কাপ নড়ে নড়ে নয়, ছুটে চলেছে বৃত্তের একপ্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। বিনয়বাবু আঙুল ঠেকিয়ে রাখতে একেবারে ঝুঁকে পড়েছেন কাপের উপর আর আশ্চর্য–দেবব্রতবাবুর হাতটা কাঁপছে থরথর করে।
এ পর্যন্ত একটি কথাই স্পষ্ট হয়েছে MURDERER-তারপর আরও কটি কথা–WITH YOU.
হঠাৎই দেবব্রতবাবু আঙুলটা তুলে নিলেন। সঙ্গে সঙ্গে কাপ নিশ্চল হয়ে গেল।
–এটাও নিশ্চয় কোনো খারাপ স্পিরিট। ভয় দেখাতে চায়। বলেই তিনি উঠে একেবারে নিজের ঘরে গিয়ে খিল দিলেন।
.
টর্চের আলোয় রিস্টওয়াচটা দেখলেন একবার। রাত সাড়ে তিনটে। ব্যাগটা তুলে নিয়েই জুতোর সামান্যতম শব্দটুকুও না করে চুপি চুপি বেরিয়ে পড়লেন দেবব্রতবাবু। তিন মাইল রাস্তা হাঁটতে হবে–হয়তো ছুটতে হবে। তারপর যে দিকের যে ট্রেন পাওয়া যায়
রমেনের বাড়ি যে এটাই তা কি আর জানতেন? ওর কথা তো ভুলেই গিয়েছিলেন। আগে মাঝে মাঝে ভাবতেন। ভাবতেন, উশ্রী ফক্স দেখতে না গেলেই হতো। ওঁরই আগ্রহে তো রমেনকে যেতে হয়েছিল।
..বড্ড অহংকারী ছিল রমেনটা। আংটিটা সবাইকে দেখিয়ে বলত–এ জিনিস রাজার ভাগ্যেও জোটে না। এ আংটি পরা থাকলে কোনো বিপদ কাছে ঘেঁষতে পারে না।
বিজ্ঞানের ছাত্র দেবব্রত এসব কথা বিশ্বাস করতেন না। এই নিয়ে বহুবার ওর সঙ্গে তর্ক ঝগড়া হয়েছে……..
উশ্রী প্রপাতের একদম ধারে একটা পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে আবার সেই তর্কের শুরু।
রেগে গিয়ে দেব্রত বললেন–তাহলে ঐ যেখানে তোড়ে জল পড়ছে সেখানে ঝাঁপ দে। দেখি কি করে বাঁচিস?
রমেন আংটিটার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল–তা পরি।
এ কথা বলেও রমেন একটু যেন ইতস্তত করছিল। একটু নাকানি চোবানি খাওয়াবার জন্যে হঠাৎ দেবব্রত সামান্য একটু ঠেলা দিলেন। রমেন ছিটকে পড়ল দু পা দূরে আর একটা পাথরের কাছে যেখানে মোটে হাঁটু জল। কিন্তু জায়গাটা বোধহয় খুব পিছল ছিল। আর তার পরেই….
…সে সব আজ কতদিনের কথা বয়েস তখন কতই বা, আঠারো-উনিশ?
দেবব্রতবাবু তখন প্রাণপণে ছুটছেন। স্টেশন এখনও অনেক দূর।
[শারদীয়া ১৩৯৭]
গভীর রাতের আগন্তুক
০১.
