তার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু কি আর করা যাবে। তারপর থেকে অনেক জায়গায় ছবিটার খোঁজ করেছিলেন। কিন্তু পাননি। ছবিটা যেন তার ঘাড়ে ভর করেছিল। কিছুতেই ছবিটার কথা ভুলতে পারছিলেন না।
আসলে ছবিটা তাঁকে খুব ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি ভাবতে লাগলেন–ঐ ছবিটা যিনি এঁকেছিলেন তাঁর আঁকার উদ্দেশ্য কি ছিল? ঐরকম ছবি শুধু শুধু কেউ আঁকে? তবে কি ঐ অজ্ঞাত শিল্পী নিজের চোখে ঐরকম কিছু দেখেছিলেন? আর যা দেখেছিলেন তা বললে লোকে বিশ্বাস করবে না বলে ছবির মধ্যে দিয়ে তা ফুটিয়ে তুলেছিলেন?
ছবিটা যখন কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না তখন তিনি ঠিক করলেন নিজেই ঐরকম ছবি আঁকবেন। কিন্তু যখনই রঙ-তুলি নিয়ে বসেন তখনই সব কেমন ঘুলিয়ে যায়। ছবিটার সূক্ষ্ম কাজ কিছুতেই মনে করতে পারেন না।
এ তো বড় জ্বালা!
তিনি তখন বুঝতে পারলেন, ঐরকম কিছু স্বচক্ষে না দেখলে ও ছবি আঁকা যাবে না।
কিন্তু ঐরকম কিছুর দেখা কোথায় পেতে পারেন? অলৌকিক ব্যাপার তো যেখানে সেখানে ঘটে না। তাছাড়া আজকের যুগে ওসব ব্যাপার আশাই করা যায় না।
এই সময়ে তাঁর মনে হলো দেশের বাড়ির কথা। তাঁদের সেই মহলেশ্বরী। ঐ বাড়ি সম্বন্ধে অনেক কিছুই তিনি ছোটোবেলা থেকে শুনে এসেছেন। অনেক অপঘাত-মৃত্যু নাকি একসময়ে ঐ বাড়িতে হয়েছিল।
তিনি ভাবলেন যদি সত্যিই কিছু অলৌকিক ব্যাপার এখনও ঘটে তাহলে ওখানে গিয়ে থাকতে পারলে নিশ্চয় কিছু দেখতে পাবেন। ভাগ্য প্রসন্ন হলে সেই ছবিটার মতো ভয়ঙ্কর মুখেরও দর্শন মিলতে পারে।
কিন্তু একটাই অসুবিধে-বাড়ির নিচের তলাটা ভাড়া দেওয়া আছে। তাদের তুলতে না পারলে ওখানে গিয়ে লাভ হবে না।
তিনি তখনই কলকাতায় ওঁর একটি মাত্র বন্ধু সুরঞ্জনকে অনুরোধ করে চিঠি লিখলেন, যেন সে ভাড়াটে তোলার চেষ্টা করে। জানিয়ে দিলেন, তিনি এখন দেশের বাড়িতে গিয়েই থাকবেন।
চিঠি লিখতে গিয়ে তিনি একবার শুধু থমকে গেলেন। মুহূর্তের জন্যে মনে হলো কোথাকার কোন একটা সামান্য ছবির জন্যে এ তিনি কী করতে চলেছেন! এটা কি পাগলামো হচ্ছে না?
কিন্তু এই শুভচিন্তা শুধু মুহূর্তের জন্যে। চিঠি তিনি লিখলেন। এবং নিজে হাতে পোস্ট করে দিলেন।
সুরঞ্জন মাসখানেক পরে জানালেন, অনেক চেষ্টা করলাম, ভাড়াটে উঠবে না। তবে যদি হাজার পঁচিশ টাকা ছাড়তে পার তা হলে উঠবে।
দিবাকর তখনই বন্ধুর কাছে টাকা পাঠিয়ে দিলেন।
ভাড়াটেরা উঠল। দিবাকর হাসিমুখে সদাশিবকে বললেন, প্যাক আপ।
তখনও তিনি জানতেন না নিয়তি তাকে কিভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
.
০৩.
