কিন্তু এ বাড়ির মালিক বড়ো কড়া। তিনি এবাড়ি কিছুতেই বিক্রি করবেন না। এ তাঁর পূর্বপুরুষের বাড়ি। তিনি যতদিন বেঁচে আছেন এ বাড়ির একখানি ইটও কেউ খসাতে পারবে না।
তার পাত্তা পাওয়াও কঠিন। কোথায় কখন থাকেন কেউ বলতে পারে না। দেশভ্রমণ তার নেশা।
তিনি এবাড়িতে বহুকাল আসেননি। আসার দরকারও নেই। তিনি জানেন এ বাড়িটার সম্বন্ধে অনেক দুর্নাম আছে। ভয়ে কেউ অন্তত জবর-দখল করতে এগোবে না। চোরও আসে না দামী-দামী জানলা খুলে নিতে।
এই প্রাসাদের কাছেই আছে আরও কয়েকটা ভাঙা বাড়ি। সেসব বাড়িতে এক সময়ে থাকত নীলকর সাহেবরা। নীলের চাষ করে তারা লাল হয়ে গিয়েছিল। পিছনেই বিরাট বাঁওড়।
ভাবতে ভারি অদ্ভুত লাগে–একদিকে থাকত সাহেবরা, কাছেই বাঙালি জমিদার। সাহেবদের ছিল বন্দুক, পিস্তল; জমিদারদের ছিল বাঁধা লেঠেল। তাদের ঘরে ঘরেও থাকত বন্দুক, আর তরতরে-ধার তরোয়াল।
সাহেব আর বাঙালি জমিদারদের সম্পর্ক কিরকম ছিল কে জানে!
সম্পর্ক যেমনই থাক, কয়েক বছর আগে জমি চাষ করতে গিয়ে বেরিয়েছিল রাশিরাশি কঙ্কাল। আর সাহেব-মেমরাও যে ভূতের ভয় পেত তার অনেক লোমহর্ষক কাহিনি শোনা যায় নব্বই বছরের বুড়ো ওঝা সনাতন সোঁর মুখে।
সেদিন তখন সন্ধের মুখ। মহলেশ্বরীর অন্দরমহলে অন্ধকার ঘন হয়ে উঠেছে। তারই মধ্যে কেউ একজন এক-একটি ঘরের তালা খুলে ভেতরে ঢুকছে। তারপর বেরিয়ে এসে বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক-একসময়ে নিজের মনেই বলছে-বাঃ! চমৎকার!
লোকটি এগিয়ে গেল দ্বিতীয় মহলের দিকে। হঠাৎ যেন শুনতে পেল কিসের শব্দ। শব্দটা আসছিল পাশের ঘর থেকে। একটা যেন ঝটাপটির শব্দ। লোকটির দুচোখ অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে উঠল উত্তেজনায়। চাবির থোক থেকে বেছে বেছে একটা চাবি লাগিয়ে দরজাটা খুলল। ভেতরে ভ্যাপসা গন্ধ। টর্চের আলো ফেলল। দেখল দুটো চামচিকে ঝটাপটি করছে।
ধুস্! যেন হতাশ হলো লোকটি। বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আবার তালা লাগালো।
ঠিক তখনই পিছনে পায়ের শব্দ। কেউ আসছে। চমকে উঠে ঘাড় ফেরালো।
বাবু!
কি হলো, এখানে কেন? বাবু বিরক্ত হলেন।
বড্ড অন্ধকার। আলো জ্বেলে দিই?
না। তুই তোর কাজে যা।
ভৃত্যটি কিছু বুঝতে পারল না। খানিকক্ষণ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর চলে গেল বাইরে। ভাবল, যেমন অদ্ভুত বাড়ি, তেমনি অদ্ভুত তার মনিব। অথচ তিনি এমন ছিলেন না। এখানে এসে পর্যন্ত যেন কেমন হয়ে গেছেন।
.
০২.