বাড়িটার নাম মহলেশ্বরী।
না, বাড়ি নয়, প্রাসাদ–জীর্ণ দোতলা প্রাসাদ।
চুচড়ো থেকে আা, পঞ্চাননতলা, ভৈরবপুর ডিঙিয়ে ভস্তারার দিকে চেলে গেছে চমৎকার পিচঢালা রাস্তা। সারাদিন বাস যায় আসে। এ ছাড়া ছোটে লরি। মাঝে মাঝে প্রাইভেট কারও। বড়ো শান্ত পরিবেশ। দুদিকে মাঠ। মাঠের ওদিকে ছবির মতো দেখা যায় গ্রাম।
বাসরাস্তা থেকে ডান দিকে একটা সরু ধুলোভরা পথ চলে গেছে। দুপাশে বাবলা গাছ, আর ঢোলকলমীর ফুল-বাহার।
এই কাঁচা রাস্তার শেষে যে জায়গাটা সেখানে কিছু লোকবসতি আছে। খুবই গরিব তারা। চাষ করে, মজুর খাটে। ওরই মধ্যে রয়েছে দু-একটা চায়ের আর ছোটোখাটো মুদির দোকান। কোনো একসময়ে এখানকার জমিদার নন্দীদের প্রভাবে জায়গাটার নাম ছিল নন্দীগ্রাম। পরে নীলকর সাহেবরা এখানে নীলের চাষ করতে এলে তাদের দৌলতে নন্দীগ্রামের নাম ঘুচে গিয়ে নতুন নাম হয় নীলগঞ্জ। এই নামটা অবশ্যই অনেক পরের।
নন্দীদের বিরাট তেতলা বাড়িখানা এখনও দিব্যি টিকে আছে। দোতলার সার সার ঘরগুলোর জানলা যে শেষ পর্যন্ত কবে বন্ধ করা হয়েছিল কে জানে! এখনও পর্যন্ত তা খোলা হয়নি। গোটা বাড়িটার চারদিকে অনেকখানি জায়গা জীর্ণ পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পিছনের দিকে নন্দীদের নিজস্ব ঘাট-বাঁধানো পুকুর। পুকুরে এখনও জল টলটল করছে। পুকুরপাড়েই একটা বেলগাছের নিচে নন্দীদের শিবমন্দির। আগে বাড়ির বৌ-ঝিরা এখানে শিবরাত্রিতে পুজো দিত। রাত জাগত।
বাড়িতে ঢোকার মুখেই লোহার পাত-আঁটা ভারী কাঠের পাল্লা দেওয়া দরজা। দুটো পাল্লার একটা ভেঙে পড়ে আছে এক পাশে। তাতে জঞ্জাল জমে উঠেছে।
এরপর সিংদরজা। দোতলাসমান উঁচু। তার ওপর নহবৎখানার ভগ্নাবশেষ। একসময়ে প্রহরে প্রহরে বাজত রাগ-রাগিণীর আলাপ।
নিচের তলাটা অবশ্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তার কারণ নিচের কয়েকটা ঘর ভাড়া দেওয়া আছে–না, না, বাস করার জন্যে নয়, গুদামঘর হিসেবে।
নিচের ঘরগুলোর সামনে দিয়ে চলে গেছে শ্বেতপাথরের বাঁধানো অন্দরে যাবার পথ। সেই পথ দিয়ে ভেতরে ঢুকলে যেন গোলকধাঁধার মধ্যে পড়তে হয়। ঘরের পর ঘর গলির পর গলি। সব ঘরেই তালা ঝুলছে।
বাড়ির ঠিক পিছনে বিরাট আমবাগান। তার ডালপালা প্রেতাত্মার বীভৎস হাতের মতো ঝুলে পড়েছে ছাদের ওপর। সন্ধেবেলায় হঠাৎ দেখলে কেমন ভয়-ভয় করে। আশ্চর্য এই, এত যে সতেজ আম-গাছ, কিন্তু আম ফলতে দেখেনি এ অঞ্চলের লোক। কেন আম ফলে না?
তা নিয়েও নানা জল্পনা। থাক, এখন সেকথা।
বাড়িটার নাম একটু অদ্ভুত–মহলেশ্বরী। শোনা যায় এবাড়ির কোনো এক মহীয়সী রানীমাই নাকি এবাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন। তাই ঐ নাম।
বাড়িতে বহুদিন ধরে কেউ থাকে না। কাছে-পিঠের মানুষ সন্ধের পর এবাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেঁষে না।
কেন ঘেঁষে না তার উত্তর মেলে না। বলে–রাজরাজড়াদের অভিশপ্ত বাড়ি। কত খুন, গুম খুন হয়েছে তার কি ঠিক আছে?
কিন্তু এসবের কোনো প্রমাণ নেই–জনশ্রুতি মাত্র।
জনশ্রুতি-গল্পকথা ছাড়া কী? নইলে একালের ছেলে-ছোকরারা সারা দুপুর ঐ মার্বেল পাথরের বারান্দায় বসে তাস পিটোতে পারে? নাকি কেউ গুদামঘর করে ব্যবসা করতে পারে? তাছাড়া দালালরাও আসে কলকাতা থেকে। ঘুরঘুর করে বাড়িটা কেনার জন্যে। এই বাড়ি ভেঙেই দিব্যি হাল ফ্যাশানের বহুতল বাড়ি করা যায়।