দিবাকরের আনন্দ
দিবাকর নন্দী মনের আনন্দে নিজের গ্রামে ফিরে এলেন। আনন্দ তো হবেই। ভাড়াটে উঠিয়ে বহুকাল পর স্বদেশে এসেছেন। আর তার বিশ্বাস–এখানে থাকতে থাকতে একদিন না একদিন তেমন কিছু দেখতে পাবেনই যা হবে তাঁর নতুন ছবি আঁকার প্রেরণা।
তিনি যখন ছোটোবেলায় এ বাড়িতে থাকতেন তখন কিছু দেখতে পাননি। তার কারণ তখন এ বাড়িতে লোকজন ছিল অনেক। ঐ বাড়িরে মধ্যে সেরকম কিছু দেখা যায় না। আর এখন? এখন অত বড়ো বাড়িখানা খাঁ খাঁ করছে। বিশেষ করে দোতলায় উঠলে গা ছমছম করে। বহুকাল দোতলার দরজা খোলা হয়নি।
তিনি স্বদেশে ফিরলেন। তাকে গ্রামের লোক অবাক হয়ে শুধু দেখল। কেউ আলাপ করতে এগিয়ে এল না। বোধহয় তার চালিয়াতি, তাঁর সাজসজ্জা আর অহঙ্কার দেখে কারো ভালো লাগেনি। তিনিও কারো দিকে ফিরে তাকালেন না। যেন এইসব গেঁয়ো ভূতরা তাঁর সঙ্গে মেশার অযোগ্য।
নিজের বাড়িতে ঢুকে তিনি প্রথমে নিচের তলার একটা ঘর খুললেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত এখানে ভাড়া দেওয়া ছিল বলে ঘরটা কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।
তিনি ভাবলেন, নিচের তলায় কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে তারপর দোতলার ঘরগুলো খুলে দেখবেন কোন ঘরে তিনি পাকাপাকিভাবে থাকবেন।
বেলা দুটোর মধ্যে সদাশিবকে দিয়ে নিচতলাটা ঝটপাট দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নিয়ে এবার তিনি দোতলায় উঠলেন।
মনের আনন্দে শিস দিতে দিতে দিবাকর উঠলেন। টানা বারান্দার পাশে সার সার ঘর। খড়খড়ি দেওয়া জানলাগুলো সব বন্ধ। ঘরগুলোর পাশ দিয়ে যেতে যেতে তিনি মনে করবার চেষ্টা করলেন তার ছোটোবেলায় কে কোন ঘরে থাকতেন।
একটা ঘরের সামনে এসে তিনি শিস দিতে দিতেই তালা খুললেন। দু হাত দিয়ে ভারী কপাট ঠেললেন। ভেতরে ঘুটঘুঁটে অন্ধকার। অন্ধকারে আন্দাজ করে তিনি পা বাড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে আঁৎকে উঠে দু পা পিছিয়ে এলেন। দেখলেন সামনের দেওয়ালে ঝুলছে মস্ত একটা ছবি। অন্ধকারেও বুঝতে বাকি রইল না, এটা সেই গ্যাংটকের ছবি। সেই ক্রুদ্ধ কোনো মহিলার ভয়াবহ প্রেতাত্মার ছবি। জ্বলজ্বল করছে। কিন্তু সে ছবি তো এতো বড়ো ছিল না। আর সে ছবি এখানে এলই বা কি করে?
তিনি তখনই হাঁকলেন, সদাশিব, টর্চটা নিয়ে চট করে এসো তো!
সদাশিব পড়িমড়ি করে টর্চ নিয়ে ওপরে উঠে এল। দিবাকর টর্চ জ্বাললেন। দেখলেন কোথাও কোনো ছবি নেই। ফাঁকা দেওয়াল।
তিনি মনে মনে হাসলেন। ধুস! চোখের ভুল।
চোখের ভুলই হোক, আর যাই হোক এবাড়িতে ঢুকেই ছবিটা দেখে তিনি একটু যেন খুশিই হলেন। ভাবলেন তাহলে হয়তো এখানে আসা তার ব্যর্থ হবে না।
যাই হোক, সপ্তাহখানেকের মধ্যেই তিনি দোতলার দুখানা ঘর সাজিয়ে গুছিয়ে নিলেন। একটা ঘরের দেওয়ালে টাঙালেন তার ভালো ভালো ছবিগুলো। অন্য ঘরের দেওয়ালে টাঙালেন বেশ কিছু দুষ্প্রাপ্য বিশ্ববিখ্যাত আর্টিস্টের ছবি। যেমন–রেমব্রান্ট, মাতিস, ভ্যানগগ, পল ক্লি আর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির লাস্ট সাপার ছবিটি। এসব ছবি যে অরিজিনাল অর্থাৎ আর্টিস্টের নিজের হাতে ছবি আঁকা নয়–আসলের নকল মাত্র, দিবাকর তা বুঝতেন। তবু সার্থক নকল এই ছবিগুলোরও শুধু দামই নয়, যথেষ্ট আকর্ষণও আছে।