নিয়তির হাতছানি
বাবুর নাম দিবাকর নন্দী। তিনি আর্টিস্ট। দারুণ ছবি আঁকেন। ছবি আঁকা নিয়েই থাকেন। কাজকম্ম কিছু করেন না। করার দরকারও নেই। প্রচুর টাকা। বিয়েও করেননি, একা মানুষ। সঙ্গে শুধু অনেক দিনের পুরনো ভৃত্য সদাশিব।
দিবাকরের শখ দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানো। সঙ্গে ছবি আঁকার সরঞ্জাম। যেসব জায়গার প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখার মতো, সেখানেই তিনি ছুটে যান। কখনো বড়ো হোটেলে, কখনো ঘরভাড়া করে থাকেন, যত দিন ভালো লাগে। ভালো লাগার পালা ফুরোলেই তিনি সদাশিবকে হেঁকে বলবেন, সদাশিব প্যাক আপ।
এইভাবেই তিনি কাশ্মীর, রাজস্থান, দার্জিলিং, সিমলা, কন্যাকুমারী, উটকামণ্ড প্রভৃতি নানা জায়গা ঘুরে সম্প্রতি এসেছিলেন নেপালের কাঠমাণ্ডুতে।
মানুষটি খুশমেজাজের। তিনি যে এক সময়ের রাজপরিবারের না হোক, বনেদী জমিদার পরিবারের বংশধর সেটা তিনি মাটিতে লোটানো ধুতির কেঁচা, সিল্কের পাঞ্জাবি, বিলিতি সেন্টের গন্ধ মাখানো রুমাল, ঘাড় পর্যন্ত ঝোলা কুচকুচে কালো চুল আর চওড়া জুলপি দেখিয়ে বুঝিয়ে দেন।
তার একটু যে খুঁতখুঁতুনি তা তার কটা রঙের গোঁফ আর চোখের কটা মণিটা নিয়ে। ও দুটো যে কেন কালো না হয়ে কটা হলো তা তিনি বুঝতে পারেন না।
অবশ্য একসময়ে বাঙালিদের কটা চুল, কটা গোঁফ, কটা চোখের মণি খুব গৌরবের ছিল। কেননা সাহেবরা খুব পছন্দ করত।
বড়ো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দিবাকর নন্দী সরু গোফে আঙুল বোলাতে বোলাতে সদাশিবকে উদ্দেশ করে বলেন, বুঝলি সদাশিব, এই যে কটা গোঁফ দেখছিস এ সবার ভাগ্যে হয় না।
সদাশিব বোকার মতো তাকিয়ে থেকে বলে, এজ্ঞে। আজ যদি সাহেবরা এ দেশে থাকত, তাহলে তারা আমার এই গোঁফের মর্যাদা দিত।
সদাশিব হেসে বলে, এজ্ঞে, তা বৈকি।
দিবাকর নন্দী বরাবর প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবিই আঁকেন। কিন্তু সম্প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির একটু পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের পিছনে সামান্য একটু ঘটনা আছে।
তার একটা বিশেষ শখ কিউরিওর দোকানের খোঁজ পেলেই সেখানে ছুটে যাওয়া। আর খুব পুরনো–এখন যা পাওয়া যায় না–এমন জিনিস সংগ্রহ করা। সেবার গ্যাংটকে গিয়ে অমনি একটা দোকানে পুরনো জিনিস হাতড়াতে হাতড়াতে কতকগুলো অয়েল-পেন্টিং পেয়েছিলেন। তার মধ্যে একটা ছবি দেখে তিনি আঁৎকে উঠেছিলেন। ছবিটা অদ্ভুত। কালো ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর ধূসর রঙে আঁকা একটা আবছা মুখের আভাস। মুখটা অনেকটা একজন ক্রুদ্ধ মহিলার মুখের মতো। ভয়ঙ্কর সে মুখ। কিন্তু তা মানুষেরও নয়, দেবদেবীরও নয়।
ছবিটা তাঁকে এতই আকর্ষণ করেছিল যে তিনি তখনই তা কিনতে গেলেন। কিন্তু ওটার যা দাম তত টাকা তার পকেটে ছিল না। তিনি তখনই টাকা আনতে বাড়ি ছুটলেন। কিন্তু ফিরে এসে ছবিটা আর পেলেন না। বিক্রি হয়ে গেছে।
