেন, তা তুমি হঠাৎ এখানে চলে এলে কেন?
বন্ধুর প্রশ্নে দিবাকর বললেন, আমার দেশ–আমার পূর্বপুরুষের বাড়ি। এখানে এসে থাকব না তো সারা জীবন ভেসে ভেসে বেড়াব?
দিবাকর কথাটা হেসেই বললেন, কিন্তু সুরঞ্জন হাসলেন না। বললেন, আমায় সত্যি কথাটা বলো তো, আসল উদ্দেশ্যটা কি?
দিবাকর তখন গ্যাংটকের দোকানে সেই ছবির কথা থেকে শুরু করে সবকিছু বন্ধুকে জানালেন। বললেন, ছবিটা হাতছাড়া হয়ে গেল। তাই আমি নিজেই ঐরকম একটা ছবি আঁকতে চাই। ঐ ছবিটা ভাই আমায় পেয়ে বসেছে।
এই ছবিটার জন্যেই কি তুমি কলকাতায় খোঁজ করতে বলছ?
এগজ্যাক্টলি।
